“আল-কুফরু মিল্লাতুন ওয়াহিদা” অর্থাৎ, কাফিররা এক গোষ্ঠী। সমগ্র বিশ্বের কাফিররা আজ এই মূলনীতিতে অটল। তবে বিশেষ কিছু গোষ্ঠী বাদে। আর এ জন্যেই মাঝে মধ্যে দেখা যায় আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স বিরোধী মিছিল বের করতে। তবে অবশ্য এর মধ্যে আবার কিছু কিছু লোকদেখানোও রয়েছে। আর কাফিরদের বর্ণিত এইসব মূলনীতির সাথে যোগ দিয়েছে কিছু মুসলিম গাদ্দার। তারাও তাদের সাথে সুর মিলিয়ে চলছে মুসলিম নিধনে; এ ব্যাপারে তারা নীরব, নিথর। যেন তারা পুতুল নবাব, যার প্রমাণ এখন আর নতুন নয়। বিশ্বের যেদিকেই তাকাই শুধুমাত্র মুসলিম নির্যাতনের করুণ চিত্র দেখতে পাই। যেকোনো অজুহাতের ধুয়া তুলে বিধর্মী শক্তিশালী দেশগুলো মুসলমানদের ওপর একত্রিত হয়ে হামলা চালায়।
ঐক্য ও মুসলিমদের অনৈক্য
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কাফিরদের এই জোটবদ্ধ শত্রুতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন: “আর যারা কুফরী করে তারা একে অপরের বন্ধু। যদি তোমরা তা না কর (অর্থাৎ তোমরা পরস্পর পরস্পরের সাহায্যে এগিয়ে না আস) তাহলে দুনিয়াতে ফিতনা ও মহাবিপর্যয় দেখা দিবে।” (সূরা আনফাল: ৭৩)
তাফসীরে আহসানুল বয়ানে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে— “অর্থাৎ, যেমন কাফেররা একে অপরের বন্ধু এবং পৃষ্ঠপোষক, ঠিক তেমনি যদি তোমরাও ঈমানের ভিত্তিতে একে অপরের পৃষ্ঠপোষক এবং কাফেরদল থেকে নিঃসম্পর্ক না হও, তাহলে বড় ধরনের ফিতনা ও অশান্তি সৃষ্টি হবে। আর তা হলো এই যে, মুমিন ও কাফেরদের মাঝে মিশ্র সহাবস্থান, সম্প্রীতি ও বন্ধুত্বের ফলে দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহ ও তোষামোদ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, কাফেররা একে অপরের উত্তরাধিকারী। উদ্দেশ্য এই যে, একজন মুসলিম কোনো কাফেরের এবং একজন কাফের কোনো মুসলিমের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। যেমন হাদিসসমূহে এ কথার স্পষ্ট বর্ণনা এসেছে। মোটকথা, যদি তোমরা উত্তরাধিকারের ব্যাপারে কুফর ও ঈমানকে দৃষ্টিচ্যুত করে কেবল আত্মীয়তাকে বুনিয়াদ বানাও, তাহলে তাতে বড় ফিতনা, ফাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি হবে।”
আজ গাজা থেকে কাশ্মীর, আর আরাকান থেকে জিনজিয়াং—সবখানে মুসলিমদের রক্ত ঝরছে। অথচ মুসলিম উম্মাহ আজ শতধা বিভক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা.) সতর্ক করেছিলেন যে, এক সময় মুসলিমরা সংখ্যার দিক থেকে অনেক হবে, কিন্তু গুণের দিক থেকে হবে সমুদ্রের ফেনার মতো দুর্বল। আজ আমরা সেই বাস্তবতাই দেখছি।
হাদিসে এসেছে, হযরত সাওবান (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “খাদ্য গ্রহণকারীরা যেভাবে খাবারের পাত্রের চতুর্দিকে একত্র হয়, অচিরেই বিজাতিরা তোমাদের বিরুদ্ধে সেভাবেই একত্রিত হবে। এক ব্যক্তি বলল, সেদিন আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে কি এরূপ হবে? তিনি বললেন, তোমরা বরং সেদিন সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে; কিন্তু তোমরা হবে প্লাবনের স্রোতে ভেসে যাওয়া খড়কুটার মতো। আর আল্লাহ তোমাদের শত্রুদের অন্তর হতে তোমাদের ভয় দূরীভূত করে দিবেন এবং তোমাদের অন্তরে ‘আল-ওয়াহন’ ভরে দিবেন। এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আল-ওয়াহন’ কী? তিনি বললেন, দুনিয়ার ভালোবাসা ও মৃত্যুর প্রতি অনাগ্রহ। অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) বলেন, ওয়াহন হলো দুনিয়ার প্রতি তোমাদের ভালোবাসা ও কিতালের (জিহাদ) প্রতি তোমাদের বিতৃষ্ণা।” (সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস: ৪২৯৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৪৫০, ৮N৯৮)
আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও ক্ষমতার অপব্যবহার
