পৃথক ছাত্রাবাস ও খাবারের কামরা
একটি স্মৃতিচারণ ও প্রস্তাবনা
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১৩:২৯
বোর্ডিংয়ের পাতলা ডাল, লাবড়া, নিরামিষ কিংবা সপ্তাহে এক-দুটি মাংসের টুকরোর জন্য দীর্ঘ লাইন; বালতিতে খানা কিংবা টিফিন ক্যারিয়ারে ডাল-ভাত—এসব যেন তালেবানা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
কামরায় বসেই খাওয়া, তারপর তা পরিষ্কার করে দরসে বসা। ছোট্ট কক্ষে গোসল, একচিলতে করিডোর বা ব্যালকনিতে ভেজা কাপড় মেলে রাখা—এসবই ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। বাথরুম আর অজুখানার ভিড়ের কথা না বলাই ভালো। সৌভাগ্য যে শৈশবে পঁচা পুকুরের সঙ্গ পেয়েছিলাম। কৈশোরে মাদরাসায় পড়াকালীন শেরপুরের পুকুরে পুকুরে সাঁতার কেটেছি; অধিকাংশ পুকুরের স্মৃতি আজও চোখে ভাসে। কলের লৌহমিশ্রিত পানির স্বাদও আজ অম্লমধুর স্মৃতি হয়ে আছে।
বোর্ডিং আর জায়গিরবাড়ির দুঃখ-সুখ হঠাৎ মনে পড়ে যায়। ভালোবাসার সেই দিনগুলো এখনও হৃদয়ে রয়ে গেছে। ডাইনিং টেবিল, রিডিং টেবিল আর ঘুমের জন্য বরাদ্দ দেড়-দুই হাত জায়গা—দারুল ইকামার সীমিত এ পরিসরেই চলত তাকরার, মোতালাআ, স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের আশা-নিরাশার হিসাব। সেই ছোট্ট কামরাতেই বোনা হতো স্বপ্নের জাল, কল্পনার বিস্তার। অথচ ঘুমও হতো সেই দেড়হাত জায়গাতেই। তবু মনে হতো, এ যেন শাহের বাগ, মালির বাগ, ফুলেরই এক আপন ঠিকানা।
আমি বলছি কওমি মাদরাসার আবাসিক জীবনের কথা। অবশ্য ব্যতিক্রমও রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী লালবাগ জামেয়া, পটিয়া জামেয়া, হাটহাজারী জামিয়াসহ অনেক মাদরাসায় তালেবে ইলমদের জন্য পৃথক ও প্রশস্ত দারুস সাকান ও ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা রয়েছে।
সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ সত্ত্বেও কওমি অঙ্গনের নিজস্ব উদ্যোগে গড়ে ওঠা আবাসিক ব্যবস্থাপনা অনেক ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় প্রশংসার দাবিদার। এখানে হলদখল নেই, সিট নিয়ে অভিযোগও তুলনামূলক কম। সব মাদরাসার পক্ষে পৃথক আবাসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তবে যাদের সামর্থ্য রয়েছে, তাদের সমীপেই আজকের এ খসড়া প্রস্তাব।
প্রস্তাবনা
১. কওমি মাদরাসাগুলোতে পর্যাপ্ত অজু ও গোসলখানাসহ পৃথক আবাসিক ছাত্রাবাস নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
২. পৃথক দরসগাহ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ছাত্রাবাসের ব্যবস্থা করা হোক।
৩. প্রত্যেক তালেবে ইলমের জন্য একটি চৌকি এবং একটি পড়ার টেবিল বা তেপায়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
৪. খাবারের জন্য পৃথক কামরা রাখা হোক—যেখানে সবাই একসঙ্গে, একই দস্তরখানে বসে আহার করবে। হয়তো কোনো একদিন এসব স্বপ্ন বাস্তব হবে।
লেখক: আলেম, শিক্ষাবিদ, গবেষক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ।

