Logo

ধর্ম

হজ ও কোরবানি

যে ত্যাগ বিশ্বমানবতাকে শিখিয়েছে ধৈর্য ও আত্মসমর্পণ

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০০:৩৪

যে ত্যাগ বিশ্বমানবতাকে শিখিয়েছে ধৈর্য ও আত্মসমর্পণ

পবিত্র হজ ও কোরবানি ইসলামের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা মুসলিম উম্মাহর ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের প্রতীক। এই ইবাদতের ইতিহাস জড়িয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত হাজেরা (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অসাধারণ আত্মত্যাগের সঙ্গে। তাদের জীবনের ঘটনাগুলো শুধু ধর্মীয় ইতিহাস নয়; বরং মানবতার জন্য ধৈর্য, আত্মসমর্পণ, বিশ্বাস ও সহমর্মিতার এক অনন্য শিক্ষা।

কাবাঘর নির্মাণ ও হজের সূচনা

পৃথিবীর প্রথম ইবাদতগৃহ হলো পবিত্র কাবা শরিফ। মহান আল্লাহ বলেন—নিশ্চয়ই মানুষের জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা তো মক্কায়, যা বরকতময় ও বিশ্ববাসীর জন্য হিদায়াতস্বরূপ।-(সূরা আলে ইমরান: ৯৬)আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) কাবাঘর পুনর্নির্মাণ করেন।

কোরআনে এসেছে—আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহিম ও ইসমাইল কাবাঘরের ভিত্তি স্থাপন করছিল…—(সূরা আল-বাকারা: ১২৭) কাবাঘর নির্মাণের পর আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে হজের ঘোষণা দিতে নির্দেশ দেন—মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে ও বিভিন্ন বাহনে চড়ে দূর-দূরান্ত থেকে।—(সূরা আল-হজ: ২৭) আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমান সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে হজ পালন করতে মক্কায় সমবেত হন।

হাজেরা (আ.)-এর ধৈর্য ও জমজমের অলৌকিক ঘটনা

আল্লাহর আদেশে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) ও শিশু ইসমাইল (আ.)-কে জনমানবহীন মরুভূমিতে রেখে যান। সেখানে খাদ্য ও পানির অভাবে হাজেরা (আ.) সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ান। তাঁর এই ধৈর্য, চেষ্টা ও আল্লাহর ওপর ভরসার প্রতিদান হিসেবে আল্লাহ তাআলা জমজম কূপের ব্যবস্থা করেন।

মহান আল্লাহ বলেন—নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।—(সূরা আল-বাকারা: ১৫৮) হজের সাঈ ইবাদত আজও সেই মহান ত্যাগ ও মায়ের ভালোবাসার স্মৃতি বহন করে।

কোরবানির ইতিহাস ও আল্লাহর পরীক্ষা

কোরবানির মূল ইতিহাস হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনের এক কঠিন পরীক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। আল্লাহ তাআলা স্বপ্নের মাধ্যমে তাঁকে তাঁর প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার নির্দেশ দেন। ইবরাহিম (আ.) আল্লাহর আদেশ পালনে প্রস্তুত হন এবং বিষয়টি পুত্রকে জানালে ইসমাইল (আ.) ধৈর্যের সঙ্গে তা মেনে নেন।

কোরআনে বর্ণিত হয়েছে—হে আমার প্রিয় পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, তোমাকে জবেহ করছি। এখন তোমার মতামত কী?”

সে বলল, “হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।—(সূরা আস-সাফফাত: ১০২) যখন তারা আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ প্রস্তুত হলেন, তখন আল্লাহ তাআলা ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানির জন্য পাঠান।আর আমি তার পরিবর্তে দিলাম জবেহ করার জন্য এক মহান কোরবানি।—(সূরা আস-সাফফাত: ১০৭) এই ঘটনার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি মানুষের রক্ত বা মাংস চান না; বরং মানুষের আন্তরিকতা, তাকওয়া ও আনুগত্যই তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। 

কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য

মহান আল্লাহ বলেন—আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।—(সূরা আল-হজ: ৩৭) তাই কোরবানি কেবল পশু জবেহ করার নাম নয়; বরং নিজের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা, কৃপণতা ও অন্যায় প্রবৃত্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করার শিক্ষা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—কোরবানির দিনের আমলের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ হলো পশু কোরবানি করা।—(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩)

আরেক হাদিসে এসেছে—যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।—(সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)

হজের শিক্ষা: সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মশুদ্ধি

হজ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় মিলনমেলা। এখানে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, রাজা-প্রজা—সব ভেদাভেদ বিলীন হয়ে যায়। সবাই একই পোশাকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হন। এটি ইসলামের সাম্য, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বাস্তব উদাহরণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে।—(সহিহ বুখারি: ১৫২১) হজ মানুষকে ধৈর্য, শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সহনশীলতার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে এটি মানুষকে আল্লাহর প্রতি আরও বেশি বিনয়ী ও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে।

সমাজ ও মানবকল্যাণে কোরবানির তাৎপর্য

কোরবানি সামাজিক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতারও এক অনন্য শিক্ষা। কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়। ইসলাম সবসময় অসহায় ও দরিদ্র মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে স্বার্থপরতা, ভোগবাদ ও নৈতিক অবক্ষয়ের মধ্যে হজ ও কোরবানির শিক্ষা মানুষকে মানবিক মূল্যবোধে ফিরে আসার আহ্বান জানায়। এটি শেখায়—ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মানবকল্যাণই জীবনের আসল উদ্দেশ্য।

ইসলামে ত্যাগের চেতনা

ইসলামের ইতিহাস মূলত ত্যাগের ইতিহাস। হজরত ইবরাহিম (আ.) পরিবারকে মরুভূমিতে রেখে আল্লাহর আদেশ পালন করেছেন, হাজেরা (আ.) কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য হারাননি, আর ইসমাইল (আ.) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে—সত্যিকার ঈমান মানুষকে সর্বোচ্চ ত্যাগের শক্তি দেয়।

মহান আল্লাহ বলেন—বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু—সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।—(সূরা আল-আনআম: ১৬২)

পরিশেষে বলা যায়, হজ ও কোরবানির ইতিহাস আমাদের শুধু অতীতের একটি স্মৃতি মনে করিয়ে দেয় না; বরং মানুষের জীবনে আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ধৈর্য, ত্যাগ ও মানবতার প্রকৃত শিক্ষা তুলে ধরে। হজরত ইবরাহিম (আ.) শিখিয়েছেন আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও ত্যাগ করতে হয়। হাজেরা (আ.) শিখিয়েছেন কঠিন পরিস্থিতিতেও আল্লাহর ওপর ভরসা হারানো যাবে না। আর ইসমাইল (আ.) দেখিয়েছেন ঈমানের পথে আত্মত্যাগই প্রকৃত সফলতা।

আজকের সমাজে যখন মানুষ ভোগবাদ, হিংসা ও স্বার্থপরতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, তখন হজ ও কোরবানির শিক্ষা আমাদের নতুন করে মানবতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার দিকে আহ্বান জানায়। কোরবানি শুধু পশু জবেহ নয়; বরং নিজের ভেতরের অন্যায় প্রবৃত্তিকে দমন করার শিক্ষা। আর হজ শুধু সফর নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের এক মহাপ্রশিক্ষণ।

তাই হজ ও কোরবানির প্রকৃত চেতনা যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে বাস্তবায়িত হয়, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখক : কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার 

ইমেইল :drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন