পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু ভূখণ্ড আছে, যেখানে আনন্দের দিনেও বিষাদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়; উৎসবের রঙ যেখানে আলো ছড়ায় না। ফিলিস্তিন, বিশেষত গাজা উপত্যকা তেমনই এক নাম। মুসলিম জাহানের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ যখন বিশ্বজুড়ে শান্তি ও মিলনের বার্তা নিয়ে আসে, ফিলিস্তিনিদের কাছে তা কেবলই স্বজন হারানোর শোক আর ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রাম। এবারের ঈদও তার ব্যতিক্রম নয়। যেখানে নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার আর কোলাকুলির দৃশ্য থাকার কথা, সেখানে গাজার শিশুরা দেখছে বোমার ধোঁয়া, ক্ষুধার জ্বালা আর তাঁবুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ইসরাইল-হামাস সংঘাতের ফলে গাজা আজ মানবসৃষ্ট এক মহাদুর্যোগের প্রতীক।
১. মানবতার চরম সংকট
গাজার পরিসংখ্যান আজ মানবিকতার ন্যূনতম মূল্যের অবক্ষয়কে ফুটিয়ে তুলছে। ইসরাইলি বাহিনীর একতরফা সামরিক অভিযানে গাজায় নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে প্রায় ষাট হাজারের কোটা ছাড়িয়েছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি নারী ও শিশু। মাইলের পর মাইল বাড়িঘর, মসজিদ, হাসপাতাল ও বিদ্যালয় আজ কেবল ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন বহন করছে। যারা প্রাণে বেঁচে আছেন, তারা খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার চরম সংকটে ভুগছেন। ইসরাইলি অবরোধের কারণে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার লাখ লাখ মানুষ আজ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। বিশুদ্ধ জলের অভাব এবং স্যানিটেশন বিপর্যয়ের ফলে বিভিন্ন মহামারি ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ নেই, এমনকি হাসপাতালগুলো নিজেই হামলার টার্গেটে পরিণত হয়েছে।
২. বাস্তুচ্যুতির যন্ত্রণা
সংঘাতের তীব্রতা গাজাবাসীকে বারবার বাস্তুচ্যুত করেছে। উত্তর গাজা থেকে প্রায় সমগ্র জনসংখ্যাকে দক্ষিণ দিকে, বিশেষ করে রাফাহ শহরের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তথাকথিত সেই নিরাপদ অঞ্চলও রেহাই পায়নি। লাখ লাখ মানুষ এখন প্লাস্টিকের অস্থায়ী তাঁবুতে তীব্র শীত ও গরমে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ঈদের দিন সকালে যেখানে শিশুরা সালামি আর আনন্দের অপেক্ষায় থাকার কথা, সেখানে গাজার শিশুরা ক্ষুধার্ত পেটে বোমার শব্দে জেগে ওঠে। ঈদ সালামির বদলে কপালে জোটে এক টুকরো ত্রাণের শুকনো রুটি। স্বজন হারানোর শোক এই ঈদকে বিষাদে ঢেকে দিয়েছে। ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, গাজার প্রায় সব শিশুই আজ তীব্র মানসিক ট্রমা ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার অভাবে ভুগছে।
৩. আন্তর্জাতিক নীরবতা ও ফিলিস্তিনিদের দৃঢ়তা
ফিলিস্তিনের এই চলমান বিপর্যয় আন্তর্জাতিক সমাজকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। অনেক রাষ্ট্র সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানালেও কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একাধিকবার যুদ্ধবিরতি ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও আমেরিকা ও জার্মানির মতো দেশগুলোর ভেটো ক্ষমতার কারণে তা কার্যকর করা যায়নি। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা হলেও সংঘাতের তীব্রতা কমেনি।
তবে এই চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে এক অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা দেখা যায়। বছরের পর বছর চলা অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞের মুখেও তারা তাদের ভূমি এবং অধিকারের প্রতি অবিচল। শত্রুর আগ্রাসনের মধ্যেও তারা তাদের পরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
উপসংহার
ফিলিস্তিনের আজকের অবস্থা বিশ্ব বিবেকের কাছে এক কঠিন প্রশ্ন। এটি কেবল সামরিক সংঘাত নয়, বরং মানবিকতার চরম অবমাননা। ফিলিস্তিনিদের জন্য সত্যিকারের ঈদ তখনই আসবে, যখন তাদের অস্থায়ী তাঁবুগুলো আর থাকবে না, শিশুরা নির্ভয়ে খেলবে এবং আল-আকসার মিনার থেকে স্বাধীন সুমধুর আজান ভেসে আসবে। আজ আমাদের সকলের দায়িত্ব গাজার মানুষের এই কান্নাকে ভুলে না যাওয়া। ফিলিস্তিনের মাটি থেকে রক্ত মুছে গিয়ে যেন আবার ফুটতে পারে নতুন ভোরের গোলাপ। মহান আল্লাহ ইসরাইলের অন্যায় আগ্রাসন থেকে গাজাবাসীদের হেফাজত করুন। ঈদ বয়ে আনুক অনাবিল শান্তি। আমিন।
লেখক: প্রাবন্ধিক; সালনা, গাজীপুর
jony90siddique@gmail.com

