Logo

ধর্ম

মাযহাবের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

Icon

যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০০:৪৯

মাযহাবের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

​মহান আল্লাহ তাআলা দীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মনোনীত করেছেন। ইসলাম শুধু নামাজ-রোজা আর হজ-জাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনসহ রাজনীতি, অর্থনীতি সর্বক্ষেত্রে ইসলাম ব্যাপ্ত। সর্বক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তাআলার হুকুম প্রযোজ্য। ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি চারটি, যথা—কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস। কুরআন-হাদিসের পরেই ইজমা ও কিয়াসের স্থান।

​ইজমা বলা হয়, যে বিষয়ে কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্ট কোনো দলিল নেই, সেই বিষয়ে সকল মুজতাহিদদের ঐক্যমতকে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে পবিত্র কুরআনকে গ্রন্থ আকারে সংকলন করার ব্যাপারে তাঁদের সবার (সাহাবায়ে কেরাম মুজতাহিদ ছিলেন) একমত হওয়া ইজমার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কোনো বিষয়ে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে তা মানা সকল মুসলমানের ওপর ওয়াজিব।

​কিয়াস বলা হয়, কোনো নতুন মাসআলার সমাধান কুরআন, হাদিস ও ইজমা-তে সরাসরি না পাওয়া গেলে তার কারণ বিশ্লেষণ করে কুরআন-হাদিসে বিদ্যমান অনুরূপ বিষয়ের সঙ্গে তুলনা করে সমাধান বের করাকে। কিয়াসের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কুরআনে মদ হারাম করা হয়েছে; কারণ তা নেশাজাতীয় দ্রব্য, যা মানুষের মস্তিষ্ক বিকৃত করে। এখন আধুনিক যুগে যদি এমন কোনো নতুন মাদক তৈরি হয় যার নাম কুরআনে নেই, কিন্তু সেটিও নেশা তৈরি করে, তবে নেশা তৈরি হওয়ার এই বৈশিষ্ট্যের কারণে কিয়াসের ভিত্তিতে ওই নতুন মাদকটিকেও হারাম ঘোষণা করা হবে।

​ইজমা ও কিয়াস করার অধিকার শুধু মুজতাহিদ আলেমদের রয়েছে। সাধারণ মানুষ বা অল্পশিক্ষিতদের জন্য আবশ্যক হলো তাঁদের ফয়সালা মেনে চলা।

​এক নম্বর মূলনীতি পবিত্র কুরআনের পাতা খুললে আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ তাআলার বিধান সম্পর্কিত নানা আয়াত।

​দুই নম্বর মূলনীতি হাদিসের পাতা খুললে দেখতে পাই সেমেস্ত আয়াতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শ।

​তিন নম্বর মূলনীতি ইজমা, যা কুরআন-হাদিস দ্বারা সুপ্রমাণিত; যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

​চার নম্বর মূলনীতি কিয়াস, তাও কুরআন-হাদিস দ্বারা অনুমোদিত।

​পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:​"হে মুমিনেরা, তোমরা মহান আল্লাহ পাকের আনুগত্য করো এবং আনুগত্য করো রাসুলের, আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা (দ্বীনি বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞানী হিসেবে) কর্তৃপক্ষের অধিকারী তাদেরও।" (সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৪৩)

​অন্য আয়াতে তিনি বলেন: ​"আর যখন তাদের কাছে শান্তি অথবা ভীতিজনক কোনো বিষয় আসে, তখন তারা তা প্রচার-প্রসারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। অথচ যদি তারা বিষয়টি রাসুল এবং তাদের মধ্যে যারা (দ্বীনি বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞানী হিসেবে) কর্তৃপক্ষের অধিকারী তাদের কাছে পেশ করতো, তাহলে সূক্ষ্ম বিচারশক্তির অধিকারী ব্যক্তিরা বিষয়টির যথার্থতা উদ্ঘাটন করতে পারতো।" (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮৩)

​উপরিউক্ত আয়াতদ্বয়ে উল্লেখিত ‘কর্তৃপক্ষের অধিকারী’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো মুজতাহিদ ওলামায়ে কেরাম। যেকোনো বিষয়ের সঠিক সমাধানের জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বারস্থ হওয়ার পাশাপাশি (দ্বীনি বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞানী হিসেবে) কর্তৃপক্ষের অধিকারীগণেরও অনুসরণ করতে মহান আল্লাহ পাক মুসলিম জাতিকে নির্দেশ দিয়েছেন। কাজেই এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

