Logo

ধর্ম

প্রভুর ডাকে কাবার পথে

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ০৭:৫৬

প্রভুর ডাকে কাবার পথে

​মানুষের জীবনে কিছু ডাক আছে—যা কানে শোনা যায় না, হৃদয়ে শোনা যায়। সে ডাক পাহাড় ভেদ করে আসে না, মেঘের গর্জন হয়ে নামে না; তবুও তার শক্তি সমুদ্রের জোয়ারের মতো প্রবল। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে হঠাৎ কোনো এক মানুষ সব হিসাব ভুলে কেঁদে ওঠে—'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।' তখন বোঝা যায়, তাকে ডাকা হয়েছে। তিনি সৌভাগ্যবান। কারণ সব মানুষ কাবার পথে হাঁটে না, সবাইকে ডাকা হয় না।

​কাবা শুধু একটি ঘর নয়। এটি পৃথিবীর বুকে স্থাপিত প্রথম ইবাদতের কেন্দ্র। হযরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম যে ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, সেই ঘর আজও কোটি মানুষের অশ্রু, আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। পৃথিবীর যেদিকেই মুসলমান থাকুক, দিনে পাঁচবার সে মুখ ফেরায় কাবার দিকে। অথচ একসময় আসে, যখন সে শুধু মুখ নয়—পুরো জীবনটাই ঘুরিয়ে নেয় সেই ঘরের পথে।

​প্রভুর ডাকে কাবার পথে বের হওয়া আসলে এক আত্মিক যাত্রা। এটি বিমানবন্দরের যাত্রা নয়, হৃদয়ের ভেতর থেকে শুরু হওয়া সফর। এ সফরের শুরু হয় তওবা দিয়ে। মানুষ তখন নিজের অতীতকে দেখে, গুনাহকে মনে করে, ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত হয়। পৃথিবীর চাকচিক্য, অহংকার, সম্পদ—সবকিছু তখন ছোট হয়ে আসে। সাদা দুই টুকরো কাপড় পরে যখন একজন মানুষ ইহরাম বাঁধে, তখন সে যেন পৃথিবীর সব পরিচয় খুলে ফেলে। নেই কোনো রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-অসহায়। সবাই তখন এক পরিচয়ে পরিচিত—'আল্লাহর বান্দা'।

​মীকাত অতিক্রম করার আগে হৃদয়ে যে কম্পন জাগে, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে বড় সাক্ষাতের পথে এগিয়ে চলেছি। চোখে অশ্রু জমে, ঠোঁটে তাসবিহ ঝরে, বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন ওঠে। চারদিকের মানুষ একসঙ্গে যখন 'লাব্বাইক' ধ্বনি তোলে, তখন মনে হয় আকাশও যেন সাড়া দিচ্ছে। ফেরেশতারা হয়তো শুনছে পৃথিবীর ক্লান্ত মানুষের আর্তি—'হে আল্লাহ! আমরা এসেছি, আপনার ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছি।'

​মক্কার মাটিতে প্রথম পা রাখার অনুভূতি অন্যরকম। এ মাটি ইতিহাসের, এ মাটি রহমতের, এ মাটি নবীদের পদচিহ্নে ধন্য। এখানে প্রতিটি বাতাসে যেন ঈমানের ঘ্রাণ মিশে আছে। শত কোলাহলের মাঝেও হৃদয় এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে যায়। তারপর সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—প্রথমবার কাবা দেখা।

​মানুষ বলে, পৃথিবীতে কিছু দৃশ্য আছে যা মানুষকে নির্বাক করে দেয়। কাবা তার চেয়েও বেশি কিছু। কালো গিলাফে আবৃত সেই মহান ঘর যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তখন মনে হয় হৃদয়ের সব দরজা খুলে গেছে। কেউ কাঁদে, কেউ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ দু’হাত তুলে মোনাজাতে ডুবে যায়। মনে হয়, জীবনের সমস্ত পাপ, ব্যর্থতা, ক্লান্তি—সবকিছু নিয়ে প্রভুর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছি। তিনি ফিরিয়ে দেবেন না।

