কওমি মাদরাসা ও তথ্য-সন্ত্রাস
সংকট, ঐতিহ্য ও উত্তরণের পথ
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০২:২৮
সমকালীন অপপ্রচার ও মাদরাসার বাস্তবতা
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা এবং ভারতের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে—প্রায়ই তথ্য যাচাই ছাড়াই—মাদরাসা শিক্ষাকে ‘জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র’ বা ‘অপরাধের আখড়া’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে। সাড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে মহিলা ও বালক মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আজ মাদরাসা শিক্ষা এক সুপরিকল্পিত তথ্য-সন্ত্রাসের (Information Terrorism) শিকার।
সামাজিক দ্বিমুখী নীতি ও সুশীলদের নীরবতা
আমাদের সমাজে এক ধরনের দ্বিমুখী মানদণ্ড প্রচলিত। প্রচলিত আইনে প্রাপ্তবয়স্কদের পারস্পরিক সম্পর্ক, লিভ-টুগেদার বা বিভিন্ন সামাজিক আচরণ অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ নয়। বিনোদন জগতে সম্পর্কের ভাঙন, একাধিক সম্পর্ক বা পারিবারিক অস্থিরতাকে প্রায় স্বাভাবিকভাবেই উপস্থাপন করা হয়। অথচ স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে সংঘটিত নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, অর্থপাচার ও মাদক ব্যবসার মতো গুরুতর সমস্যা নিয়ে যেখানে ততটা প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, সেখানে মাদরাসার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনায় অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এই প্রবণতা পুরো দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যা ন্যায়সংগত নয়।
মাদরাসা শিক্ষার হাজার বছরের ঐতিহ্য
মাদরাসা শিক্ষা নতুন কোনো ধারণা নয়; এর মূল ইসলামের সূচনালগ্ন পর্যন্ত বিস্তৃত। ইতিহাস বলছে, ইউরোপ যখন অন্ধকার যুগে নিমজ্জিত, তখন মুসলিম স্পেনের শিক্ষাকেন্দ্র ও বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার মাদরাসাগুলো স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতো, আর শিক্ষকেরা সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা উপভোগ করতেন। পরে লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি দ্বীনি ও পার্থিব শিক্ষার মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করে। আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো—ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অসংখ্য আলেম ও মাদরাসাশিক্ষিত মানুষের আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বর্তমানে কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভর না করে মূলত জনগণের সহযোগিতা ও আলেমদের ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে।
ভেতরের সংকট: লেবাসধারী ও সুযোগসন্ধানীদের অপতৎপরতা
তবে আত্মসমালোচনাও জরুরি। কওমি মাদরাসার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পেছনে কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। কেউ কেউ দ্বীনি পরিচয় ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবেদনশীল বিষয়ে উসকানিমূলক আলোচনা চালান, যা পরিবার ও সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আবার কেউ কেউ তাবিজ-কবজ বা জিন-ভূতের চিকিৎসার নামে প্রতারণা ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন—যা ইসলাম, আলেম সমাজ ও মাদরাসা শিক্ষার প্রকৃত চেতনার পরিপন্থী। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অননুমোদিত ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মাদরাসা গড়ে উঠেছে, যেখানে শিক্ষার মান, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও প্রয়োজনীয় তদারকির ঘাটতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
সুরক্ষায় করণীয়: আলেম সমাজ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব
ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদরাসার সুরক্ষা ও উন্নয়নে নিচের বাস্তবধর্মী পদক্ষেপগুলো জরুরি:
১. অপরাধীর বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা: কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থী অপরাধে জড়িত হলে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক আশ্রয় দেওয়া যাবে না। বরং আইনগত প্রক্রিয়ায় তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
২. অনুমোদনহীন ও মানহীন প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ: অনুমোদনহীন ও নিম্নমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড ও কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার মান, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
৩. আবাসিক ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতকরণ: শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবিক আবাসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও মানসম্মত ব্যবস্থাপনার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
৪. মিডিয়া-বিমুখতা পরিহার ও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা: আলেম সমাজ ও মাদরাসা authority ঐতিহাসিকভাবে প্রচারবিমুখ। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এই অবস্থান দুর্বলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, ফলে অপপ্রচারকারীরা সহজেই জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে। তাই মাদরাসা শিক্ষার ইতিবাচক দিক, সাফল্য ও অবদান সমাজের সামনে তুলে ধরতে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা ও নিউ মিডিয়ার কার্যকর ব্যবহার প্রয়োজন। তথ্যভিত্তিক, পেশাদার ও দায়িত্বশীল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার মাধ্যমে অপপ্রচারের জবাব দেওয়া সম্ভব।
সমালোচকদের প্রতি আহ্বান
মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার কোনো ত্রুটি থাকলে গঠনমূলক সমালোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে তা সংশোধনের চেষ্টা করা উচিত। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কিছু ব্যক্তির অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা এর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেওয়া কোনো ইতিবাচক সমাধান নয়। একই সঙ্গে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী জ্ঞান, দক্ষতা ও আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ঘটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে এবং জাতীয় উন্নয়ন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ন্যায়ভিত্তিক চিন্তা, আত্মসমালোচনার সাহস এবং সত্যকে গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন। তিনি দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থাকে সকল অপপ্রচার, সংকট ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন।
লেখক: শায়খুল হাদিস, শিক্ষাবিদ, গবেষক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