​কুরআন-হাদিস হলো অতল সাগরের মতো। সাগর সেঁচে মুক্তা আহরণের যোগ্যতা ও ক্ষমতা সবার থাকে না। বরং, আহরণ করেন যোগ্য কয়েকজন আর উপকৃত হয় অগণিতজন। ঠিক তেমনি কুরআন-হাদিসের গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়ে শত বিরোধপূর্ণ দলিলনির্ভর মাসায়েল ও দুর্বোধ্য দলিলনির্ভর মাসায়েলের মুক্তা আহরণের যোগ্যতা যাদের আছে, কেবল তারাই সেগুলো আহরণ করতে পারেন। আর অন্যরা তাদের আহরিত মাসায়েল দ্বারা উপকৃত হয়। আরেকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যাবে।

​আমরা জানি, পৃথিবীতে রয়েছে অসংখ্য ওষধি বৃক্ষ। সেগুলোর গুণ আবিষ্কার করা, কোন বৃক্ষের কোন অংশ কোন রোগের ওষুধ—তা সঠিকভাবে নির্বাচন করা এবং সেগুলোকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত করে সেবনযোগ্য করে তোলা নিশ্চয়ই অভিজ্ঞ চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কাজ। সাধারণ মানুষেরা এ ক্ষেত্রে মোটেই পারঙ্গম নয়। আর সকলের পক্ষে তা সম্ভবও নয়। তাই যেকোনো রোগে আক্রান্ত হলে তারা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের দ্বারস্থ হয় এবং বিনা দ্বিধায় তাঁর পরামর্শমাফিক ওষুধ সেবন করে। এখন কোনো রোগী যদি বলে, "আমি যাচাই-বাছাই না করে কেন অমুকের লিখে দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ সেবন করবো? বরং আমি নিজে গিয়ে ওই ওষুধ পরীক্ষা করে দেখবো যে, তা কোন বৃক্ষ থেকে বানানো হয়েছে এবং তার গুণাগুণ কী?" তবে নিশ্চয়ই সবাই তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত মনে করবে। কারণ সবাই জানে, সেই রোগীর যোগ্যতা তার প্রেসক্রিপশন লেখক ডাক্তারের মতো নয়। সে ওষুধ নেড়েচেড়ে দেখেই ডাক্তারের মতো তার গুণাগুণ বর্ণনা করতে পারবে না; পারবে না চিন্তা-গবেষণা করে ওষধি বৃক্ষ থেকে এরকম আরেকটি ওষুধ তৈরি করতে।

​ঠিক তেমনি উচ্চতর চিন্তা-গবেষণা দ্বারা কুরআন-হাদিসের যথার্থ মর্ম ও উদ্দেশ্য অনুধাবন করে মুসলিম জাতির জন্য আমলের সমাধানকৃত সঠিক পথ বের করা কেবল আলেম-মুজতাহিদগণের কাজ। এ ক্ষেত্রে শুধু আলেম হলেই চলে না; বরং ইজতিহাদের যোগ্যতাও থাকতে হয়। আর আলেম হওয়া ছাড়া মুজতাহিদ হওয়া যায় না। তাই আলেম হওয়াও অপরিহার্য।

​শরিয়তের সকল বিধি-বিধান ও মাসায়েল তিন প্রকার, যথা:

