Logo

ধর্ম

হজোত্তর জীবন: ঈমান ও আমলের নবযাত্রা

Icon

ইমাম হাসান

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ১৭:০৪

হজোত্তর জীবন: ঈমান ও আমলের নবযাত্রা

​আর্থিক স্বচ্ছলতা এবং শারীরিক সামর্থ্যসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমানের ওপর জীবনে অন্তত একবার হজ পালন করা পরম ফরজ ইবাদত। বিপুল অর্থ ব্যয় এবং শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মুমিন বান্দারা মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মক্কা নগরীতে সমবেত হন। তবে হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পবিত্র কাবা জিয়ারত, সাফা-মারওয়ার সাঈ কিংবা আরাফাহ-মিনার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং হজের মূল শিক্ষা ও প্রভাব প্রতিফলিত হয় হজোত্তর জীবনে। একজন হাজির পরবর্তী জীবন কেমন হবে এবং তার আমলি জিন্দেগিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে—তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাওহিদভিত্তিক জীবন ও শিরকমুক্তির অঙ্গীকার

​হজ মানুষকে একনিষ্ঠভাবে একত্ববাদের আলো we আলোকিত করার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাই হজ থেকে ফেরার পর একজন হাজির পুরো জীবন পরিচালিত হতে হবে খাঁটি তাওহিদের ওপর ভিত্তি করে। হজোত্তর জীবনে এমন কোনো আচরণ বা বিশ্বাস রাখা যাবে না, যার সাথে শিরকের সামান্যতম সম্পর্ক থাকে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেন:

​‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে মহান হজের দিনে মানুষের প্রতি (বিশেষ) বার্তা হলো, আল্লাহর সঙ্গে শিরককারীদের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাঁর রাসুলের সঙ্গেও নেই।’ (সুরা তাওবা : আয়াত ৩)

​ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, হজের পর সম্পূর্ণ পাপমুক্ত এবং পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতে পারাটাই হলো হজ কবুল বা ‘হজে মাবরুর’ হওয়ার অন্যতম প্রধান লক্ষণ।

কর্মের ধারাবাহিকতা ও সমাজ সংস্কারে ভূমিকা

​হজ সম্পন্ন করার পর আল্লাহর প্রতিটি হুকুম-আহকাম ও শরীয়তের বিধি-বিধান পালনে আরও বেশি যত্নবান হতে হবে। ইসলামি মনীষী ও ফকিহগণের মতে, কবুল হজের অন্যতম আলামত হলো—হজযাত্রী দেশে ফিরে তাঁর নেক আমলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন এবং আগের চেয়ে বেশি ইবাদতমুখী হবেন।

​অন্যায় থেকে আত্মরক্ষা: পূর্বের সমস্ত গুনাহ ও খারাপ অভ্যাস থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে।

​সামাজিক কল্যাণ: সমাজে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী পালন করার চেষ্টা করতে হবে।

​দৃষ্টান্ত স্থাপন: নিজে অনৈতিক কাজ থেকে বেঁচে থাকার পাশাপাশি অন্যকেও অন্যায় থেকে বিরত রাখার ব্যাপারে আন্তরিক ভূমিকা পালন করতে হবে।

​হজ পালনকারীরা মূলত আল্লাহর মেহমান। তারা অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে এই ইবাদত সম্পন্ন করেন। তাদের পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: ​‘অতঃপর যখন তোমরা (হজের) যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করে নেবে, তখন (মিনায়) এমনভাবে আল্লাহর (জিকির) স্মরণ করবে, যেমন (জাহেলি যুগে) তোমরা তোমাদের পিতৃপুরুষগণকে স্মরণ করতে অথবা তার চেয়েও বেশি গভীরভাবে (স্মরণ করবে)।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২০০)

​এই আয়াতে আল্লাহ আরও সতর্ক করেছেন যে, যারা কেবল দুনিয়াবি ফায়দা ও সম্পদের জন্য দোয়া করে, পরকালে তাদের কোনো অংশ নেই। পক্ষান্তরে, প্রকৃত মুমিনরা দুনিয়া ও আখরাত উভয়ের কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করে: ​‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর। আর আমাদেরকে দোজখের যন্ত্রণা থেকে রক্ষা কর।’ (সুরা বাকারা : আয়াত ২০১)

কবুল হজের আলামত ও আত্মোপলব্ধি

​হজে মাবরুর বা মকবুল হজের সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো মানুষের ভেতরের আমূল পরিবর্তন। হজ থেকে ফেরার পর যদি কারও পাপের প্রতি ঘৃণা ও ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, তবে বুঝতে হবে তার হজ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়েছে। পক্ষান্তরে, হজের পরও যদি কারও চারিত্রিক বা নৈতিক পরিবর্তন না আসে, তবে তার হজ কবুল হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় (আপকে মাসায়েল, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৫)।

