কোরবানি ইসলামের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন, আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া বৃদ্ধি এবং পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ ত্যাগ, উৎসর্গ, আত্মনিবেদন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রিয় বস্তু ও সম্পদ বিসর্জন দেওয়া। শরিয়তের পরিভাষায়, ঈদুল আজহার দিনগুলোতে নির্দিষ্ট পশু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবেহ করাই হলো কোরবানি।
কোরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ঈমানের গভীরতা, ইবরাহিমি ত্যাগের পুনর্জাগরণ এবং মানবিক মূল্যবোধের বাস্তব অনুশীলন।
কোরবানির ঐতিহাসিক ভিত্তি
কোরবানির ইতিহাস মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই বিদ্যমান। পবিত্র কুরআনে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে: "যখন তারা উভয়ে কোরবানি করল, তখন একজনের কোরবানি কবুল করা হলো এবং অন্যজনেরটা কবুল হলো না।" (সূরা আল-মায়িদা: ২৭)
এর মাধ্যমে প্রতীয়মান হয় যে, কোরবানির মূল ভিত্তি হলো নিয়ত ও তাকওয়া। পরবর্তীতে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর মহান আত্মত্যাগ কোরবানির চূড়ান্ত আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "অতঃপর আমি তাকে (ইসমাইলকে) এক মহান কোরবানির মাধ্যমে মুক্ত করলাম।" (সূরা আস-সাফফাত: ১০৭)
কোরবানির মৌলিক নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন: "তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করো এবং কোরবানি করো।" (সূরা আল-কাউসার: ২)
কোরবানির বিধান ও শরয়ি গুরুত্ব
যে মুসলমান প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, স্বাধীন এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব (হানাফি মাযহাব মতে) বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা (অন্যান্য মাযহাব অনুযায়ী অত্যন্ত তাগিদপূর্ণ সুন্নত)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন: "যার সামর্থ্য আছে অথচ সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।" (ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)
নিসাব ও আর্থিক শর্ত
ঈদুল আজহার দিনগুলোতে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ) কারো কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিম্নোক্ত পরিমাণ সম্পদ থাকলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়:
৭.৫ তোলা/ভরি সোনা অথবা
৫২.৫ তোলা/ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স, ব্যবসায়িক পণ্য, বন্ড/শেয়ার বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি/সম্পদ।
(উল্লেখ্য, কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে যাকাতের মতো সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়, জিলহজের ওই দিনগুলোতে থাকলেই হবে।)
কোরবানির শর্তাবলি
১. নির্ধারিত পশু:
শরিয়ত নির্ধারিত গৃহপালিত পশু (আনাম) ছাড়া কোরবানি গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো হলো: উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। আল্লাহ বলেন:
"আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি..." (সূরা আল-হজ: ৩৪)
২. পশুর বয়সসীমা:
উট: ন্যূনতম ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
গরু ও মহিষ: ন্যূনতম ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: ন্যূনতম ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।
বিশেষ ছাড়: ৬ মাস বা তার চেয়ে বড় বয়সের ভেড়া/দুম্বা যদি দেখতে ১ বছর বয়সীর মতো হৃষ্টপুষ্ট দেখায়, তবে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ। (সহিহ মুসলিম: ১৯৬৩)। তবে ছাগলের ক্ষেত্রে অবশ্যই ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।
৩. পশু নিখুঁত ও দোষমুক্ত হওয়া:
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, চার ধরনের পশু দিয়ে কোরবানি করা বৈধ নয়:
যার এক বা উভয় চোখের অন্ধত্ব স্পষ্ট।
যে পশু স্পষ্টত অসুস্থ।
যে পশু স্পষ্টত খোঁড়া (যা জবেহর স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না)।
এমন জীর্ণ-শীর্ণ বা দুর্বল পশু, যার হাড্ডিতে মজ্জা নেই। (আবু দাউদ: ২৮০২)
৪. মাকরূহ গুণাবলি:
যেসব পশুর শিং গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, কান বা লেজের অধিকাংশ কাটা, ওলান কাটা অথবা অত্যন্ত দুর্বল—সেগুলো দিয়ে কোরবানি করা মাকরূহ। যথাসম্ভব নিখুঁত পশু কোরবানি করা উত্তম।