১. দৃশ্যত বিরোধপূর্ণ দলিলনির্ভর মাসায়েল,

২. দ্ব্যর্থবোধক দলিলনির্ভর মাসায়েল, এবং

৩. দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট দলিলনির্ভর মাসায়েল।

​কুরআনুল কারিম ও হাদিস সঠিকভাবে বুঝে প্রথম দুই প্রকার বিধি-বিধান ও মাসায়েল বের করে সেগুলোর ওপর আমল করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আদৌ সম্ভবপর নয়। কারণ, পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত আয়াতসমূহের মধ্যে এমন অনেক শব্দ রয়েছে, যেগুলো একাধিক অর্থের সম্ভাবনা রাখে। ফলে, কোনটি প্রকৃত অর্থ বা কোন ক্ষেত্রে কোন অর্থটির ওপর আমল করতে হবে? কুরআনুল কারিমের কোন আয়াতটি আরবি গ্রামারের কোন নীতি অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে? তাই আয়াতটির অর্থ কোন হিসেবে ধরা হবে? কোন আয়াত নাসিখ (রহিতকারী) আর কোন আয়াত মানসুখ (রহিত)? কোন আয়াত খাসদের (বিশেষ ব্যক্তি) উদ্দেশ্যে আর কোন আয়াত আমদের (সাধারণ ব্যক্তি) উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছে? অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট ও সময়কাল কী, কোন আয়াত থেকে কী মাসআলা নির্গত হয়েছে? ইজমা ও কিয়াস দ্বারা কুরআনের আয়াতসমূহ থেকে যুগোপযোগী মাসআলা বের করার সঠিক পদ্ধতি কী এবং কীভাবে সেগুলো বের করতে হবে?

​ঠিক তেমনি কিছু কিছু কুরআনের আয়াত আছে যেগুলো কতিপয় সহিহ হাদিসের সাথে দৃশ্যত সাংঘর্ষিক। সেগুলোর মধ্যে সঠিক সামঞ্জস্য বিধান, কোন হাদিসে কী ধরনের অলংকারশাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেটা দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে? কোন হাদিস কোন ক্ষেত্রে কীভাবে আমলযোগ্য? একাধিক বিরোধপূর্ণ হাদিসের মধ্যে সমন্বয় সাধন, কোন হাদিস দুর্বল হিসেবে বর্জনীয় এবং কোন হাদিস শক্তিশালী হিসেবে গ্রহণযোগ্য? কোন হাদিস ব্যক্তিবিশেষের জন্য খাস আর কোন হাদিস সকলের জন্য আমলযোগ্য? কোন হাদিস দ্বারা কুরআনের কোন আয়াতের ব্যাখ্যা-ব্যালেন্স করা হয়েছে? ইত্যাদি দৃশ্যত বিরোধপূর্ণ দলিলনির্ভর মাসায়েল ও দ্ব্যর্থবোধক দলিলনির্ভর মাসায়েল সম্পর্কিত কুরআনের আয়াত ও হাদিসসমূহের ব্যাপারে সাধারণ মুসলিম জনতা সম্পূর্ণ অজ্ঞ।

​এমনকি এমন মুজতাহিদ কোনো আলেম বর্তমানে নেই, যিনি এ সকল বিষয়ে ইজতিহাদ করার ক্ষেত্রে আগের যুগের সুগভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ ওলামায়ে মুজতাহিদগণের সমতুল্য গণ্য হবেন। বর্তমানে কেউ ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহিমের মতো মুজতাহিদ হওয়ার পরিপূর্ণ যোগ্যতাসম্পন্ন নয়। তাঁদের মতো যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো লোক বর্তমানে বা ভবিষ্যতে পাওয়া গেলেও শরিয়তের যেসব বিষয়ে পূর্ব যুগের মুজতাহিদ আলেমগণ চূড়ান্ত ফয়সালা দিয়ে গেছেন, সেসব বিষয়ে পুনরায় ইজতিহাদ করার দায়িত্ব থেকে তাঁরা সম্পূর্ণ মুক্ত। কারণ ইমাম আবু হানিফা, শাফেয়ী, মালেক, আহমদ ইবনে হাম্বলসহ পূর্ব যুগের মুজতাহিদ ওলামায়ে কেরাম তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং পালন করার ক্ষেত্রে তাঁরা অগ্রবর্তী ছিলেন—যোগ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বের দিক দিয়েও, আবার যুগ হিসেবেও। তাঁরা ছিলেন তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের যুগের মানুষ। ফলে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁদের মাঝে কেবল এক থেকে দুই প্রজন্মের যুগের পার্থক্য ছিল। তাঁদের ইজতিহাদকৃত মাসায়েলও ছিল সঠিক ও নির্ভুল। শত যুগ পরে এখন পুনরায় সেসব মাসায়েল সংস্কার করা তাই অযৌক্তিক। पवित्र কুরআনের ভাষায়, সৎ কাজে অগ্রবর্তীরাই প্রাধান্যযোগ্য এবং মহান আল্লাহ পাকের অধিক নৈকট্যপ্রাপ্ত: ​"আর অগ্রবর্তীরাই তো অগ্রবর্তী, তারাই (আল্লাহর) নৈকট্যপ্রাপ্ত।" (সূরা আল-ওয়াকিয়া, আয়াত: ১০-১১)

