বিশ্ব রক্তদাতা দিবস আজ
ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তদান ও জীবন রক্ষা
সৈয়ব আহমেদ সিয়াম
প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৬, ১৩:২৯
আজ ১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস। প্রতি বছরের মতো এবারও বিশ্বজুড়ে দিনটি পালিত হচ্ছে এক বুক গভীর কৃতজ্ঞতা নিয়ে— সেই সব নাম না জানা মানুষদের জন্য, যারা নিজেদের শরীরের এক ব্যাগ তপ্ত লাল রক্ত অন্য একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জীবন বাঁচাতে নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই স্বর্ণযুগে দাঁড়িয়েও মানুষ কৃত্রিম উপায়ে বহু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা টিস্যু তৈরি করতে পারলেও, রক্তের কোনো বিকল্প আজ পর্যন্ত ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। রক্ত কেবল মানুষের শরীরেই তৈরি হয়; তাই মুমূর্ষু মানুষের জীবনপ্রদীপ সচল রাখতে মানুষের ভালোবাসাই একমাত্র ভরসা।
ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তদান: মানবসেবার সর্বোচ্চ ইবাদত
রক্তদান নিয়ে অনেকের মনেই বিভিন্ন ধর্মীয় প্রশ্ন বা সামাজিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে। তবে আধুনিক ইসলামের স্কলার এবং বিশ্বের প্রথম সারির ফতোয়া বোর্ডগুলোর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী— কোনো মুমূর্ষু মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য রক্তদান করা কেবল জায়েজই নয়, বরং এটি অত্যন্ত সওয়াবের এবং একটি মহান মানবিক ইবাদত।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা মানবজীবন রক্ষার সর্বোচ্চ গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন: “এবং যে ব্যক্তি কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করল।” (সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৩২)
ইসলামে মানবসেবাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যের বিপদে এগিয়ে আসা এবং জীবন বাঁচানোর এই মহৎ কাজকে উৎসাহিত করে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস উল্লেখ করা হলো:
১. বিপদগ্রস্তের পাশে দাঁড়ানোর সওয়াব:
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি বিপদ-আপদ দূর করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার কঠিন বিপদসমূহ দূর করে দেবেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৬৯৯)
২. আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার মাধ্যম:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহ তাআলা ততক্ষণ তার সাহায্যে নিয়োজিত থাকেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৫৮০)
৩. সৃষ্টির সেবায় শ্রেষ্ঠত্ব:
হযরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি কল্যাণ বা উপকার করে।” (আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস নং: ৫৭৮৭)
৪. অপরের প্রতি দয়া করার সুফল:
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “দয়াশীলদের ওপর দয়াময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আসমানের মালিক (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৯৪১)
৫. উত্তম প্রতিদান ও সহজ হাশর:
হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো অভাবী বা সংকটাপন্ন মানুষের কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতে তার কষ্ট দূর করে দেবেন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২২৫০)
দিবসের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক সংকট