মুসলিম রাষ্ট্রের শক্তিকে দমানোর জন্য গঠিত হয়েছে জাতিসংঘ, ন্যাটো, মোসাদ, সিআইএ-এর মতো শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। মুসলিম নেতৃত্বকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আছে ইন্টারপোল। এরাই আজ বিশ্বের কর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে, অথচ যাদের থাকার কথা ছিল মুসলমানদের অধীনে। কিন্তু বিধিবাম! যেখানে বিশ্ব নেতৃত্বে থাকবে মুসলমানরা, সেখানে আজ তারাই পরগাছা গোলাম। যদি কোনো মুসলিম রাষ্ট্র অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক দিয়ে একটু উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে চায়, তাহলে তার উপর বিভিন্ন রকমের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাকে দমিয়ে রাখা হয়। এতে করে আমরা দুর্বল থেকে আরও দুর্বলতর হয়ে যাচ্ছি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো— কুরআন ও সুন্নাহ ভুলে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন: “তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআন) দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং কখনো বিচ্ছিন্ন হয়োনা।” (সূরা আল-ইমরান: ১০৩)
“কখনো বিচ্ছিন্ন হয়ো না”-এর ব্যাখ্যায় তাফসীরে আহসানুল বয়ানে বলা হয়েছে— “এর মাধ্যমে দলে দলে বিভক্ত হওয়া থেকে নিষেধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, উল্লিখিত দু’টি মূল নীতি থেকে যদি তোমরা বিচ্যুত হয়ে পড়, তাহলে তোমরা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং ভিন্ন ভিন্ন দলে তোমরা বিভক্ত হয়ে যাবে। বলাই বাহুল্য যে, বর্তমানে দলে দলে বিভক্ত হওয়ার দৃশ্য আমাদের সামনেই রয়েছে।”
স্বার্থপরতা ও ভ্রাতৃত্বের সংকট
আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহযোগিতা করবে না। আল্লাহকে ভয় করে চলো। নিশ্চয়ই আল্লাহর শাস্তি অতি কঠিন।” (সূরা মায়েদা, আয়াত: ২)
অথবা আমরা যেদিকেই তাকাই—বাংলাদেশ, ইরান, সিরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিস্তিনসহ সব মুসলিম দেশসমূহে মুসলমানদের বিরুদ্ধেই প্রত্যেক দেশে দেশে মুসলিমদের মধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে দলাদলি। কেউ দেশ রক্ষার কাজে নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে আর কেউ দেশ ধ্বংসের কাজে শত্রুপক্ষের এজেন্ট হয়ে নিজের জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। আর তার সঙ্গে যোগ হয়েছে স্বার্থপরতা ও লোভ। এই কতিপয় কারণে আমরা আজ বিচ্ছিন্ন। সুযোগ নিয়েছে বিধর্মীরা, হামলা চালাচ্ছে মুসলমানদের ওপর। যে মুসলমান ভাই ভাই হয়ে থাকার কথা, তারাই আজ পরস্পর শত্রুর ন্যায় লালসা আর প্রতিহিংসার বিলাসিতায় মত্ত হয়ে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছে মুসলিম জাতি। অথচ মুমিনের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য একটি ইমারত বা প্রাচীরের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।" (সহিহ বুখারি: ৪৮১)
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে বলেন—“একান্তভাবেই মুমিনরা পরস্পর ভাই-ভাই। সুতরাং তোমরা তোমাদের দু’পক্ষের (বিবদমান) ভাইদের মধ্যে সমঝোতা করে দাও এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমাদের উপর রহমত নাযিল হয়।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১০)
কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এই হুকুম কেউ মানে না। শুধুমাত্র নিজের ক্ষমতা, কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য মুসলিম বিশ্বের সকল শাসকগণ বিধর্মীদের সাথে চুক্তি করে এক দেশের শাসক আরেক দেশের শাসকের সাথে বিরোধিতা করে চলছেন। মুসলিমদের শাসকদের সাহায্যেই বিধর্মী রাষ্ট্রগুলো হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও আরেক মুসলিম রাষ্ট্রের উপর হামলা ও নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে।
উত্তরণের পথ: প্রস্তুতি ও জাগরণ