​গোটা পৃথিবীতে সর্বজনস্বীকৃত চারটি মাযহাব—হানাফি, শাফেয়ী, মালেকি ও হাম্বলি; সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে উৎসারিত হয়েছে। মাযহাব চারটি কারও নিজস্ব মতাদর্শ নয়। তাই আমাদের জন্য ওয়াজিব হলো, কুরআন-হাদিসের ওপর সঠিকভাবে আমল করার জন্য উপরিউক্ত ইমাম চতুষ্টয়ের ইজতিহাদের দ্বারস্থ হওয়া এবং তাঁদের মাযহাব গ্রহণ করা; অন্যথায় আমাদের পথস্খলন অনিবার্য। এগুলোর মধ্য থেকে যেকোনো একটি মাযহাব গ্রহণ করে সেই অনুযায়ী আমল করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অপরিহার্য।

​একসাথে সবগুলো অথবা দুটি বা তিনটি একসাথে নয়। এর কারণ হিসেবে ওলামায়ে হক বলেন, প্রকৃতপক্ষে এটি হলো শৃঙ্খলামূলক একটি নীতিমালা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, দ্বীনি নিয়ম ঠিক রাখা এবং মানুষকে আত্মপূজারি হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখা। যদি একাধিক মাযহাব গ্রহণ করার অনুমতি থাকতো, তবে মুসলিম জাতি নিজেদের সুবিধামতো একেক সময় একেক মাযহাব থেকে একেকটি মাসআলা গ্রহণ করতো। ফলে, তারা নিজেদের খেয়াল-খুশির পূজারি হয়ে যেত। তাই চতুর্থ শতাব্দীর হাক্কানি ওলামায়ে কেরামের মাধ্যমে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে যে, প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শুধু একটি মাযহাবের অনুসরণ করা অবশ্য-অপরিহার্য। আর শরিয়তের চতুর্থ মূলনীতি 'ইজমা' যদি কোনো বিষয়ে একবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে পরবর্তীদের জন্য তা মানা আবশ্যক হয়ে যায়। এভাবে প্রবৃত্তি পূজার সুবিধাবাদী পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়ে গেছে।

​এবার মাযহাবগুলোর পারস্পরিক মতভেদের ব্যাপারে আলোচনা করা যাক।

​কেবল সেসব মাসআলার ক্ষেত্রেই চার মাযহাবের মুজতাহিদ ওলামাদের মাঝে মতভেদ দেখা যায়, কুরআন-হাদিসে সুস্পষ্টভাবে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। দ্ব্যর্থহীন ও সুস্পষ্ট দলিলনির্ভর মাসায়েলের ক্ষেত্রে মুজতাহিদগণের মাঝে কোনো মতানৈক্য আজ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়নি।

​কুরআন-হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে মুজতাহিদ ও ফকিহ আলেমগণের মতানৈক্য যে জায়েজ, তার প্রমাণ হলো পবিত্র কুরআনের আয়াত-অংশ:

​"তোমরা যে খেজুর বৃক্ষগুলো কর্তন করেছো আর যেগুলোকে কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে দিয়েছো, তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমেই।" (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৫)

​বনু নাজিরের যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর খেজুর গাছগুলো কর্তন করার ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। তাঁদের এক দল গাছগুলো না কাটার পক্ষে ছিলেন, আরেক দল কেটে ফেলার পক্ষে ছিলেন। তবে উভয় দলেরই নিয়ত ছিল সহিহ। যারা না কাটার পক্ষে ছিলেন তাঁদের বক্তব্য ছিল, "শুধু শুধু গাছগুলো কর্তন করার দরকার কী? যুদ্ধে জয়লাভ করলে এগুলো তো আমাদের দখলেই আসবে।" আর যারা কেটে ফেলার পক্ষে ছিলেন তাঁদের কথা ছিল, "এর ফলে ইসলামের দুশমনদের হৃদয়ে অনেক আঘাত লাগবে।" মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন উভয় দলের সিদ্ধান্তকেই সঠিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং তাদের সমর্থনে কুরআনের আয়াত নাজিল করেছেন।