​বর্তমানে আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ হজে যান। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সমাজ থেকে অন্যায়, দুর্নীতি বা অনাচার আশানুরূপ কমছে না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, পবিত্র এই সফরটি যেন আত্মশুদ্ধির চেয়ে প্রমোদভ্রমণ, কেনাকাটা কিংবা সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির ‘হানিমুন’ বা ‘ট্যুরিজমে’ পরিণত হয়েছে। মক্কা-মদিনার পুণ্যভূমি যদি একজন মানুষের ভেতরে শুভবুদ্ধি ও খোদাভীতি জাগ্রত করতে না পারে, তবে বুঝতে হবে তিনি হজের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছেন।

হজ থেকে ফেরার পর করণীয় সুন্নাত ও মুস্তাহাব আমল

​হজের সফর শেষ করে নিজ এলাকায় এবং ঘরে ফেরার পর কিছু বিশেষ আমল ও সুন্নাত রয়েছে, যা নিচে আলোচনা করা হলো:

​১. মসজিদে দুই রাকাত নফল নামাজ

​সফর শেষে নিজ মহল্লায় ফিরে সর্বপ্রথম নিকটস্থ মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা সুন্নাত। হজরত কাব বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন কোনো সফর থেকে ফিরে আসতেন, তখন মসজিদে (নফল) নামাজ আদায় করতেন।’ (বুখারি শরিফ)

​২. শুকরিয়াস্বরূপ ভোজের আয়োজন (নকিয়াহ)

​হজ থেকে নিরাপদে ফিরে আসার পর মহান আল্লাহর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আত্মীয়স্বজন ও গরিব-দুঃখীদের খাবারের ব্যবস্থা করা বৈধ ও প্রশংসনীয়। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় একে ‘নকিয়াহ’ বলা হয়। হাদিসে এসেছে, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় এসেছেন, তখন একটি গরু জবাইয়ের নির্দেশ দেন। জবাইয়ের পর সাহাবিরা তা থেকে আহার করেছেন।’ (বুখারি)। তবে মনে রাখতে হবে, এই দাওয়াত যেন লোকদেখানো, অহংকার কিংবা লৌকিকতার উদ্দেশ্যে না হয়।

​৩. ঘরে ফিরে দুই রাকাত নামাজ

​মসজিদ থেকে সরাসরি নিজের ঘরে প্রবেশ করার পর পরিবারের কল্যাণার্থে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে: ​‘যখন তুমি ঘর থেকে বের হবে, তখন দুই রাকাত নামাজ পড়বে। সেই নামাজ তোমাকে ঘরের বাইরের বিপদাপদ থেকে হেফাজত করবে। আর যখন ঘরে ফিরবে, তখনো দুই রাকাত নামাজ আদায় করবে। সেই নামাজ তোমাকে ঘরের অভ্যন্তরীণ বালা-মুসিবত থেকে হেফাজত করবে।’ (মুসনাদে বাজ্জার)

​৪. হাজিকে অভ্যর্থনা ও দোয়া গ্রহণ

​হজ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের স্বাগত জানানো, তাঁদের সাথে মুসাফাহা ও কোলাকুলি করা এবং তাঁদের নিকট দোয়ার আবেদন করা মুস্তাহাব। কারণ গুনাহমুক্ত হয়ে ফিরে আসার কারণে তাঁদের দোয়া দ্রুত কবুল হয়। তবে ফুল দিয়ে বরণ করা, মালা পরানো কিংবা স্লোগান দেওয়ার মতো বাড়াবাড়ি ও অপসংস্কৃতি থেকে দূরে থাকতে হবে।

​৫. জমজমের পানি পান করানো

​হজ থেকে ফেরার সময় বরকত হিসেবে জমজমের পানি নিয়ে আসা একটি সুন্নাত সমর্থিত আমল। এই পানি আত্মীয় ও দর্শনার্থীদের পান করানো মুস্তাহাব। এমনকি অসুস্থ ব্যক্তির রোগমুক্তির জন্য এই পানি গায়ে ব্যবহার করাও জায়েজ। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.) বরকতের জন্য জমজমের পানি সাথে নিয়ে আসতেন এবং বলতেন, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জমজমের পানি সঙ্গে নিয়ে যেতেন।’ (তিরমিজি)

উপসংহার

​হজে মাবরুর বা কবুল হজের সৌভাগ্য যাদের হয়, তারা সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র হয়ে যান। তাই এই পবিত্রতা ধরে রাখার জন্য হজোত্তর জীবনে প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহকে স্মরণ করা এবং শরিয়তের বিধান মেনে চলা আবশ্যক। ইসলামে যেকোনো ইবাদতের মূল ভিত্তি হলো ইখলাস বা লোকচক্ষুর অন্তরালে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। সমাজিক সম্মানের আশায় নামের আগে ‘হাজি’ লকব ব্যবহারের মানসিকতা পরিহার করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা সকল হাজি সাহেবকে লোকদেখানো মানসিকতা থেকে হেফজাত করুন এবং হজোত্তর জীবনকে দ্বীনের পথে অবিচল রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: ইমাম ও খতিব, টোটালিয়াপাড়া জামে মসজিদ, সাভার, ঢাকা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন