সংগৃহীত
পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হাজিরা এখন নিজ নিজ দেশে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাচ্ছেন। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন দীর্ঘ সফরের মূল্যবান স্মৃতি, সারাজীবন কাজে লাগানোর মতো অজস্র শিক্ষা এবং এক অনন্য আধ্যাত্মিক অনুভূতি।
তবে নিজ দেশে ফেরার পর মানুষ আবার চেনা ব্যস্ততা, অলসতা আর পাপের পরিবেশের মুখোমুখি হয়। আল্লাহর মেহমান হিসেবে কাটানো চমৎকার দিনগুলোর পর এমন প্রতিকূল পরিবেশে নিজের আধ্যাত্মিকতা ধরে রাখা বেশ কঠিন, অনেকের জন্য অসম্ভবও বটে। অথচ হজের আসল পরীক্ষা শুরু হয় বাড়ি ফেরার পর। কিন্তু চারপাশের বৈষয়িক পরিবেশ অনেক সময় সেই সুন্দর পরিকল্পনাগুলোকে ধূলিসাৎ করে দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন। তারা ভাবেন, হজের ওই অনন্য অনুভূতি হয়তো সাময়িক এক আবেগ, যা দিন বা মাস অতিবাহিত হওয়ার পর ধরে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। নিয়ত যদি খাঁটি হয়, আল্লাহর কাছে যদি মন থেকে দোয়া করা যায় এবং নিজের চেষ্টা অব্যাহত থাকে, তবে অবশ্যই আধ্যাত্মিকতার একটি ভালো স্তরে নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব।
দেশে ফিরে হজের শিক্ষা ধরে রাখতে এবং ঈমানি চেতনা সজীব রাখতে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ তুলে ধরা হলো:
১. বিনয়ী হোন
হজের সফর শেষ করে এসেছেন বলেই নিজেকে অন্যের চেয়ে ধর্মীয়ভাবে শ্রেষ্ঠ ভাববেন না। এই সফরের কারণে আপনার সামাজিক মর্যাদা বদলে যায়নি। হাজি উপাধিটি আসলে একটি বড় দায়িত্ব। আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে গুনাহ মাফের এক মহা সুযোগ পেয়েছেন, এখন আপনার কাজ হলো একটি নতুন জীবন শুরু করা। বিনয়ী থাকুন, অন্যদেরও হজে যেতে অনুপ্রাণিত করুন এবং নিজের হজকে জীবনের সেরা প্রাপ্তি ধরে নিয়ে যাপন করার চেষ্টা করুন, যেন মহান আল্লাহ আপনার ওপর সন্তুষ্ট থাকেন।
২. আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে সেই আমলগুলো সবচেয়ে প্রিয় যা নিয়মিত করা হয়, তা পরিমাণে যতই কম হোক না কেন। হজের সফরে আপনি যেভাবে দিন-রাত ইবাদত করেছেন, ঘরের চেনা পরিবেশে ঠিক সেই একই পরিমাণ ইবাদত করা হয়তো সম্ভব নয়। তবে যদি ছোট এবং সহজ কিছু আমল বেছে নিয়ে তা আন্তরিকতা ও নিয়মিত করতে পারেন, তাহলে আপনি সফল।
৩. আমলনামা পরিচ্ছন্ন রাখুন
আরাফার ময়দানে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ হওয়ার পর, আপনার পবিত্র আত্মা এখন নতুন কোনো গুনাহ বা ভুলকে খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারবে। তবে মানুষ হিসেবে আপনি সারাজীবন শতভাগ নিষ্পাপ থাকবেন— এমনটি হবার নয়।
মানবজাতি ভুল করবেই, তবে তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তারাই যারা ভুলের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। তাই কখনো পা পিছলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করুন। প্রতিদিন ইস্তিগফার করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনে ১০০ বার ইস্তিগফার করতেন। এই সুন্নত অনুসরণের মাধ্যমে আমলনামা পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব।
৪. আত্মিক কলুষতা থেকে দূরে থাকুন
হজের দিনগুলোতে আপনি বাইরের জগতের অনেক পঙ্কিলতা থেকে দূরে ছিলেন, যেমন— অশ্লীল গান, নগ্নতা, কুরুচিপূর্ণ বিজ্ঞাপন কিংবা মানুষের অশোভন আচরণ। কিন্তু দেশে ফেরার পর বিশেষ করে আধুনিক সমাজে এগুলো চারপাশেই দৃশ্যমান। তাই নিজের চোখ, কান ও অন্তরকে এসব থেকে রক্ষা করুন।
যেসব দৃশ্য বা শব্দ আপনার হৃদয়কে কলুষিত করতে পারে, তা থেকে দূরে থাকুন। অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছুর মুখোমুখি হলে ভালো কোনো কাজ বা জিকিরের মাধ্যমে তার প্রভাব মুছে ফেলুন। মনে রাখবেন, শয়তান মানুষের ইন্দ্রিয়কে ব্যবহার করে ধীরে ধীরে হৃদয়ে বিষ ছড়ায়। তাই এই পথগুলো বন্ধ রাখুন।
৫. শয়তানকে তাড়ানোর লড়াই জারি রাখুন
মিনায় জামারাতে পাথর নিক্ষেপের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য মনে রাখুন। আরাফার দিনে শয়তান চরম অপমানিত হয়েছিল, তাই দেশে ফেরার পর সে আপনাকে পথভ্রষ্ট করতে আরও বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে। মিনার মাঠে যেভাবে শয়তানকে পাথর মেরেছিলেন, ঠিক তেমনি নিজ দেশে ফিরে যখনই তার কোনো কুপ্ররোচনা বা প্রলোভন অনুভব করবেন, মনে মনে সেই পাথর নিক্ষেপের কথা স্মরণ করুন। মিনায় যেভাবে তাকে তাড়িয়েছিলেন, নিজের জীবনেও তাকে সেভাবেই রুখে দিন।
৬. কৃতজ্ঞতার মাধ্যমে আবার যাওয়ার নিয়ত করুন
মক্কা ছেড়ে আসার সময়, বিশেষ করে বিদায়ী তাওয়াফ শেষ করে যখন কেউ হারাম শরিফ থেকে বের হয়, তখন বুক ফেটে কান্না আসে। লাখো মানুষের মতো আপনার মনেও বারবার সেখানে ফিরে যাওয়ার আকুতি জাগে। তবে এই আকুতিকে শুধু স্মৃতিকাতরতা বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
পবিত্র কুরআনের সুরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে আমি তোমাদের নেয়ামত আরও বাড়িয়ে দেব। হজের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, আল্লাহ আপনাকে যে সফরের তাওফিক দিয়েছেন, তার জন্য যদি সত্যিকার অর্থেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, তবে ইনশাআল্লাহ আপনি আবারও সেখানে যাওয়ার দাওয়াত পাবেন। এই কৃতজ্ঞতাকে আমলে রূপান্তর করুন। যতটা সম্ভব আল্লাহর কাছাকাছি থেকে জীবন গড়ার চেষ্টা করুন।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

