Logo

ধর্ম

দেশ ও জাতির গৌরব

জাতীয় খতিব মুফতি আবদুল মালেক

Icon

আবু আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ২০:১৬

জাতীয় খতিব মুফতি আবদুল মালেক

ইসলামি আইন ও হাদিসশাস্ত্রে অনন্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক বর্তমানে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কেবল বাংলাদেশে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা ও ইলমি খিদমতের কারণে সমগ্র মুসলিম বিশ্বেই তিনি অত্যন্ত সমাদৃত ও সুপরিচিত এক ব্যক্তিত্ব।

​শিক্ষাজীবনে তিনি বিশ্বখ্যাত হাদিসবিশারদ আল্লামা আবদুর রশীদ নোমানীর সান্নিধ্যে তিন বছর উচ্চতর হাদিস এবং জাস্টিস আল্লামা তাকি উসমানির তত্ত্বাবধানে দুই বছর ফিকহশাস্ত্র (ইসলামি আইন) অধ্যয়ন করেন। এরপর সৌদি আরবে প্রখ্যাত সিরিয়ান মুহাদ্দিস আল্লামা আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর সঙ্গে প্রায় আড়াই বছর গবেষণামূলক কাজে যুক্ত ছিলেন।

​হাদিসশাস্ত্রে তার রচিত আকর গ্রন্থ ‘আল মাদখাল ইলা উলুমিল হাদিসিশ শরিফ’ (১৯৯৮) দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উচ্চতর ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবই হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি; বর্তমানে সেখানে শিক্ষাসচিব ও উচ্চতর হাদিস বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে আছেন। এই প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র হিসেবে ২০০৫ সাল থেকে তার তত্ত্বাবধানে নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ‘মাসিক আলকাউসার’। এ ছাড়া ২০১২ সালে গঠিত বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন এবং ভারতের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি ফিকহ একাডেমির অন্যতম সদস্য তিনি।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

​মুফতি আবদুল মালেক ১৯৬৯ সালের ২৯ আগস্ট কুমিল্লা জেলার লাকসাম উপজেলার সারাশপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার বাবা মাওলানা শামসুল হকও একজন আলেম ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

​পারিবারিক পরিমণ্ডলে পবিত্র কুরআন ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি চাঁদপুরের খিড়িহারা কওমি মাদরাসায় ‘মিশকাত’ জামাত পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের করাচির জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়া থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ‘দাওরায়ে হাদিস’ (মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করেন। এরপর একই মাদরাসার উচ্চতর হাদিস বিভাগে ভর্তি হয়ে শায়খ আবদুর রশীদ নোমানীর তত্ত্বাবধানে তিন বছর হাদিসচর্চায় নিমগ্ন থাকেন। ১৯৯২ সালে দারুল উলুম করাচিতে ভর্তি হয়ে আল্লামা তাকি উসমানির সরাসরি তত্ত্বাবধানে দুই বছর উচ্চতর ফিকহ ও ফতোয়া বিভাগ সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে অবস্থানকালে বিশ্ববরেণ্য আলেম শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করার বিরল সুযোগ পান।

কর্মজীবন

​ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার ও উচ্চতর গবেষণার লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালে কয়েকজন দূরদর্শী আলেমের সমন্বয়ে তিনি ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া’। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তিনি এর শিক্ষাসচিব ও উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগের প্রধান হিসেবে অবদান রেখে চলছেন। এর পাশাপাশি তিনি জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া ঢাকার ‘শায়খুল হাদিস’ হিসেবেও নিয়োজিত আছেন।

​কওমি মাদরাসার সরকারি স্বীকৃতির পথ সুগম করতে ২০১২ সালে গঠিত ‘বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা কমিশন’-এর সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ২০১৯ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ‘জাতীয় চাঁদ দেখা উপকমিটি’র প্রধান হিসেবেও তিনি মনোনীত হন।

সাহিত্য ও গবেষণাকর্ম

​মুফতি আবদুল মালেকের তত্ত্বাবধানে ২০০৫ সাল থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক আলকাউসার’ পত্রিকা ইসলাম ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণামূলক দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছে। আরবি ও বাংলা ভাষায় তার বেশ কিছু কালজয়ী গ্রন্থ রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য-

​আল মাদখাল ইলা উলুমিল হাদিসিশ শরিফ (আরবি), ​আল ওয়াজিজ ফি শাইয়ি মিন মুসত্বলাহিল হাদিসিশ শরিফ (আরবি),​মুহাদারাত ফি উলুমুল হাদিস (আরবি), উম্মাহর ঐক্য: পথ ও পন্থা, ​ইনায়াতুর রহমান ফি আদাদি আয় আল কুরআন, ​তাসাওউফ: তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ, ​তালিবানে ইলম: পথ ও পাথেয়, ​ঈমান সবার আগে, ​প্রচলিত ভুল, তাবলীগ জামাত: বর্তমান পরিস্থিতি ও উত্তরণের উপায় ইত্যাদি।

বিশ্বখ্যাত মনীষীদের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি

​মুফতি আবদুল মালেকের ইলমি গভীরতা শুধু দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, আরব্য বিশ্ব ও ভারতীয় উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম তার মেধার অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন।

​শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা (সিরিয়া): আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই মুহাদ্দিস মুফতি আবদুল মালেককে একজন খাঁটি ‘মুহাক্কিক (গবেষক) আলেম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

​শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (সিরিয়া): নিজের এই সহকারী সম্পর্কে তিনি এক স্মৃতিচারণে বলেছিলেন— "সে দাবি করে যে আমার কাছ থেকে উপকৃত হয়েছে, অথচ বাস্তবতা হলো আমিই তার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। সে তার সমসাময়িক উস্তাদদেরও ছাড়িয়ে যাবে, আর সেই উস্তাদদের তালিকায় প্রথম নামটি হবে আমার।"

​মাওলানা সাঈদ আহমদ পালনপুরী (ভারত): দারুল উলুম দেওবন্দের সাবেক এই প্রধান শিক্ষক মুফতি আবদুল মালেকের ‘আল-মাদখাল’ কিতাবটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন— "আল্লাহর বিশেষ তওফিকপ্রাপ্ত এবং ইলমচর্চায় নিমগ্ন এই লেখকের কিতাবটি আমাকে বিমোহিত ও আশ্চর্যান্বিত করেছে।"

দেশীয় শীর্ষ আলেমদের মূল্যায়ন

দারুল উলুম হাটহাজারীর সাবেক মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.) এবং জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার সাবেক মুহতামিম আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রহ.) তাকে যৌথভাবে ‘বাংলাদেশের গৌরব ও সৌভাগ্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

উপসংহার

​আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং বর্তমান মুসলিম বিশ্বের ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক আলোকবর্তিকা। হাদিস, ফিকহ ও সমসাময়িক গবেষণায় তার গভীর পাণ্ডিত্য এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবজনক। ঐতিহ্যবাহী কওমি ধারার প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি সংস্কারে এবং আধুনিক জ্ঞান-কাঠামোর সঙ্গে ইসলামের শাশ্বত শিক্ষার সমন্বয় সাধনে তার অবদান চিরস্মরণীয়। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে তার এই পথচলা দেশের দ্বীনি নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করবে এবং উম্মাহর ঐক্য ও সঠিক দিকনির্দেশনা তৈরিতে অনন্য ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: শায়খুল হাদিস, গবেষক, লেখক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন