Logo

ধর্ম

খেলাধুলা ও সমর্থন: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

Icon

মাহবুব বিন জহির

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০১:০৪

খেলাধুলা ও সমর্থন: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আনন্দ, বিনোদন ও শরীরচর্চাকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে ইসলামে সবকিছুর একটি সীমা ও ভারসাম্য রয়েছে। ​আল্লাহ তাআলা বলেন: ​"তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।" — (সূরা আল-আনআম: ১৪১)

​যখন কোনো খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ, গালিগালাজ, মারামারি, সম্পর্কের অবনতি, সময় ও অর্থের অপচয় কিংবা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, তখন তা ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শের পরিপন্থী হয়ে যায়।

​রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: ​"মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।" — (সহিহ বুখারি)

​অতএব, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা বা অন্য কোনো দলকে সমর্থন করতে গিয়ে যদি মুসলমান মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, অপমান করে বা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়।

সামাজিক উন্মাদনা ও বাস্তবতা

​বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে এক ধরনের ব্যাপক উন্মাদনা লক্ষ্য করা যায়। কেউ ব্রাজিলের সমর্থক, কেউ আর্জেন্টিনার। কিন্তু একটি খেলাকে ঘিরে যখন মানুষের মধ্যে রাগ, ক্ষোভ, অভিমান, তর্ক-বিতর্ক, এমনকি সংঘর্ষ পর্যন্ত সৃষ্টি হয়, তখন বিষয়টি শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা সামাজিক ও নৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

​ইসলাম মানুষের বৈধ আনন্দ ও বিনোদনের বিরোধিতা করে না। কিন্তু ইসলাম প্রতিটি কাজকে বিবেক, সংযম ও দায়িত্ববোধের আলোকে বিচার করতে শিক্ষা দেয়। আজ আমরা দেখতে পাই, বিদেশি দলগুলোর সমর্থনে বিশাল বিশাল পতাকা তৈরি করা হচ্ছে, বিপুল অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, মিছিল ও শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সড়ক ও মহাসড়কে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়, যানজট সৃষ্টি হয় এবং জনগণের ভোগান্তি বাড়ে। একজন মুসলমানের আনন্দ কখনো অন্য মানুষের কষ্টের কারণ হতে পারে না।

জাতীয় বাস্তবতার আলোকে

​বাংলাদেশ বর্তমানে নানা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, পরিবেশ—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সচেতন হওয়ার পরিবর্তে যদি সমাজের একটি অংশ অতিরিক্তভাবে বিদেশি দলের জয়-পরাজয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে প্রশ্ন থাকতেই পারে—আমাদের অগ্রাধিকারের জায়গা কোথায়?

​একটি বিদেশি দেশের পতাকা কয়েকশ ফুট উঁচু করে ওড়ানো, লাখ লাখ টাকা ব্যয় করা কিংবা নিজের পরিচয়ের চেয়ে অন্য দেশের পরিচয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া—এগুলো অনেকের কাছে অস্বাভাবিক বলেই মনে হতে পারে। কারণ বাস্তবে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার জয়-পরাজয়ে বাংলাদেশের কোনো জাতীয় স্বার্থ জড়িত নয়।

​আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—এসব বাস্তব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি দলগুলোর জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে যে মাত্রার আবেগ ও অর্থব্যয় দেখা যায়, তা সচেতন মানুষকে ভাবিয়ে তোলে।

শরিয়তের বিধান ও সময়ের মূল্য

​এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি দিক রয়েছে। আধুনিক ফুটবলের অধিকাংশ খেলোয়াড় এমন পোশাক পরিধান করেন যা শরিয়তের দৃষ্টিতে সতর পূর্ণভাবে আবৃত করে না। পুরুষের সতর নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত—এ বিষয়ে অধিকাংশ ফকিহ একমত। ফলে খেলা চলাকালে খেলোয়াড়দের শরীরের যে অংশ উন্মুক্ত থাকে, তা দেখা থেকেও মুসলমানকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। একজন ব্যক্তি যখন দীর্ঘ সময় ধরে এসব খেলা দেখেন, তখন অনিচ্ছাকৃতভাবেই সতর দেখার বিষয়টি সামনে আসে।

