বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস আজ
ইসলামে নিরাপদ খাদ্য ও মানবজীবনের সুরক্ষা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৫:০২
খাদ্য মানুষের জীবনের মৌলিক প্রয়োজন। সুস্থ, কর্মক্ষম ও নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে খাদ্যই এখন অনেক সময় রোগ, দুর্ভোগ ও মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভেজাল, বিষাক্ত রাসায়নিক, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অসচেতনতার কারণে কোটি কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর প্রায় ৮৬ কোটি মানুষ অনিরাপদ খাদ্যের কারণে অসুস্থ হয় এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।
ইসলাম খাদ্যকে শুধু প্রয়োজন নয়, বরং একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। তাই খাদ্যের হালালতা, পবিত্রতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মুসলমানের ধর্মীয় দায়িত্ব।
কোরআনের আলোকে খাদ্য নিরাপত্তা
আল্লাহ তাআলা বলেন: "হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র, তা থেকে আহার করো।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৬৮)
আরও বলেন: "হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি, তার পবিত্র বস্তুসমূহ থেকে আহার করো।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৭২)
আল্লাহ আরও সতর্ক করেছেন: "তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিও না।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
এবং "তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু।" — (সূরা আন-নিসা: ২৯)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে মানুষের জন্য ক্ষতিকর ও অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ইসলামে নিষিদ্ধের কাছাকাছি একটি কাজ।
সহিহ হাদিসের আলোকে খাদ্য ও স্বাস্থ্য
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "নিশ্চয়ই তোমার শরীরের তোমার উপর অধিকার আছে।" — (সহিহ বুখারী: ৫১৯৯)
তিনি আরও বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন।" — (সহিহ মুসলিম: ১০১৫)
রাসূল (সা.) বলেছেন: "যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — (সহিহ মুসলিম: ১০২)
আরও বলেছেন: "ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদান ক্ষতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।" — (ইবনে মাজাহ: ২৩৪০)
এসব হাদিস খাদ্যে ভেজাল, ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অসততা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করে।
অনিরাপদ খাদ্যের স্বাস্থ্যঝুঁকি
অনিরাপদ খাদ্য ধীরে ধীরে শরীরে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন রোগের কারণ হয়:
ডায়রিয়া ও ফুড পয়জনিং
টাইফয়েড ও কলেরা
লিভার ও কিডনির ক্ষতি
হেপাটাইটিস
ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের সমস্যা
ইসলাম জীবন রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, তাই এসব ঝুঁকি থেকে বাঁচা ধর্মীয় দায়িত্ব।
খাদ্যে ভেজাল: ইসলামি দৃষ্টিকোণ
রাসূল (সা.) বলেছেন: "যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" — (সহিহ মুসলিম: ১০১)
খাদ্যে ভেজাল দেওয়া সরাসরি প্রতারণা এবং হারাম কাজ।
শিশুদের নিরাপত্তা ও দায়িত্ব
আল্লাহ বলেন: "তোমরা নিজেদের পরিবারকে আগুন থেকে রক্ষা করো।" — (সূরা আত-তাহরীম: ৬)
শিশুদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা অভিভাবকের ধর্মীয় দায়িত্ব।
পরিচ্ছন্নতা ও খাদ্য নিরাপত্তা
রাসূল (সা.) বলেন: "পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক।" — (সহিহ মুসলিম: ২২৩) খাদ্য নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হলো পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সঠিক সংরক্ষণ।
সামাজিক দায়িত্ব
রাসূল (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করে, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে।" — (সহিহ বুখারী: ১৩, সহিহ মুসলিম: ৪৫) নিজের জন্য নিরাপদ খাদ্য যেমন চাই, অন্যের জন্যও তা নিশ্চিত করা দায়িত্ব।
খাদ্য অপচয়
আল্লাহ বলেন: "তোমরা অপচয় করো না, নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" — (সূরা আল-আনআম: ১৪১) খাদ্য অপচয় ইসলামবিরোধী কাজ এবং সামাজিক ক্ষতির কারণ।
খাদ্য security নিশ্চিত করার উপায়
ব্যক্তিগত পর্যায়
হালাল ও নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ
সন্দেহজনক খাবার এড়িয়ে চলা
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
অপচয় না করা
পারিবারিক পর্যায়
নিরাপদ পানি ব্যবহার
রান্নাঘর পরিষ্কার রাখা
শিশুদের খাদ্যে সতর্কতা
রাষ্ট্রীয় পর্যায়
ভেজালবিরোধী আইন কঠোর করা
খাদ্য পরীক্ষাগার বৃদ্ধি
বাজার মনিটরিং জোরদার করা
জনসচেতনতা বৃদ্ধি
পরিশেষে
ইসলামের দৃষ্টিতে খাদ্য নিরাপত্তা শুধু স্বাস্থ্য নয়, বরং একটি ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব। কোরআন ও সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—মানুষের জীবন রক্ষা করা, ক্ষতি থেকে বাঁচা এবং পবিত্র খাদ্য গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা একটি বড় challenge। এই challenge মোকাবিলায় প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং রাষ্ট্রীয় কঠোর ব্যবস্থা। বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা দিবস ২০২৬ আমাদের জন্য হোক একটি নতুন অঙ্গীকার—হালাল, পবিত্র ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। ইমেইল: drmazed96@gmail.com