ড. মুহাম্মাদ মুসলেহুদ্দীন বলেছেন— “আত্মম্ভরিতা, হিংসা-বিদ্বেষ, হীন স্বার্থপরতা, ধনলালসা, ক্ষমতালিপ্সা, পদলোভ, ব্যক্তিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, আখের গোছানোর বাসনা, কপটতা, ধূর্ততা, সুযোগসন্ধানী মানসিকতা, হীনমন্যতা ইত্যাদি নিয়ে কক্ষনো যথার্থ ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং হয় সাময়িক আনুষ্ঠানিকতা ও বাহ্যিক সামাজিকতা। শেষ পর্যায়ে এজাতীয় সমস্যায় জর্জরিত লোকদের সমন্বয়ে কোনো বৃহত্তর কাজের পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরস্থান, কোনো ক্ষুদ্রতর কাজে হাত দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। বাস্তবতা বিবর্জিত ভ্রাতৃত্বের দাবির মাধ্যমে কোনো টেকসই আদর্শিক সমাজ গঠিত হয় না। ভ্রাতৃত্ব কায়েম হওয়া ও তা টিকে থাকার জন্য শুধু কিছু গুণ থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং অনেকগুলো দোষ এড়িয়ে চলা কর্তব্য।” (ইসলামী ভ্রাতৃত্বের গুরুত্ব ও মূল্যায়ন - ড. মুহাম্মাদ মুসলেহুদ্দীন, মাসিক আল ইখলাস, জুলাই ২০২০ সংখ্যা)
নবী করীম (সা.) মুসলিমদেরকে এমন সব ত্রুটি থেকে মুক্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন যেগুলো পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বকে নষ্ট করে দেয়। হাদিসে এসেছে, আবূ হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা কুধারণা পরিহার কর। কেননা কুধারণা হলো বড় মিথ্যা কথা। আর তোমরা একে অপরের दोष খুঁজে বেড়িও না, পরস্পর गुप्तচরবৃত্তি করো না, আড়াল থেকে ইঙ্গিত করে একে অপরের জিনিসের দাম বাড়িও না, পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ করো না, একে অপরকে ঘৃণা করো না, একজন আরেকজন থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিও না (দূরত্ব রচনা করো না); আর তোমরা পরস্পর আল্লাহর বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে যাও।" (বুখারী, হাদিস: ৬০৬৬; মুসলিম, হাদিস: ২৫)
মুসলিম জাতির ঘুম ভাঙা এখন অতি জরুরি। সব ভুলে আবার কুরআন ও হাদিসকে আঁকড়ে ধরে সবাই একমত হতে হবে। ধরে রাখতে হবে আল্লাহর রজ্জুকে। শত্রুর মোকাবিলা করার জন্য জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হওয়া আজ সময়ের দাবি।
আল্লাহ তাআলা কুরআন কারীমে বলেন: “আর তাদেরকে মুকাবালা করার জন্য যথাসাধ্য শক্তি ও অশ্ব-বাহিনী সদা প্রস্তুত রাখবে যদ্বারা তোমরা ভয় দেখাতে থাকবে আল্লাহর শত্রু আর তোমাদের শত্রুকে, আর তাদের ছাড়াও অন্যান্যদেরকেও যাদেরকে তোমরা জান না কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে জানেন। তোমরা আল্লাহর পথে যা খরচ কর তার পুরোপুরি প্রতিদান তোমাদেরকে দেয়া হবে, আর তোমাদের সাথে কক্ষনো যুলম করা হবে না।” (সূরা আনফাল: ৬০)
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীরে আহসানুল বয়ানে বলা হয়েছে— “قُوَّة (শক্তি) শব্দের ব্যাখ্যা নবী করীম (সা.) হতে প্রমাণিত আছে। তিনি বলেছেন, শক্তি হলো (তীর) নিক্ষেপ। (মুসলিমঃ ইমারাহ অধ্যায়) কেননা, সে যুগে তীরই ছিল যুদ্ধের বড় অস্ত্র এবং তীর মারায় দক্ষতা অর্জন ছিল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যা। (যেহেতু তাতে দূর থেকেই শত্রু নিপাত করা যায়।) যেমন যুদ্ধের জন্য ঘোড়া ছিল অপরিহার্য ও অতীব প্রয়োজনীয় একটি মাধ্যম, যে কথা আলোচ্য আয়াতে ফুটে উঠেছে। কিন্তু বর্তমান যুগে যুদ্ধে তীর নিক্ষেপ ও ঘোড়ার সেই গুরুত্ব এবং উপকারিতা বাকী নেই। এই জন্য ‘তোমরা তাদের বিরুদ্ধে সাধ্যমত শক্তি প্রস্তুত কর’ এই নির্দেশ পালনে অধুনা যুগের যুদ্ধাস্ত্র (যেমন: ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, মিসাইল, ট্যাঙ্ক, কামান, বোমারু বিমান এবং সামুদ্রিক যুদ্ধের জন্য সাবমেরিন প্রভৃতি) এর প্রস্তুতি অত্যাবশ্যক।”
পরিশেষে
সবশেষে জাতির ক্রান্তিলগ্নে বজ্রকণ্ঠে বলা যায়— “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।” আমাদের মাজলুম ভাইদের রক্ষা করার জন্য মাথায় কাফন বেঁধে অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। আর এর জন্য প্রথম শর্ত হলো আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সর্বোপরি আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে আদা-জল খেয়ে নামতে হবে। কেননা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এখন সময় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। আমরা সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ ও ইমানদার হলে তবেই বদরের প্রান্তরের মতো আল্লাহর সাহায্য নেমে আসবে— ইনশাআল্লাহ!
লেখক: প্রাবন্ধিক; সালনা, গাজীপুর।
jony90siddique@gmail.com