৫. হালাল উপার্জন:
কোরবানির পশু অবশ্যই সম্পূর্ণ হালাল উপার্জনের টাকা দিয়ে কিনতে হবে। হারাম বা সন্দেহজনক অর্থ দ্বারা কোরবানি কবুল হয় না। আল্লাহ বলেন: "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।" (সূরা আন-নিসা: ২৯)
কোরবানির নিয়মাবলি ও অংশীদারিত্ব
১. নিয়ত:
কোরবানি সম্পূর্ণ ইখলাসের সাথে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হতে হবে। রাসুল (সা.) বলেন: "নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।" (সহিহ বুখারি: ১)। কোনো অংশীদারের নিয়তে যদি লোকদেখানো বা শুধু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্য থাকে, তবে কারোর কোরবানিই কবুল হবে না।
২. অংশীদারিত্বের বিস্তারিত বিধান (ভাগাভাগি):
উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ ৭ জন অংশ নিতে পারেন। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সাথে হজের ইহরাম বেঁধে বের হলাম... অতঃপর তিনি আমাদের নির্দেশ দিলেন যেন আমরা উট ও গরুতে সাতজন করে শরিক হই।" (সহিহ মুসলিম: ১৩১৮)।
১ জন ব্যক্তি পুরো গরু কোরবানি করলে: তিনি নিজেই সম্পূর্ণ অংশের মালিক। আলাদা অংশীদার খোঁজার প্রয়োজন নেই।
৩ বা ৪ জন মিলে কোরবানি করলে: তারা ৭ অংশের মধ্যে যেকোনো অনুপাতে (যেমন: ৩+২+২ বা ২+২+৩ অথবা সমান ভাগে) শরিক হতে পারেন। তবে শর্ত হলো—কারো অংশ যেন ১ সপ্তমাংশ (১/৭) এর কম না হয় এবং প্রত্যেকের অংশ ও আর্থিক অবদান সুনির্দিষ্ট হতে হবে।
৩. কোরবানির সময়:
১০ জিলহজ ঈদের সালাতের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। রাসুল (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পূর্বে জবেহ করল সে নিজের জন্যই জবেহ করল (তা কোরবানি নয়)। আর যে সালাতের পর জবেহ করল তার কোরবানি পূর্ণ হলো।" (সহিহ বুখারি: ৫৫৬২)
৪. জবেহ করার পদ্ধতি:
পশুকে কিবলামুখী করে শোয়াতে হবে। ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত জবেহ করতে হবে যেন পশুর কষ্ট কম হয়। জবেহর সময় উচ্চস্বরে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে।
আদব, সামাজিক ও অতিরিক্ত বিধান
পশুর প্রতি দয়া: একটি পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ করা কিংবা পশুর প্রাণ সম্পূর্ণ যাওয়ার আগে চামড়া ছিলানো বা কাটাকুটি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
গোশত বণ্টন: কোরবানির গোশত তিন ভাগে বণ্টন করা মুস্তাহাব বা উত্তম। ১/৩ অংশ নিজের জন্য, ১/৩ অংশ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং ১/৩ অংশ দরিদ্রদের জন্য। আল্লাহ বলেন: "তোমরা তা থেকে আহার করো এবং দুস্থ-দরিদ্রদের খাওয়াও।" (সূরা আল-হজ: ২৮)
চামড়ার বিধান: কোরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার করতে পারেন। তবে বিক্রি করলে তার সম্পূর্ণ মূল্য গরিব-মিসকিন বা এতিমখানায় সদকা করে দিতে হবে। জবেহকারী বা কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির গোশত বা চামড়ার টাকা দেওয়া জায়েজ নয়।
সমসাময়িক বাস্তবতা: শরিয়তের নিয়ম ও পশুর বয়স-যোগ্যতা ঠিক রেখে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, এনজিও বা কোনো ট্রাস্টের মাধ্যমে দূরবর্তী স্থানে কোরবানি দেওয়া জায়েজ, যদি তারা বিশ্বস্ততার সাথে জবেহ ও গোশত বণ্টন নিশ্চিত করে।
আধ্যাত্মিক ও সামাজিক শিক্ষা
কোরবানি আমাদের শেখায় আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের অহমিকা, পশুত্ব ও প্রিয় বস্তুকে বিসর্জন দেওয়ার মহান শিক্ষা। এটি সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমায় এবং পারস্পরিক সহমর্বিতা বৃদ্ধি করে। আল্লাহ তাআলা চমৎকারভাবে কোরবানির মূল চেতনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন: "আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত বা রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।" (সূরা আল-হজ: ৩৭)
পরিশেষে
কোরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উৎসব নয়, বরং এটি আল্লাহর প্রতি মুমিনের পরম আনুগত্যের পরীক্ষা। সঠিক নিয়ম ও বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানি আদায়ের মাধ্যমেই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়ম মেনে সহিহভাবে কোরবানি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার। ইমেইল: drmazed96@gmail.com