​এর পাশাপাশি সময়ের ব্যবহারের প্রশ্নও রয়েছে। অনেক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা দেখা, আলোচনা করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক করা এবং দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সময় ব্যয় করেন। অথচ সেই সময়ের একটি অংশও যদি ইবাদত, জ্ঞানার্জন, পরিবার, সমাজ বা আত্মউন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হতো, তাহলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই বেশি উপকৃত হতো। ইসলামে সময়কে আল্লাহর একটি মহামূল্যবান নিয়ামত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যার হিসাব মানুষকে দিতে হবে।

জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা কতটুকু যৌক্তিক?

​কোনো দলের সমর্থনে আনন্দ মিছিল, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা বা মহাসড়ক অবরোধের কারণে যদি সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়, কর্মজীবী মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে বা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, তাহলে তা নাগরিক দায়িত্ববোধের পরিপন্থী।

ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো:

​"ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিদান হিসেবে ক্ষতিও করা যাবে না।" — (ইবনে মাজাহ) ​অর্থাৎ নিজের আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে অন্যের কষ্টের কারণ হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

​তবে এ কথাও সত্য যে, সব খেলা দেখা বা খেলাধুলার প্রতি আগ্রহকে এককথায় 'হারাম' বলা সঠিক নয়। শরিয়তের বিধান নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য এবং তার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য বিষয়ের ওপর। কিন্তু যখন কোনো খেলা মানুষের দায়িত্ববোধকে দুর্বল করে, ইবাদত থেকে গাফেল করে, অশোভন দৃশ্য দেখার কারণ হয়, অর্থ ও সময়ের অপচয় ঘটায় এবং সামাজিক বিভেদ সৃষ্টি করে, তখন একজন মুসলমানের উচিত বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা।

ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান

​খেলা উপভোগ করা যেতে পারে, ভালো খেলোয়াড়ের প্রশংসা করা যেতে পারে এবং বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগিও করা যেতে পারে। কিন্তু ​দলীয় সমর্থনকে অন্ধ আবেগে পরিণত করা, ​গালিগালাজ ও শত্রুতা সৃষ্টি করা,​অর্থের অপচয় করা, ​বিদেশি পতাকা নিয়ে অতিরঞ্জিত উন্মাদনা দেখানো, ​জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা, কিংবা ​সমাজের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ভুলে যাওয়া— ​এসব কোনো বিচক্ষণ, দায়িত্বশীল বা ইসলামসম্মত আচরণ নয়।

​ফুটবল একটি খেলা মাত্র। এটি কোনো আকিদা নয়, কোনো আদর্শ নয়, কোনো জাতীয় দায়িত্বও নয়। তাই একজন সচেতন মুসলমানের পরিচয় হবে—তিনি আবেগের চেয়ে বিবেককে, উন্মাদনার চেয়ে সংযমকে এবং ক্ষণস্থায়ী বিনোদনের চেয়ে আখিরাতের কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দেবেন।

​ফুটবল একটি খেলা; এটি মানুষের পরিচয়, মর্যাদা বা ঈমানের মাপকাঠি নয়। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা সমর্থন করা ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে, কিন্তু সেই পছন্দ যেন ভ্রাতৃত্ব নষ্ট না করে, অপচয় ও বিশৃঙ্খলা না হয় এবং দেশের বাস্তব সমস্যাগুলোর প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধকে আড়াল না করে। একজন সচেতন মুসলিম ও দায়িত্বশীল নাগরিকের পরিচয় হলো—তিনি আনন্দ করবেন, কিন্তু সীমা অতিক্রম করবেন না; ভালোবাসবেন, কিন্তু অন্ধ অনুসরণ করবেন না; এবং নিজের আবেগের চেয়ে সমাজের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেবেন।

লেখক: আলেম, শিক্ষক, গবেষক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন