কন্যা, স্ত্রী ও মা- ইসলামে নারীর সম্মান ও মর্যাদার অনন্য দৃষ্টান্ত
ধর্ম ডেস্ক:
প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১৭:১২
সংগৃহীত
ইসলামে নারীর অবস্থান ও মর্যাদা নিয়ে যুগে যুগে নানা আলোচনা হয়েছে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—ইসলাম কি নারীকে যথাযথ সম্মান দিয়েছে? ইসলামী শিক্ষার আলোকে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ উভয়কেই মানবিক মর্যাদা, অধিকার এবং দায়িত্বের ক্ষেত্রে সম্মানিত করা হয়েছে। তবে তাদের দায়িত্ব ও ভূমিকার ক্ষেত্রে রয়েছে স্বাভাবিক ও সুন্দর বৈচিত্র্য।
একজন পুরুষের জীবনের প্রতিটি ধাপে কোনো না কোনোভাবে নারীর উপস্থিতি থাকে। জন্মের পর মায়ের স্নেহ, যৌবনে স্ত্রীর সঙ্গ এবং বার্ধক্যে কন্যার ভালোবাসা একজন পুরুষের জীবনকে পরিপূর্ণ করে তোলে। ইসলাম নারীর প্রতিটি পরিচয়কে বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছে।
কন্যা সন্তান: রহমত ও জান্নাতের সুসংবাদ
ইসলামে কন্যা সন্তানকে আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত ও রহমত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যে সমাজে একসময় কন্যাসন্তানকে অবহেলা করা হতো, ইসলাম সেই সমাজে কন্যার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি তার কন্যাসন্তানদের স্নেহ-ভালোবাসায় লালন-পালন করবে এবং উত্তমভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করবে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও কন্যাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রদর্শন করতেন। বিশেষ করে হজরত ফাতিমা (রা.) সম্পর্কে তিনি বলেছেন, “ফাতিমা আমার কলিজার টুকরো।” এ শিক্ষা প্রমাণ করে, কন্যাসন্তান কখনো বোঝা নয়; বরং পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণের উৎস।
স্ত্রী: পরিবারের শান্তি ও সৌহার্দ্যের কেন্দ্র
ইসলামে বিয়েকে পারস্পরিক সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের বন্ধন হিসেবে দেখা হয়। একজন নারীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন করার কোনো সুযোগ ইসলামী শরিয়তে নেই।
বিয়ের পর স্ত্রীকে পরিবারের মর্যাদাপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আরবি পরিভাষায় স্ত্রীকে বলা হয় ‘রাব্বাতুল বাইত’- অর্থাৎ গৃহের কর্ণধার বা রানী। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
পবিত্র কোরআনে পুরুষকে পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণ ও ভরণপোষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহানবী (সা.) নিজেও গৃহস্থালির কাজে সহযোগিতা করতেন, যা মুসলিম পুরুষদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
ইসলামে স্ত্রীর মতামত, সম্মান, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের মাধ্যমেই একটি সুখী পরিবার গড়ে ওঠে।
মা: সন্তানের জান্নাতের পথপ্রদর্শক
নারীর সর্বোচ্চ মর্যাদার একটি পরিচয় হলো মাতৃত্ব। একজন মা সন্তানের জন্য যে ত্যাগ, কষ্ট ও ভালোবাসা উৎসর্গ করেন, তার তুলনা অন্য কিছুর সঙ্গে করা কঠিন।
পবিত্র কোরআনে মায়ের গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের কষ্টের কথা উল্লেখ করে সন্তানদের তার প্রতি সদয় ও অনুগত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।”
ইসলাম মায়ের প্রতি অবাধ্যতাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। কারণ একজন মা শুধু একটি সন্তান নয়, একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করেন।
ইসলামের ইতিহাসে নারীর উজ্জ্বল অবদান
নারীর মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রমাণ ইসলামের ইতিহাসেও সুস্পষ্ট। পবিত্র কোরআনে নারীদের বিভিন্ন অধিকার ও দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করতে ‘সূরা আন-নিসা’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাজিল হয়েছে।
ইসলামের প্রথম শহীদ ছিলেন হজরত সুমাইয়া (রা.), যিনি একজন নারী। আবার মহানবী (সা.)-এর নবুয়তের প্রতি প্রথম বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন হজরত খাদিজা (রা.)। শিক্ষা, বিবাহ, সম্পদের মালিকানা, উত্তরাধিকার এবং সামাজিক মর্যাদাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলাম নারীদের সুস্পষ্ট অধিকার প্রদান করেছে।
সম্মান ও মর্যাদার পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামী দৃষ্টিতে নারী কোনোভাবেই অবহেলার পাত্র নন। কন্যা হিসেবে তিনি রহমতের উৎস, স্ত্রী হিসেবে পরিবারের শান্তির কেন্দ্র এবং মা হিসেবে জান্নাতের পথপ্রদর্শক। নারীকে সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার দেওয়ার মাধ্যমে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছে।
তাই ইসলামের আলোকে নারী শুধু পরিবারের নয়, বরং সমাজ ও জাতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেই বিবেচিত।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

