মুসলিম উম্মাহ
মধ্যপ্রাচ্যে ইখওয়ানের অবদান ও মুসলিম বিশ্বের আদর্শিক সংকট
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ২০:১৮
সেবামূলক আন্দোলন হিসেবে মুসলিম ব্রাদারহুড
মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষত মিশরে ‘ইখওয়ানুল মুসলিমীন’ (মুসলিম ব্রাদারহুড) কেবল কোনো সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। এটি শুরু থেকেই ছিল একটি বিস্তৃত সমাজসেবামূলক, শিক্ষামূলক ও দাওয়াতি আন্দোলন। শিক্ষা, চিকিৎসা, জনকল্যাণ, বুদ্ধিবৃত্তিক গবেষণা ও লেখালেখির মাধ্যমে তারা দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করে আসছে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে একটি আদর্শ ও আধুনিক সমাজ গঠন করা। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক এবং পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সমসাময়িক চিন্তা ও ইসলামী কর্মধারার ওপর ইখওয়ানের এই মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক দর্শনের স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে।
মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণে তারা অসংখ্য আধুনিক হাসপাতাল, মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এতিমখানাসহ নানা সেবামূলক প্রজেক্ট গড়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে একটি স্থায়ী ও বিশেষ স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়। তাদের দৃষ্টিতে ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত বা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি মানবজীবনের ব্যক্তি, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর এক পূর্ণাঙ্গ ও প্রগতিশীল জীবনব্যবস্থা।
ক্ষমতার রাজনীতি ও পশ্চিমা আধিপত্যের প্রশ্ন
আরব বসন্ত-পরবর্তী সময়ে মিশরে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রথমবারের মতো মুসলিম ব্রাদারহুড রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। তবে পরবর্তী আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং দেশটি এক চরম কর্তৃত্ববাদী বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়ায়। বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও নির্মম পরিবর্তনের পেছনে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বড় ভূমিকা রেখেছে। এখানে জড়িয়ে ছিল বিভিন্ন পশ্চিমা ও আঞ্চলিক পরাশক্তির নিজস্ব কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ।
অনেকের বিশ্বাস, মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রস্থলে একটি খাঁটি ইসলামী গণতান্ত্রিক শক্তির এই অভূতপূর্ব উত্থান ওই অঞ্চলের ঐতিহ্যগত স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের পশ্চিমা মিত্রদের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে তাদের আদর্শিক সংঘাত তৈরি হয়। মূলত এই কারণেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের প্রতি প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের দ্বিমুখী নীতিকেই উন্মোচিত করে।
মুসলিম বিশ্বের আদর্শিক পরাধীনতা ও ইরানের অভিজ্ঞতা
ইসলাম একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনদর্শন। এর মধ্যে নৈতিকতা, সাম্য, মানবতা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রচিন্তার নিজস্ব সুদৃঢ় এবং কালজয়ী কাঠামো রয়েছে। তবে আধুনিক মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রে সেই কাঠামোর কোনো বাস্তব প্রতিফলন ঘটেনি। উপনিবেশবাদের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অবসান হয়তো ঘটেছে, কিন্তু চিন্তা, মনস্তত্ত্ব, শিক্ষা, আইন ও প্রশাসনের বহু ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক পরাধীনতার মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকার আজও মুসলিম সমাজকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের পর থেকে দেশটি নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের কারণে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। একইভাবে আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের পরও ভূরাজনৈতিক জটিলতা কাটেনি। দেশটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ফ্রিজ হওয়া ফান্ড পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে নানা বৈশ্বিক বাধা রয়ে গেছে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমকালীন মুসলিম বিশ্বে আজ একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নিজেদের স্বকীয়তা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বিভক্তি, সুবিধাবাদ ও স্থবিরতা
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, এখানে লক্ষ লক্ষ অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তা সত্ত্বেও রাষ্ট্র পরিচালনায় বা নীতি নির্ধারণে ইসলামী রাজনীতির অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক, হতাশা ও স্থবিরতা চলছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ইসলামী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ তীব্র বিভক্তি, উপদলীয় কোন্দল এবং পারস্পরিক অনৈক্যই এর জন্য প্রধানত দায়ী। একই সঙ্গে সমসাময়িক বাস্তবতার আলোকে বৃহত্তর কৌশলগত দূরদর্শিতা ও আধুনিক রাজনৈতিক সমন্বয়ের অভাব ইসলামী ধারার রাজনীতিকে বারবার প্রান্তিক করে তুলেছে।