​তাওয়াফের প্রতিটি চক্কর যেন জীবনের একেকটি অধ্যায়। বান্দা ঘুরছে, আর তার হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। দুনিয়ার সব কেন্দ্র তখন মুছে যায়। ক্ষমতা নয়, অর্থ নয়, খ্যাতি নয়—কেবল আল্লাহ। হাজরে আসওয়াদের দিকে তাকালে মনে পড়ে যায় হাজার বছরের ইতিহাস। কত নবী, কত অলী, কত প্রেমিক এ পাথরের সামনে দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন! আজ সেই কাতারে নিজেকেও দেখে মানুষ অভিভূত হয়ে যায়।

​সাফা-মারওয়ার সাঈ মানুষকে আরেক শিক্ষা দেয়। হযরত হাজেরা আলাইহাস সালামের সেই ছুটে চলা আজও মানবতার হৃদয়ে অম্লান। সন্তানের জন্য এক মায়ের ব্যাকুলতা, আল্লাহর ওপর অগাধ ভরসা এবং অসীম ধৈর্য—এ যেন ঈমানের জীবন্ত প্রতীক। মানুষ যখন সাফা থেকে মারওয়া ছুটে যায়, তখন সে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করে না; বরং উপলব্ধি করে, জীবনে আশা হারানো যাবে না। আল্লাহর রহমত ঠিকই জমজমের পানির মতো উৎসারিত হবে।

​আরাফার ময়দান যেন কিয়ামতের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। সাদা কাপড়ে আচ্ছাদিত অগণিত মানুষ, চোখে অশ্রু, হাতে দোয়া—যেন মানুষ তার রবের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবননামা পেশ করছে। এখানে কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়। সবাই ক্ষমাপ্রার্থী। কেউ নিজের জন্য কাঁদে, কেউ মা-বাবার জন্য, কেউ সমগ্র উম্মাহর জন্য। এ ময়দানে দাঁড়িয়ে মানুষ অনুভব করে—পৃথিবীর জীবনে যত পাপই করুক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বিশাল।

​মুযদালিফার খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষকে সরলতার শিক্ষা দেয়। বিলাসী জীবনের মানুষও তখন খোলা মাটিতে ঘুমায়। বুঝতে শেখে, পৃথিবীর সব আরাম ক্ষণস্থায়ী। মিনায় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করতে গিয়ে মানুষ আসলে নিজের ভেতরের অহংকার, হিংসা, লোভ ও কুপ্রবৃত্তিকেই আঘাত করে। সে যেন ঘোষণা দেয়—'আমি আর শয়তানের পথে চলব না।'

​হজ শেষে মানুষ যখন ফিরে আসে, তখন সে আগের মানুষ থাকে না। বাহ্যিক চেহারা একই থাকলেও হৃদয়ের ভেতর ঘটে যায় বিশাল পরিবর্তন। কাবার সামনে কাঁদতে কাঁদতে সে বুঝে যায়, পৃথিবী চিরস্থায়ী নয়। মানুষ, সম্পদ, ক্ষমতা—সব একদিন ফেলে যেতে হবে। কেবল আমলই সঙ্গে যাবে।

​প্রভুর ডাকে কাবার পথে যাওয়া তাই শুধু একটি সফর নয়; এটি আত্মার পুনর্জন্ম। এ যাত্রায় মানুষ নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায়। তার হৃদয় নরম হয়, চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, আত্মা পবিত্র হয়। সে উপলব্ধি করে—পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়া।

​কত মানুষ আছে, যাদের হৃদয় কাবার জন্য কাঁদে! কেউ অর্থের অভাবে যেতে পারে না, কেউ শারীরিক অসুস্থতায় থেমে যায়, কেউ অপেক্ষায় থাকে বছরের পর বছর। তবুও তাদের হৃদয়ে একটি স্বপ্ন বেঁচে থাকে—একদিন প্রভু ডাকবেন, একদিন কাবার সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে পারব।

​আসলে কাবার পথে হাঁটা মানেই প্রভুর দিকে ফিরে আসা। মানুষ যত দূরেই চলে যাক, শেষ পর্যন্ত তার হৃদয় শান্তি খোঁজে আল্লাহর কাছেই। পৃথিবীর সব রাস্তা একসময় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কাবার পথ মানুষকে পৌঁছে দেয় অনন্ত শান্তির দরজায়।

​আর তাই আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে একই আকুতি—'হে আল্লাহ! একবার ডাকুন। একবার আপনার ঘরের মেহমান হওয়ার তাওফিক দিন। আমরা ক্লান্ত পৃথিবী থেকে আপনার দয়ার ছায়ায় আশ্রয় নিতে চাই।'

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন