মানবসভ্যতার ইতিহাসে ইসলাম এমন একটি ধর্ম, যা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও ভাষার সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হলো ন্যায়বিচার, দয়া, মানবিকতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তাই একজন মুসলমানের আচরণ কেবল মুসলমানদের প্রতি সীমাবদ্ধ নয়; বরং অমুসলিমদের প্রতিও তার কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ধর্মীয় সহাবস্থান, সামাজিক সম্প্রীতি এবং মানবিক সহযোগিতা নিয়ে যখন নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা যায়, তখন কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এ বিষয়ে ইসলামের অবস্থান জানা অত্যন্ত জরুরি।
দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় ইসলাম সম্পর্কে এমন ধারণা দেওয়া হয় যে, ইসলাম নাকি অমুসলিমদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ককে নিরুৎসাহিত করে। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ সহমর্মিতা ও সহযোগিতার নামে ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখাকেও উপেক্ষা করতে চান। অথচ ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। ইসলাম একদিকে অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ, ন্যায়বিচার ও মানবিক সহায়তার নির্দেশ দিয়েছে, অন্যদিকে মুসলমানের ঈমানি স্বাতন্ত্র্য ও ধর্মীয় পরিচয়ও সংরক্ষণ করেছে।
মানবতার বন্ধনে সবাই এক:
ইসলাম মানুষকে প্রথমে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন— "হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান।" — সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১৩
এই আয়াত আমাদের শেখায় যে জাতিগত, বর্ণগত কিংবা ধর্মীয় ভিন্নতা মানুষের পারস্পরিক পরিচয় ও বৈচিত্র্যের জন্য; বৈরিতা ও বিদ্বেষের জন্য নয়। একজন অমুসলিমও আল্লাহর সৃষ্টি এবং সমাজের একজন সদস্য। তাই তার মানবিক অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা করা ইসলামের শিক্ষা।
সদাচরণ ও ন্যায়বিচারের নির্দেশ:
অমুসলিমদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো ন্যায়বিচার ও সদাচরণ। আল্লাহ তাআলা বলেন— "যারা ধর্মের কারণে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।" — সূরা আল-মুমতাহানাহ, ৬০:৮
এ আয়াতে শুধু ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়নি; বরং "বির্র" বা উৎকৃষ্ট সদাচরণের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাসকারী অমুসলিমদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার করা ইসলামেরই শিক্ষা।
প্রতিবেশীর অধিকার ধর্মভেদে পরিবর্তিত হয় না:
প্রতিবেশীর অধিকারের ওপর ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিবেশী মুসলমান হোক কিংবা অমুসলিম— তার অধিকার রক্ষা করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— "জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকলেন যে, আমি ধারণা করলাম তিনি হয়তো তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।" — সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ৬০১৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৬২৪
অতএব, প্রতিবেশীর অসুস্থতায় খোঁজ নেওয়া, বিপদে সাহায্য করা, তার নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেতন থাকা এবং সামাজিক সৌহার্দ্য বজায় রাখা ইসলামী চরিত্রের অংশ।
অমুসলিম আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক:
ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। আত্মীয় মুসলমান হোক বা অমুসলিম, তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ রয়েছে।
হযরত আসমা (রা.) বর্ণনা করেন, তাঁর অমুসলিম মা তাঁর কাছে এলে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চান, তিনি কি তাঁর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন? নবীজি (সা.) বলেন— "হ্যাঁ, তোমার মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখো।" — সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ২৬২০; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০০৩
এ হাদীস প্রমাণ করে যে, ধর্মীয় ভিন্নতা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণ নয়।
অসুস্থ অমুসলিমের খোঁজ নেওয়া:
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে অমুসলিমদের প্রতি মানবিক আচরণের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এক ইহুদি বালক নবীজির (সা.) খেদমত করত। সে অসুস্থ হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে দেখতে যান। — সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ১৩৬
এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, অসুস্থ অমুসলিমের খোঁজ নেওয়া, তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং মানবিক আচরণ করা নববী আদর্শের অন্তর্ভুক্ত।
আর্থিক সহযোগিতা ও সামাজিক সহমর্মিতা:
বিপদগ্রস্ত, অসহায় বা দুর্যোগে আক্রান্ত অমুসলিমদের সাহায্য করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ ও প্রশংসনীয় কাজ।
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিম শাসকরা অমুসলিম নাগরিকদের জানমাল, সম্মান এবং মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করতেন। হযরত উমর (রা.) এক বৃদ্ধ ইহুদিকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখে তার জন্য বায়তুল মাল থেকে ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। এ ঘটনা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