অস্ট্রিয়ান জীববিজ্ঞানী ও নোবেলজয়ী চিকিৎসক কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার, যিনি মানবদেহের রক্তের প্রধান গ্রুপগুলো (‘এ, বি, ও’) আবিষ্কার করেছিলেন, তার জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৪ জুন বিশ্বজুড়ে এই দিবসটি পালন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশের মোট জনসংখ্যার অন্তত ১ শতাংশ মানুষ যদি নিয়মিত রক্তদান করেন, তবে সেই দেশের রক্তের জরুরি চাহিদা মেটানো সম্ভব। বিশ্বব্যাপী বছরে প্রায় ১১ কোটি ৮৫ লাখ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হলেও এর ৪০ শতাংশই আসে উন্নত বিশ্বে, যেখানে মাত্র ১৬ শতাংশ মানুষ বসবাস করে। ফলে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রক্তের তীব্র সংকট লেগেই থাকে। আন্তর্জাতিক জার্নাল (PMC Blood Supply Report) অনুসারে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে প্রতি বছর ১০০ মিলিয়নেরও (১০ কোটি) বেশি ইউনিট রক্তের ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশে রক্তের অভাব ও মাতৃমৃত্যুর করুণ চিত্র
বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৮ থেকে ১০ লক্ষ ব্যাগ রক্তের চাহিদা থাকে। এই চাহিদার ঘাটতির কারণে থ্যালাসেমিয়া, ক্যানসার এবং জরুরি অস্ত্রোপচারের রোগীদের পাশাপাশি প্রসবকালীন মায়েরা চরম ঝুঁকিতে পড়েন।
বাংলাদেশ ম্যাটারনাল মর্টালিটি অ্যান্ড হেলথ কেয়ার সার্ভে (BMMS)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট মাতৃমৃত্যুর প্রায় ৩১% ঘটে থাকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের (Postpartum Hemorrhage) কারণে। দেশে প্রতি বছর প্রসবকালীন জটিল রক্তক্ষরণে আনুমানিক ২ হাজার ৩৯ জন মা মারা যান, যার মধ্যে প্রায় ৪৬২ জন হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই এবং ১ হাজার ১৫৪ জন হাসপাতালে থাকা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক রক্তের জোগান না মেলায় প্রাণ হারান। রক্তদাতার অভাব বা রক্তের গ্রুপ মিলতে দেরি হওয়ার কারণে হওয়া বিলম্বই এই ৭৮% মাতৃমৃত্যুর জন্য দায়ী, যা সময়মতো রক্ত পেলে প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।
রক্তের বিজ্ঞান: উপাদান পৃথকীকরণ
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ব্যাগ রক্তকে বিভিন্ন উপাদানে বিভক্ত করে একসাথে ৩ জন রোগীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব:
১. লোহিত রক্তকণিকা (RBC): তীব্র রক্তক্ষরণ, দুর্ঘটনা বা অ্যানিমিয়ার রোগীদের দেওয়া হয়। এটি ৪২ দিন সংরক্ষণ করা যায়।
২. প্লাজমা (Plasma): আগুনে পোড়া বা লিভারের রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয়। এটি ১ বছর পর্যন্ত হিমায়িত রাখা সম্ভব।
৩. প্লাটিলেট (Platelets): ডেঙ্গু বা ব্লাড ক্যানসার রোগীদের জন্য জরুরি। এর আয়ু মাত্র ৫ দিন।
রক্তদানের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী কিছু ন্যূনতম যোগ্যতা আবশ্যক:
১. বয়স ও ওজন: বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছর এবং ওজন সর্বনিম্ন ৪৫ কেজি (মেয়েদের ক্ষেত্রে ৫০ কেজি) হতে হবে।
২. শারীরিক সুস্থতা: রক্তচাপ স্বাভাবিক এবং হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ (পুরুষদের ন্যূনতম ১২.৫ গ্রাম/ডিসি. এবং নারীদের ১১.৫ গ্রাম/ডিসি.) সঠিক থাকতে হবে।
৩. সময়সীমা: একবার রক্ত দেওয়ার পর পুরুষদের অন্তত ৩ মাস এবং নারীদের ৪ মাস অপেক্ষা করতে হয়।
৪. মাদকমুক্ত রক্ত: কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি রক্তদান করতে পারবেন না। বিশেষ করে যারা সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক নেন, তাদের রক্তে হেপাটাইটিস-বি, সি এবং এইচআইভি/এইডস-এর ঝুঁকি শতভাগ। তাই রোগীকে বিশুদ্ধ রক্ত দিতে রক্তদাতাকে অবশ্যই সম্পূর্ণ মাদকমুক্ত হতে হবে।
