এত বৈরী স্রোতের মাঝেও কীভাবে টিকে আছে কওমিরা?
যদি প্রশ্ন করা হয়—নাস্তিকদের সবচেয়ে বড় শত্রু কারা? উত্তর আসবে: কওমিরা। এই কওমিরাই নাস্তিকদের ঘুম হারাম করে দেয়।
এরপর যদি প্রশ্ন করা হয়, তথাকথিত ‘আহলে কোরআন’ (কোরআনপন্থী)-দের প্রধান প্রতিপক্ষ কারা? উত্তর সেই একই—কওমিরা।
নবীজিকে (সা.) কৌশলে অস্বীকারকারী কাদিয়ানি বা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এই কওমি সমাজ। অবহেলিত নারীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে কথিত তৌহিদের দল গঠনকারী 'হিজবুত তাওহীদ'-এর সবচেয়ে বড় ত্রাসও তারা।
আহলে হাদিসদের প্রধানতম সমালোচক এবং সাদপন্থীদের ঘুম সবসময় হারাম করে রাখে এই কওমিরাই। উগ্রপন্থী জামায়াতের (মাঝেমধ্যে কিছু মধ্যমপন্থী রূপ ছাড়া) সবচেয়ে বড় আদর্শিক শত্রু এই কওমি সমাজ। এমনকি মাজারপন্থীদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কও তারা।
সোশ্যাল মিডিয়াগুলোও সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী রূপ প্রকাশ করে এই কওমিদেরই বিরুদ্ধে। আর এ দেশের ইতিহাস সাক্ষী—রাজনৈতিক কারণ ছাড়া জেলখানায় সবচেয়ে বেশি নির্যাতন ও জুলুম সহ্য করতে হয়েছে কওমি আলেমদেরকেই।
একবার ভেবে দেখুন, এই দেশে কওমিরা চারদিকে কী পরিমাণ শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে বসবাস করছে! তাদের বিরোধীরা নিঃশব্দে অত্যন্ত উষ্ণ ও বিষাক্ত নিশ্বাস ফেলছে তাদের চারপাশে। কখনো কি প্রশ্ন করেছেন, চিন্তা করেছেন বা ভেবে দেখেছেন—কেন এমনটা হয়?
চলুন, এর প্রকৃত কারণগুলো একে একে জেনে নেওয়া যাক।
উপমহাদেশের প্রাচীনতম ও মূল ধারা
উপমহাদেশে ইসলামের আদি এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হলো এই কওমিরা; কারণ তারাই এই অঞ্চলের প্রাচীনতম ধারা। ইতিহাসের পাতায় তাকালে এর সত্যতা মিলবে:
১৯ শতকের আগে: ‘আহলে হাদিস’ নামে আলাদা কোনো ধারার প্রভাব ছিল না, ছিল কেবল কওমি ধারা।
১৮৮৯ সালের আগে: কাদিয়ানিদের কোনো অস্তিত্ব ছিল না, অস্তিত্ব ছিল কওমিদের।
১৯১৪ সালের আগে: কথিত ‘আহলে কোরআন’-এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না, ছিল কওমিদের।
১৯৪১ সালের আগে: জামায়াতে ইসলামীর জন্মই হয়নি, ছিল কওমিরা।
১৯৯৫ সালের আগে: হিজবুত তাওহীদের অস্তিত্ব ছিল না, ছিল কেবল কওমিদের।
এই দেশে আদি ধারায় যে ইসলাম এসেছে এবং পুরো উপমহাদেশে চর্চিত ইসলামের যে প্রকৃত স্বরূপ আজ বজায় আছে, তা কওমি অঙ্গনের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠানের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। তারা দিন-রাত ইসলামের মৌলিক সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। এদের অবদান সম্পর্কে আমাদের জানা অত্যন্ত জরুরি।
আপনি যে মুসলমান, আপনি যে আজ মসজিদে নামাজ আদায় করছেন, বিয়ে-শাদি করছেন, খতনা-আকিকা, জানাজা ও ঈদের নামাজ আদায় করতে পারছেন এবং ইসলামী শরিয়তের জ্ঞান লাভ করতে পারছেন—তার পেছনে কোনো না কোনোভাবে কওমিদের অবদান রয়েছে। অথচ আজ বিভিন্ন দল ইসলামের মৌলিক বিষয়ে নিজেদের মতো করে ভাগ বসাতে চাচ্ছে, ইসলামের পরিভাষায় নিজেদের ইচ্ছেমতো নাক গলাচ্ছে।
প্রচারবিমুখতা বনাম মিডিয়ার অপপ্রচার
দুর্ভাগ্যবশত, এত ত্যাগের পরেও কওমিদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সঠিক ধারণা বা জ্ঞান নেই। এর প্রধান কারণ হলো, এরা অত্যন্ত প্রচারবিমুখ।
কিন্তু উল্টোদিকে, মূলধারার মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এদের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে আদাজল খেয়ে নামে। কওমি অঙ্গনে যদি মাত্র ০.০০১% কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা অপরাধ সংঘটিত হয়, মিডিয়া সেটাকে ২০০০% শক্তি দিয়ে প্রকাণ্ড করে অপপ্রচার শুরু করে। এই পর্বতসম অপপ্রচার ও সামাজিক আঘাতগুলো তারা নীরবে সহ্য করে নেয়।
সরল জীবন ও আদর্শের নীরব আন্দোলন
তারা একেকটি মাদ্রাসায় মাত্র তিন হাজার বা পাঁচ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। মসজিদের ইমামতি করে বেতন পান মাত্র পাঁচ হাজার বা সাত হাজার টাকা। এর ওপর প্রতিনিয়ত তাদের শুনতে হয় নানামুখী সামাজিক খোঁটা—"আমাদের অনুদানে চলে", "আমরা না দিলে ওদের সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে"।
এমন হাজারো হেনস্তা, অবহেলা আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মধ্য দিয়ে তারা বড় হন। অথচ তারা খুবই অল্পে তুষ্ট এবং অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করেন। এত কিছুর পরও কেন পুরো দুনিয়ার এত মাথাব্যথা এদের নিয়ে?
কারণ, তাদের কাছে এবং তাদের চেতনায় মূল সম্পদ হলো ‘ঈমান’। একজন প্রকৃত কওমি আদর্শের মানুষকে কখনোই টাকা দিয়ে কেনা যায় না। কোটি টাকার লোভ দেখিয়েও তাদের ঈমান ও চেতনা কেনা অসম্ভব। আর এটাই হলো তাদের নীরব আন্দোলন। চারদিকে ছড়িয়ে থাকা অর্থ-বিত্তের কোনো ফাঁদেই তারা পা দেন না।
সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন দিগন্ত
হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে তাদের অনেকেই হয়তো আন্তর্জাতিক মানের বড় বড় আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার সুযোগ পান না। কিন্তু মেধার বিস্ফোরণের জন্য কোনো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের তকমা লাগে না।
তবে আলহামদুলিল্লাহ, বর্তমানে অত্যন্ত আনন্দের একটি জোয়ার দেখা যাচ্ছে। কওমিদের এক বিশাল দল এখন মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় ও মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তারা বিশ্বমঞ্চে এক নিঃশব্দ কিন্তু শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করছেন।
একই সাথে, কওমিদের একটি বড় অংশ এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইসলামের এই আদি ধারাকে রক্ষা করতে এবং একে এগিয়ে নিতে সহায় হবেন।
লেখক: আলেম, ক্বারী, মুহাদ্দিস, ইমাম ও খতীব