আজকের প্রেক্ষাপটে দরিদ্র অমুসলিমকে সাহায্য করা, চিকিৎসা সহায়তা দেওয়া, রক্তদান করা, দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ করা কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজে একসঙ্গে অংশগ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ ও কল্যাণকর কাজ।
সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রেও রয়েছে সীমারেখা:
ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণ ও সহযোগিতার শিক্ষা দিলেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার ক্ষেত্রে মুসলমানের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন— "সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে তোমরা একে অপরকে সহযোগিতা করো; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।" — সূরা আল-মায়েদাহ, ৫:২
এ আয়াতের আলোকে ফকীহগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, মানবিক, সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজে অমুসলিমদের সহযোগিতা করা বৈধ; কিন্তু এমন কাজে সহযোগিতা করা বৈধ নয়, যা সরাসরি তাদের ধর্মীয় উপাসনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচার-প্রসারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
সুতরাং কোনো অমুসলিম প্রতিবেশীর অসুস্থতায় পাশে দাঁড়ানো, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাহায্য করা, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যসেবামূলক কাজে সহযোগিতা করা এক বিষয়; আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে যাওয়া বা ধর্মীয় উপাসনায় সহযোগিতা করা ভিন্ন বিষয়।
ধর্মীয় উৎসব ও উপাসনালয়ে সহযোগিতার বিধান:
এ প্রসঙ্গে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে— অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব বা উপাসনালয়ে সহযোগিতা করা যাবে কি? ইসলামী শররিয়তের আলোকে বিষয়টি কিছুটা বিশদভাবে বোঝা প্রয়োজন।
যদি সহযোগিতার বিষয়টি মানবিক বা নাগরিক অধিকারের পর্যায়ে হয়— যেমন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রতিবেশীসুলভ সৌজন্য প্রদর্শন করা, কোনো দুর্ঘটনা বা দুর্যোগে সাহায্য করা— তাহলে তা বৈধ হতে পারে।
কিন্তু কোনো ধর্মীয় উৎসবের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনা, ধর্মীয় প্রতীক প্রচার কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠান সফল করার উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ বা সহযোগিতা করা অধিকাংশ ফকীহের মতে বৈধ নয়। কারণ এতে মুসলমানের ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন— "তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম, আর আমার জন্য আমার ধর্ম।" — সূরা আল-কাফিরুন, ১০৯:৬
ইসলামের শিক্ষা হলো— অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে সম্মান করতে হবে, তাদের ওপর জবরদস্তি করা যাবে না; কিন্তু একই সঙ্গে নিজের ঈমান, আকিদা ও ধর্মীয় পরিচয়ও অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।
অন্যায়ের বিরোধিতা, মানুষের নয়:
ইসলাম অমুসলিমদের প্রতি সদাচরণের শিক্ষা দিলেও অন্যায়, জুলুম ও ধর্মবিরোধী কার্যক্রমের সমর্থন করতে বলেনি। একজন মুসলমান অন্যায়ের বিরোধিতা করবে, কিন্তু মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার ও মানবিকতা বজায় রাখবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন— "ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।" — সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৬
অতএব, ইসলামের দাওয়াত হবে প্রজ্ঞা, সুন্দর উপদেশ এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে; বিদ্বেষ, গালিগালাজ বা জবরদস্তির মাধ্যমে নয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাস্তব দৃষ্টান্ত:
নবী করিম (সা.)-এর জীবন অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্কের অসংখ্য উদাহরণে পরিপূর্ণ। মদিনায় তিনি মুসলিম, ইহুদি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি নাগরিক চুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা ইতিহাসে "মদিনা সনদ" নামে পরিচিত।
একবার একটি জানাজা তাঁর সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে তিনি সম্মানসূচকভাবে দাঁড়িয়ে যান। তখন বলা হলো, এটি তো একজন ইহুদির জানাজা। উত্তরে তিনি বলেন— "সে কি একজন মানুষ ছিল না?" — সহীহ আল-বুখারী, হাদীস: ১৩১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৯৬১
এই ঘটনা ইসলামের মানবিক ও ন্যায়নিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির একটি অনন্য উদাহরণ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয়:
আজকের বিশ্বে মুসলমানদের উচিত নিজেদের চরিত্র ও আচরণের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা। অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ, সহকর্মীর প্রতি ন্যায়পরায়ণতা, সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ এবং মানবিক সহযোগিতা ইসলামেরই শিক্ষা।
তবে একই সঙ্গে আকিদাগত সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সহমর্মিতা ও সহযোগিতা মানে নিজের বিশ্বাস বিসর্জন দেওয়া নয়; বরং নিজের আদর্শ অটুট রেখেই মানুষের কল্যাণে কাজ করা।
তাই, একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো— অমুসলিমদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো, মানবিক সহযোগিতা করা; তবে ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম না করা। এই ভারসাম্যপূর্ণ পথই কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা এবং ইসলামের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ।
লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ।