সমালোচকদের তীব্র অভিযোগ, এদেশের একশ্রেণির ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাময়িক ক্ষমতার সুবিধা, বৈষয়িক লোভ কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে বৃহত্তর আদর্শিক অবস্থান থেকে সহজেই বিচ্যুত হন। এর ফলে দলগত বিভাজন ও জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি আরও গভীর হয়। ফলস্বরূপ, সমাজে ইসলামের যে একটি প্রগতিশীল, উদার ও কল্যাণমুখী রূপ রয়েছে, তা সাধারণ মানুষের সামনে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয় না। এর পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, অর্থপাচার, সামাজিক বৈষম্য ও আর্থিক অনিয়ম বর্তমানে দেশের প্রধান সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় থেকে রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে হলে কেবল ধর্মীয় স্লোগান নয়, বরং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা ও সৎ-যোগ্য নেতৃত্বের বাস্তব কোনো বিকল্প নেই।
নতুন সময়ের প্রত্যাশা ও জনগণের মনস্তত্ত্ব
সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক ও গণমুখী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। রাষ্ট্র সংস্কার ও ইনসাফ কায়েমের মাধ্যমে অনেকেই এক সুদূরপ্রসারী ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিলেন। তবে আমলাতন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সেই কাঙ্ক্ষিত এবং দৃশ্যমান পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়নি, যা এক ধরণের জনঅসন্তোষ তৈরি করছে।
আমাদের দেশে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় আবেগকে সস্তা ও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা বেশ পুরোনো। সেকুলার বা ডানপন্থী—সব দলই ভোটের আগে ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতা পাওয়ার পর তা সহজেই ভুলে যায়। ফলে রাজনীতিকদের ওপর জনগণের মধ্যে এক তীব্র আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর পাশাপাশি ইসলামের প্রকৃত রাজনৈতিক নীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি (যেমন কর ও জাকাত ব্যবস্থা) এবং নাগরিক অধিকারের দর্শন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পর্যাপ্ত ও সঠিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এই কাঠামোগত অসচেতনতা ও হুজুগে মাতাল হওয়ার প্রবণতাও সমাজ সংস্কারের পথে একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক বাধা।
উত্তরণের পথ: ঐক্য, দাওয়াহ ও ইতিবাচক কর্মসূচি
বর্তমান বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামী ধারার বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ, পীর-মাশায়েখ ও সংগঠনগুলোর মধ্যে কাদা-ছোড়াছুড়ি এবং কাদা-লেপন সম্পূর্ণ বন্ধ করা প্রয়োজন। এখন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গঠনমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ ও উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে একটি নূন্যতম এজেন্ডার ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলা অপরিহার্য। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শাখা-গত (ফেকহী) বা তরীকত-ভিত্তিক মতপার্থক্যকে কোনোভাবেই সামাজিক সংঘাত বা কাফের-ফাসেক ফতোয়া দেওয়ার কারণ বানানো যাবে না। ইসলামের মৌলিক মানবতাবোধ, নৈতিকতা ও বিশ্বজনীন মানবকল্যাণের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি (শোষণমুক্ত সমাজ) এবং অমুসলিম তথা সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষার যে অনন্য ঐতিহাসিক মদিনা সনদের দৃষ্টান্ত রয়েছে, তা প্রজ্ঞার সাথে আধুনিক ভাষায় সমাজের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। দলীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও সীরাতকে সামনে রাখতে হবে। সবাইকে একে অপরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং সমাজ সংস্কারের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে।
একটি সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা
ইতিহাসের প্রতিটি যুগ ও সভ্যতার উত্থান-পতনই প্রমাণ করে যে, কোনো টেকসই ও স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা ঘটে মানুষের অভ্যন্তরীণ মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের মাধ্যমে। ব্যক্তি সংশোধনের মাধ্যমে প্রথমে গড়ে ওঠে একটি আদর্শ ও নৈতিক পরিবার। আর আদর্শ পরিবারের সমষ্টি থেকেই নির্মিত হয় একটি শোষণহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী মানবিক সমাজ।
ইসলামের শাশ্বত নৈতিকতা, সততা, মেধা ও ইনসাফের শিক্ষা যদি আন্তরিকতার সঙ্গে আধুনিক প্রজন্মের মনস্তত্ত্ব বুঝে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া যায়, তবে সমাজে ইতিবাচক জাগরণ আসবেই। এর ফলে দুর্নীতি, সামাজিক অবিচার ও যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ও স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি বৈষম্যহীন, ইনসাফপূর্ণ, সন্ত্রাসমুক্ত ও সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত মানবিক বাংলাদেশ গড়া; যেখানে মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পরস্পরের পরিপূরক হবে। এই সুন্দর ও সাম্যের স্বপ্নই হোক আমাদের আগামী প্রজন্মের পথচলার মূল প্রেরণা।
লেখক: শায়খুল হাদিস, শিক্ষাবিদ, গবেষক; পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