​হাদিস থেকে উদাহরণ হলো—ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহজাব যুদ্ধের দিন (লড়াইয়ের সমাপ্তির দিন) বলেছেন, "কেউ যেন বনু কুরাইজার এলাকায় না পৌঁছে আসরের নামাজ আদায় না করে।" পথিমধ্যে আসরের নামাজের সময় হয়ে গেলে কেউ কেউ বললেন, "আমরা ওখানে পৌঁছার আগে নামাজ আদায় করবো না।" আর কেউ কেউ বললেন, "বরং আমরা এখনই নামাজ পড়ে নেব। কারণ, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে এটা চাননি।" (অর্থাৎ তাঁর নিষেধাজ্ঞা মানে এটা নয় যে, রাস্তায় সালাতের সময় হয়ে গেলেও তা আদায় করা যাবে না। বরং, দ্রুতগতিতে সেখানে পৌঁছার তাগিদ দেওয়ার জন্য তিনি এভাবে বলেছেন।) ব্যাপারটি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উত্থাপন করা হলে তিনি তাদের মধ্য থেকে কাউকেই তিরস্কার করেননি। (সহিহ বুখারি)

​এই হাদিস দ্বারা বোঝা গেল, সাহাবাগণের এক দল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ সরাসরি পালন করেছেন। আরেক দল তাঁর আদেশের ভাবার্থ ধরে সেই অনুযায়ী আমল করেছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সমর্থন উভয় পক্ষেই ছিল; তাই তিনি কাউকে তিরস্কার করেননি।

​উপরিউক্ত আয়াত ও হাদিস দ্বারা এটিই প্রমাণিত হলো যে, রাসুলুল্লাহ কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপস্থিতিতে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের মাঝে শরিয়তের শাখা মাসায়েলের ক্ষেত্রে পারস্পরিক মতানৈক্য ছিল। এভাবে নবী যুগ থেকেই শরিয়তের খুঁটিনাটি মাসায়েলের ক্ষেত্রে মতানৈক্য হয়ে আসছে। আসলে মহান আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ছিল, কিছু বিষয় কুরআনে তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করবেন এবং কিছু বিষয় তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুস্পষ্ট ভাষার মাধ্যমে আমাদেরকে অবহিত করবেন। এছাড়াও কিছু বিষয় এমন রাখবেন, কুরআন-হাদিসে যেগুলোর কোনো স্পষ্ট সমাধান থাকবে না। বরং মুসলিম জাতির মধ্যে যারা শরিয়তের বিধানাবলি সম্পর্কে অভিজ্ঞ আলেম ও মুজতাহিদ, তাঁরা নিজেদের উচ্চতর চিন্তা-গবেষণা দ্বারা অস্পষ্ট কুরআনের আয়াত ও হাদিসসমূহ ঘাটাঘাটি করে সেই সমস্যাগুলোর সমাধান বের করবেন; আর পুরো মুসলিম জাতি তাদের ইজতিহাদকৃত মাসায়েল দ্বারা উপকৃত হবে। রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা যদি এমনটি নাই হতো, তবে কেন তিনি কুরআনে দৃশ্যত বিরোধপূর্ণ দলিলনির্ভর মাসায়েল ও দ্ব্যর্থবোধক দলিলনির্ভর মাসায়েল সমৃদ্ধ আয়াতসমূহ বর্ণনা করেছেন? কেন তাঁর হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দৃশ্যত বিরোধপূর্ণ দলিলনির্ভর মাসায়েল ও দ্ব্যর্থবোধক দলিলনির্ভর মাসায়েল সমৃদ্ধ হাদিসসমূহ বর্ণনা করেছেন?

​অবশেষে সুপ্রমাণিত সিদ্ধান্তমূলক কথা এটিই হলো—নিজেদের ঈমান-আমলের সুরক্ষার জন্য সর্বজনস্বীকৃত চার মাযহাবের যেকোনো একটি গ্রহণ করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অবশ্য-অপরিহার্য।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন