আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস
পরিবেশ বিপর্যয় রোধে ইসলামি শিক্ষা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১৬:২৭
৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬। পরিবেশ রক্ষা, জলবায়ু সচেতনতা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরতেই বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। আধুনিক বিশ্ব যখন দূষণ, বন উজাড়, নদী দখল, জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো ভয়াবহ সংকটে আক্রান্ত, তখন ইসলাম পরিবেশ সংরক্ষণে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবকল্যাণমুখী দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
ইসলাম কেবল ইবাদতকেন্দ্রিক ধর্ম নয়; বরং মানবজীবনের প্রতিটি দিক—সমাজ, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে পৃথিবীকে আল্লাহর আমানত হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং মানুষকে এর দায়িত্বশীল রক্ষণাবেক্ষণকারী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
পৃথিবী আল্লাহর নিদর্শন ও আমানত
আল্লাহ তাআলা বলেন— "তিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।" —(সূরা আল-বাকারা: ২৯) এই আয়াত প্রমাণ করে, পৃথিবীর সম্পদ মানুষের কল্যাণে সৃষ্টি হলেও তা অপব্যবহারের জন্য নয়। মানুষ ভোগ করবে, কিন্তু ধ্বংস করবে না। ইসলাম প্রকৃতিকে আল্লাহর নেয়ামত হিসেবে বিবেচনা করে এবং এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শিক্ষা দেয়।
আল্লাহ আরও বলেন— "মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।" —(সূরা আর-রূম: ৪১)
বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ বিপর্যয়ের বাস্তব চিত্র যেন এই আয়াতেরই প্রতিফলন। শিল্পকারখানার ধোঁয়া, প্লাস্টিক দূষণ, নদী দখল, বৃক্ষ নিধন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার নির্দেশ
কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— "তিনি আকাশকে সমুন্নত করেছেন এবং স্থাপন করেছেন ভারসাম্য; যাতে তোমরা ভারসাম্য নষ্ট না করো।" —(সূরা আর-রাহমান: ৭-৮)
প্রকৃতির এই ভারসাম্য রক্ষা করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। অতিরিক্ত ভোগবাদ, অপচয় ও লোভ পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। ইসলাম সংযমী জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়ে পরিবেশ রক্ষার পথ দেখিয়েছে।
অপচয় ও অতিভোগের বিরুদ্ধে ইসলাম
আল্লাহ তাআলা বলেন— "তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" —(সূরা আল-আ’রাফ: ৩১)
আজকের পৃথিবীতে খাদ্য অপচয়, পানির অপচয় এবং অপ্রয়োজনীয় ভোগ পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। ইসলাম মানুষের প্রয়োজনভিত্তিক জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) অযুর সময়ও পানির অপচয় করতে নিষেধ করেছেন। এক সাহাবিকে তিনি বলেন— "পানির অপচয় করো না, যদিও তুমি প্রবাহিত নদীর তীরে থাকো।" —(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪২৫)
এই হাদিস পানি সংরক্ষণে ইসলামের গভীর সচেতনতার অনন্য উদাহরণ।
বৃক্ষরোপণকে সদকা হিসেবে ঘোষণা
ইসলাম বৃক্ষরোপণকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচনা করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন— "কোনো মুসলমান যদি একটি গাছ রোপণ করে, অতঃপর মানুষ, পাখি বা পশু তা থেকে উপকৃত হয়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হবে।" —(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩২০)
অন্য হাদিসে এসেছে— "কিয়ামত সংঘটিত হলেও যদি কারও হাতে একটি চারা থাকে এবং তা রোপণের সুযোগ থাকে, তবে সে যেন তা রোপণ করে।" —(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২৯০২) এ শিক্ষা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধও প্রকাশ করে।
প্রাণিকুলের প্রতি দয়া ও পরিবেশনীতি
ইসলাম প্রাণীর প্রতিও সদয় আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন— "যে ব্যক্তি কোনো জীবের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ তার প্রতি দয়া করেন।" —(আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৩৭৩)
আরেক হাদিসে এক নারীর শাস্তির কারণ হিসেবে একটি বিড়ালকে না খাইয়ে কষ্ট দেওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। —(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩১৮) এতে বোঝা যায়, পরিবেশের অংশ হিসেবে প্রাণিকুলের অধিকার রক্ষাও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
রাস্তা ও জনপরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা
পরিচ্ছন্নতা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন— "পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।" —(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩)
তিনি আরও বলেন— "রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা।" —(সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৮৯)
বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্য, ড্রেন দখল ও ময়লা-আবর্জনা পরিবেশ দূষণের বড় কারণ। ইসলাম ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিচ্ছন্নতাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে শিক্ষা দিয়েছে।
নদী, পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার শিক্ষা
ইসলাম পানি দূষণ কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্থির পানিতে অপবিত্রতা ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। —(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৮১) আজ শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকের কারণে নদী ও জলাশয় দূষিত হচ্ছে। এটি শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। ইসলামের দৃষ্টিতে জনসম্পদ রক্ষা করা সামাজিক দায়িত্ব।
জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবিক দায়িত্ব
বিশ্ব উষ্ণায়ন, অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যা আজ বৈশ্বিক বাস্তবতা। বাংলাদেশও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। ইসলাম প্রকৃতিকে ধ্বংসের নয়, সংরক্ষণের শিক্ষা দেয়। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, বৃক্ষরোপণ, পানি সংরক্ষণ, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে একজন মুসলমান ইসলামের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারে।
পরিবেশ রক্ষায় আমাদের করণীয়
১. বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করা।
২. প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার কমানো।
৩. পানি ও বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করা।
৪. নদী, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত রাখা।
৫. ময়লা-আবর্জনা নির্ধারিত স্থানে ফেলা।
৬. প্রাণিকুলের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া।
৭. পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধিতে সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া।
৮. শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশবান্ধব শিক্ষা দেওয়া।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব পরিবেশ দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার আহ্বান। ইসলাম বহু আগেই পরিবেশ সংরক্ষণ, সম্পদের সঠিক ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা, বৃক্ষরোপণ এবং জীবজগতের প্রতি দয়ার শিক্ষা দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুসরণ করলে পরিবেশ রক্ষা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ইবাদতেও পরিণত হয়।
আজ প্রয়োজন ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ। পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করলেই গড়ে উঠবে নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।

