Logo

ধর্ম

শান্তিময় জীবনের পাথেয়

Icon

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৬, ১৫:২৮

শান্তিময় জীবনের পাথেয়

​মানুষের জীবনের দৌড়ঝাঁপ, সংগ্রাম, শ্রম আর সাধনার অন্তরালে লুকিয়ে আছে একটি গভীর আকাঙ্ক্ষা, তাহলো একটুখানি শান্তি ও একটুখানি প্রশান্তি। কেউ মনে করে বিপুল অর্থ-সম্পদের মাঝেই সুখ নিহিত, কেউ আবার ক্ষমতার উচ্চ আসনে বসে শান্তি খুঁজে বেড়ায়। আবার কেউ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলে হৃদয়ের শূন্যতা পূরণের আশায়। কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম, বাহ্যিক চাকচিক্যের সাথে পাল্লা দিয়ে অন্তরের অস্থিরতা গভীর হতে থাকে।

​দিনশেষে মানুষ যখন ক্লান্ত শরীর নিয়ে নিভৃত কক্ষে ফিরে আসে, তখন চারপাশের কোলাহল থেমে গেলেও মনের ভেতরের ঝড় থামে না। চোখে ঘুম আসে না, বুকের ভেতর অজানা চাপা কষ্ট। অদৃশ্য ভয় আর শূন্যতা কুরে কুরে খেতে থাকে। হাসিতেও ঝুলে থাকে বিষণ্নতা। আত্মবিশ্বাসের আবরণেও লুকিয়ে থাকে হতাশা। বর্তমান বিশ্বে এই মানসিক অস্থিরতা কেবল দুই-একজন মানুষের সমস্যা নয়, বরং এটা একটা মহামারিতে রূপ ধারণ করেছে।

​বিশেষ করে আমরা যেন এর ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি আরও স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি। বাহ্যিক উন্নয়ন, প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর আধুনিকতার চমক সত্ত্বেও মানুষের হৃদয় থেকে শান্তি হারিয়ে যাচ্ছে ও প্রশান্তি বিদায় নিচ্ছে। পরিবারে অশান্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, তরুণ সমাজের হতাশা, উদ্বেগ, uncertainty (অনিশ্চয়তা) এবং আত্মিক শূন্যতা দিন দিন বেড়েই চলছে। মানুষ সবকিছু পেয়েও যেন কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছে।

প্রশান্তির চাবিকাঠি

​কিন্তু আশার কথা হলো, এই প্রশান্তির চাবিকাঠি আমাদের নাগালের বাইরের কোনো জিনিস নয়। আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে অন্ধকারে ছেড়ে দেননি, বরং তিনি আমাদের জন্য পাঠিয়েছেন ইসলাম নামে এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এই ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়, বরং এটি এমন এক সুশীতল ছায়া, যেখানে ক্লান্ত হৃদয় খুঁজে পায় প্রশান্তি, বিপর্যস্ত মন খুঁজে পায় স্থিরতা আর দিশেহারা মানুষ পায় জীবনের প্রকৃত অর্থ।

শান্তির সংজ্ঞা ও মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা

​মানুষের ফিতরাত তথা সৃষ্টিগত স্বভাবের মধ্যেই প্রশান্তি লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা গেঁথে দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: 'তিনিই মুমিনদের অন্তরে প্রশান্তি অবতীর্ণ করেছেন, যাতে তাদের ঈমানের সাথে আরও ঈমান বৃদ্ধি পায়।' (সূরা ফাতহ: ০৪)

​শান্তি কোনো বাহ্যিক উপকরণের নাম নয়। এটি হৃদয়ের এমন একটি অবস্থা যেখানে ভয়, দুশ্চিন্তা এবং হতাশা মানুষকে গ্রাস করতে পারে না। দেশের মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে দেখা যায়, নুন আনতে পান্তা ফুরালেও অনেকের চেহারায় অদ্ভুত এক তৃপ্তি থাকে। আবার গুলশান-বনানীর আলিশান প্রাসাদে থেকেও অনেকের ঘুম ওষুধের ওপর নির্ভরশীল। এখান থেকেই প্রমাণিত হয়, শান্তি বাজার থেকে কেনা যায় না; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা একটি বিশেষ নেয়ামত।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও অস্থিরতার কারণ

​আজকের সমাজে আমরা এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, পরশ্রীকাতরতা এবং আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাদের শান্তিময় জীবনকে বিষিয়ে তুলছে।

