জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি ও ইসলামী নির্দেশনা
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৫:২২
মূল্যস্ফীতি আজকের অর্থনীতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী। বাজেট ২০২৬–২৭ যদি সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণমুখী হয়, তবে সেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ইসলাম অর্থনৈতিক জীবনে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও শোষণমুক্ত ব্যবস্থার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে এমন বহু নির্দেশনা রয়েছে, যা আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য।
ন্যায়ভিত্তিক বাজারব্যবস্থার ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে বাজার স্বাধীন, কিন্তু সেই স্বাধীনতা দায়িত্বশীলতার সাথে যুক্ত। অন্যায়ভাবে দাম বাড়ানো, প্রতারণা বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা মাপে ও ওজনে কম দিও না।" — (সূরা আল-আন‘আম: ১৫২)
এই আয়াত বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করে।
কৃত্রিম সংকট ও মজুদদারির নিষেধাজ্ঞা
বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও মজুদদারি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি মজুদদারি করে, সে গুনাহগার।" — (সহিহ মুসলিম: ১৬০৫)
আরেক হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি মুসলমানদের কষ্ট দেওয়ার উদ্দেশ্যে খাদ্য মজুদ করে, আল্লাহ তাকে কষ্টে ফেলবেন।" — (ইবনে মাজাহ: ২১৫৫)
এই নির্দেশনা স্পষ্ট করে যে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধও বটে।
ন্যায্য মূল্যনীতি ও ভোক্তা সুরক্ষা
ইসলাম শোষণমূলক মুনাফাকে সমর্থন করে না। ব্যবসায় ন্যায্যতা বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
আল্লাহ তাআলা বলেন: "তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।" — (সূরা আল-বাকারা: ১৮৮)
এই নির্দেশনা ভোক্তা অধিকার ও বাজার শৃঙ্খলার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। বাজেট ২০২৬–২৭-এ যদি নিম্নলিখিত বিষয়গুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে আসবে:
- সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ
- মাঠপর্যায়ে বাজার তদারকি
- ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা
- স্বচ্ছ ও সহজ আমদানি নীতি
- অপচয় রোধ ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য
অপচয় একটি অর্থনৈতিক ব্যাধি, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে प्रभावित করে। আল্লাহ তাআলা বলেন:"নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।" — (সূরা আল-ইসরা: ২৭)
রাষ্ট্রীয় বাজেটেও অপচয়, দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো জরুরি। এতে অর্থনীতিতে দ্রুত স্থিতিশীলতা আসে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন
খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা গতিশীল রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ বলেন: "তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না।" — (সূরা আল-আ‘রাফ: ৩১)
বাজেট ২০২৬–২৭-এ বাজারের সরবরাহ স্থিতিশীল করে মূল্যস্ফীতি কমাতে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি:
- কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন
- সেচ, বীজ ও সার সহায়তা নিশ্চিতকরণ
- সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণাগার (Cold Storage) উন্নয়ন
- মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য হ্রাস করা
সুদভিত্তিক অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি
সুদভিত্তিক অর্থনীতি সম্পদের অসম বণ্টন তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতি ও বাজারের অস্থিরতা বাড়ায়। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" — (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)
সুদের পরিবর্তে উৎপাদনমুখী ও অংশীদারিত্বভিত্তিক (যেমন: মুদারাবা বা মুশারাকা) অর্থনীতি মূল্য স্থিতিশীলতায় প্রধান সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্রের জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব
ইসলামে রাষ্ট্র হলো জনগণের দায়িত্বশীল অভিভাবক। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" — (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
এই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যস্ফীতির সামাজিক প্রভাব কমাতে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্বগুলো হলো:
- দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সহায়তা
- নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যে ভর্তুকি প্রদান
- নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি
- সবার জন্য চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা
- নৈতিক ব্যবসা ও বাজার শৃঙ্খলা
সৎ ও নৈতিক ব্যবসা অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "সৎ ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (পরকালে) নবী ও শহীদদের সাথে থাকবেন।" — (তিরমিজি: ১২০৯)
বাজারে পূর্ণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন:
- দুর্নীতি দমন ও জবাবদিহিতা
- লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা
- কঠোর বাজার মনিটরিং সেল গঠন
- অনলাইন ট্র্যাকিং ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা
মুদ্রানীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
অতিরিক্ত অর্থ ছাপানো বা অনুৎপাদনশীল খাতে অপ্রয়োজনীয় ঋণ গ্রহণ মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। তাই বাজেটে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা জরুরি। এর মূল দিকগুলো হওয়া উচিত:
- প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধি
- ঘাটতি বাজেট নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসন
- দেশি-বিদেশি বিনিয়োগবান্ধব নীতি
- রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বৃদ্ধি
সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাস
ইসলাম দুর্বল ও অসহায় মানুষের সুরক্ষাকে রাষ্ট্রীয় মূল দায়িত্ব হিসেবে দেখেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: "আল্লাহ ন্যায়বিচার ও কল্যাণের নির্দেশ দেন।" — (সূরা আন-নাহল: ৯০)
বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ালে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, বাজারে পণ্যের চাহিদা স্থিতিশীল থাকে এবং পরোক্ষভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে আসে।
পরিশেষে
বলা যায়, বাজেট ২০২৬–২৭ কেবল একটি বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়; এটি সাম্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি বড় नैतिक ও সামাজিক মাধ্যম হতে পারে। এই বাজেট যদি পবিত্র কোরআন ও হাদিসের অর্থনৈতিক নীতিমালার আলোকে প্রণীত ও বাস্তবায়িত হয়, তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব কিছু নয়। একটি স্থিতিশীল, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য ইসলামের সুমহান শিক্ষাই হতে পারে আমাদের প্রধান দিকনির্দেশনা—যেখানে ন্যায়, সততা ও দায়িত্বশীলতাই হবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান: জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।