রক্তদান আন্দোলন ও সামাজিক মাধ্যম
বাংলাদেশে নিরাপদ রক্ত আন্দোলনে 'সন্ধানী', 'বাঁধন' এবং 'বিআরএফ ইয়ুথ ক্লাব'-এর মতো সংগঠনগুলো এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। মফস্বল বা জেলা শহরগুলোতে রক্তের সংকট দূর করতে 'নওগাঁ ব্লাড সার্কেল'-এর মতো স্থানীয় সংগঠনগুলো গ্রামীণ জনপদের ভরসার নাম হয়ে উঠেছে। বর্তমান যুগে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো রক্তদাতার সন্ধান মেলাতে ভার্চুয়াল নিয়ন্ত্রণ কক্ষের মতো কাজ করছে। এ ছাড়া, নারীদের রক্তদান নিয়ে প্রচলিত সামাজিক ট্যাবু ও ভুল ধারণাগুলো এখন সচেতনতার কারণে ভাঙতে শুরু করেছে।
এই মানবিক আন্দোলনকে বেগবান করতে রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বড় ভূমিকা রয়েছে:
১. মসজিদ: ইমাম সাহেবগণ মসজিদে খুতবা ও বয়ানে রক্তদানের সওয়াব ও গুরুত্ব প্রচার করতে পারেন এবং ধর্মীয় উৎসবগুলোতে ব্লাড ক্যাম্পের আয়োজন করতে পারেন।
২. মাদ্রাসা: মাদকমুক্ত নিরাপদ রক্তের উৎস হিসেবে মাদ্রাসাপড়ুয়ারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
৩. সরকারের দায়িত্ব: প্রতিটি জেলা হাসপাতালে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক সেন্ট্রাল ব্লাড ব্যাংক স্থাপন, রক্ত বাণিজ্য বন্ধ করা এবং একটি জাতীয় রক্তদাতা ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন।
৪. ইনফ্লুয়েন্সার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: সেলিব্রিটি ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা প্রচারণার মাধ্যমে তরুণদের সুইয়ের ভয় দূর করতে পারেন এবং পাঠ্যপুস্তকে রক্তদানের গুরুত্ব অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
রক্তদাতার স্বাস্থ্যগত সুফল ও পরিচর্যা
নিয়মিত রক্তদান করলে শরীরে অতিরিক্ত আয়রনের মাত্রা কমে যায়, যা হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়। রক্ত দেওয়ার পর শরীরের অস্থিমজ্জা (Bone Marrow) নতুন রক্তকণিকা তৈরির জন্য উদ্দীপিত হয়। এ ছাড়া, প্রতিবার রক্তদানের পূর্বে হেপাটাইটিস-বি, সি, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস এবং এইচআইভি-এর মতো ৫টি মারাত্মক রোগের স্ক্রিনিং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়।
রক্তদানের পর: রক্তদানের পর ১০-১৫ মিনিট শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া উচিত এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার খাওয়া প্রয়োজন। রক্তদাতাকে সমাজের একজন নিঃস্বার্থ 'হিরো' হিসেবে সম্মানিত করা আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু মারজিয়া, কিডনি বিকল হওয়া আব্দুর রহমান কিংবা ব্লাড ক্যানসার, সিজার ও দুর্ঘটনার শিকার হাজারো মানুষ প্রতিদিন অন্যের দেওয়া রক্তের ওপর ভরসা করে বেঁচে থাকে। আপনি রক্ত দিলে তারা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখবে, আর না দিলে হয়তো নিভে যাবে একটি প্রাণ। যদি নিজে সুস্থ থাকেন, তবে সিদ্ধান্ত আপনার। আসুন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত মানবিক পথে হেঁটে জীবনের এই পবিত্র ইবাদতে শামিল হই।
আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য রক্তদান করে জীবন বাঁচানোর উসিলা হয়ে উঠুন, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আপনাদের সবাইকে কবুল করুন। আমিন।
লেখক: রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (বিআরএফ)। ইমেইল: syeb.siyam@brfbd.org