​জাগতিক মোহ ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা: পাশের বাসার মানুষটি নতুন গাড়ি কিনলে নিজের ভেতরে যে অতৃপ্তি তৈরি হয়, তা থেকেই অশান্তির শুরু। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের মানুষের দিকে তাকাও (পার্থিব বিষয়ে), তবেই তোমরা আল্লাহর নেয়ামতকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে না।' (সহীহ মুসলিম-২৯৬৩)

​পারিবারিক বিচ্ছেদ ও একাকীত্ব: পরিবার ভেঙে আলাদা হয়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে একাকীত্ব বাড়ছে। আপনজনদের সান্নিধ্যহীন জীবন মানুষকে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

​সুদ ও হারামের প্রভাব: দেশের অর্থনীতিতে সুদের ব্যাপকতা বস্তুসমূহ থেকে বরকত কেড়ে নিয়েছে। হারাম উপার্জন মানুষের মনে অশান্তি আর অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।

প্রকৃত শান্তির উৎস: আল্লাহর জিকির

​আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে শান্তির একটি চিরন্তন ফর্মুলা দিয়েছেন। ঘোষণা করেন: 'জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।' (সূরা আর-রাদ: ২৮)

​জিকির মানে শুধু তাসবিহ পাঠ নয়, বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহকে স্মরণে রাখা। একজন রিকশাচালক যখন তপ্ত রোদে ঘামতে ঘামতে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলেন, তখন তার হৃদয়ে যে শীতলতা নেমে আসে তা কোটি টাকার এসিতেও সম্ভব নয়। মানুষের ঈমানি শক্তিই তাদের অনেক প্রতিকূলতার মাঝেও শান্ত রাখে।

সালাত ও তিলাওয়াত: মুমিনের প্রশান্তির মহৌষধ

​অস্থিরতা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো নামাজ। যখনই রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো সংকটে পড়তেন, তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি বিলাল (রা.)-কে বলতেন: 'হে বিলাল, আজানের মাধ্যমে আমাদের প্রশান্তি দাও।' (সুনানু আবি দাউদ-৪৯৮৫)

জীবন পরিচালনার ঐশী ছক: দিন ও রাতের সঠিক ব্যবহার

​শান্তিময় জীবনের জন্য আল্লাহ তাআলা একটি রুটিন করে দিয়েছেন। সুরা নাবায় বলা হয়েছে: 'আমি রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ এবং দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।'

​আধুনিক বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের এক বড় সমস্যা হলো 'রাত জাগা'। পশ্চিমা সংস্কৃতি অনুকরণ করতে গিয়ে আমরা রাতকে কাজের এবং দিনকে ঘুমের সময় বানিয়ে ফেলেছি। এর ফলে শরীরে ভারসাম্যতা নষ্ট হচ্ছে, যা সরাসরি মানসিক বিষণ্নতার কারণ। ইসলামে এশার পর দ্রুত ঘুমানো এবং শেষ রাতে বা ভোরে জাগ্রত হওয়ার প্রতি উৎসাহ রয়েছে, যা শারীরিক ও মানসিক শান্তির অন্যতম সোপান।

সমাধান: শান্তির পথে প্রত্যাবর্তন

​একটি শান্তিময় ও কল্যাণময় জীবনের জন্য আমাদের নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:

​তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অর্জন করা: যে আল্লাহকে ভয় পায় তাকে দুনিয়ার অন্য কিছু ভয় দেখাতে পারে না।

​অল্পে তুষ্টি (কানাআত): যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। এটিই হলো প্রকৃত সচ্ছলতা।

​সুন্নাহভিত্তিক জীবনযাপন: খাওয়া, ঘুমানো এবং মানুষের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর আদর্শ অনুসরণ করা।

​সোশ্যাল মিডিয়ার পরিমিত ব্যবহার: অন্যের কৃত্রিম সুখ দেখে নিজের জীবনকে ছোট মনে না করা।

​পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা: পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক রাখা হৃদয়ের অস্থিরতা কমায়।

পরিশেষে

​শান্তিময় জীবন কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া একটি বিশেষ পুরস্কার, যা কেবল তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। আমরা যদি বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে কুরআন ও সুন্নাহর চর্চা শুরু করতে পারি, তবে আমাদের সমাজ থেকে ঘৃণা, অস্থিরতা এবং হতাশা দূর হবে।

​জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের এই সফর যেন কেবল দুনিয়ার পেছনে ছুটে শেষ না হয়। আমরা যেন সেই দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন: 'হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে আসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।'

লেখক: শিক্ষক, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন