ঝরে পড়া শৈশবের শেষ আশ্রয়
কওমি মাদরাসার বহুমাত্রিক অবদান
মুফতি কামরুল বিন আইয়ুব
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ১০:০৭
একটি দেশ কতটা কল্যাণমুখী, তা মাপা যায় সেই দেশের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষটি কেমন আছে তা দেখে। বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিকভাবে অনেক দূর এগিয়েছে, চারপাশের দৃশ্যমান উন্নতি আমাদের আশাবাদী করে তোলে। কিন্তু এই অগ্রগতির পিঠে একটা নির্মম সত্যও লুকিয়ে আছে—সম্পদের সুষম বণ্টন না হওয়া এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে সমাজের একটা বড় অংশ এখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। এই বঞ্চনার সবচেয়ে বড় শিকার এতিম, অনাথ ও দুস্থ শিশুরা।
রাষ্ট্র বা সমাজের মূলধারা যখন এই বিপুলসংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত শিশুর মুখে দু-বেলা অন্ন তুলে দিতে কিংবা তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে নীরবে-নিভৃতে এক অনন্য মানবিক দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে কওমি মাদরাসাগুলো। কওমি মাদরাসা আছে বলেই আজ দেশের লাখ লাখ এতিম ও দরিদ্র ছেলে-মেয়েরা শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে, খুঁজে পাচ্ছে বেঁচে থাকার এক নিরাপদ আশ্রয়।
আমাদের চারপাশের নাগরিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় কওমি মাদরাসাগুলোকে প্রায়ই কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু এর বাইরেও যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা বিশাল সামাজিক ও মানবিক অবদান রয়েছে, তা আমরা অনেকেই এড়িয়ে যাই। একটু গভীরভাবে খেয়াল করলেই দেখা যাবে, দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে শুরু করে শহরের ঘিঞ্জি অলিগলি—সবখানেই গড়ে ওঠা এই মাদরাসাগুলোর সিংহভাগ শিক্ষার্থীই আসে সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তর থেকে। যাদের বাবা-মা নেই, কিংবা থাকলেও চরম দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনার খরচ চালানো তো দূরের কথা, দু-বেলা ঠিকমতো খাবার জোটাতে পারে না, তাদের প্রথম এবং শেষ ভরসাস্থল এই কওমি মাদরাসা।
কওমি মাদরাসাগুলোর মূল প্রাণশক্তি হলো এর ‘লিল্লাহ বোর্ডিং’ বা ফ্রি আবাসন ও খাবার ব্যবস্থা। এখানে শুধু যে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া হয় তা নয়; বরং তাদের তিন বেলার খাবার, বাসস্থান, জামাকাপড়, চিকিৎসা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়া হয়। বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট এবং আমাদের দেশে লাগামহীন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে যেখানে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে কওমি মাদরাসাগুলো লাখ লাখ এতিম ও দরিদ্র শিশুর তিন বেলার খাবারের দায়িত্ব নিরবচ্ছিন্নভাবে ধরে রেখেছে। এটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি অলৌকিক সামাজিক সেবার চেয়ে কম কিছু নয়।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের জন্য কওমি মাদরাসাগুলো সরকারের কাছ থেকে কোনো প্রকার নিয়মিত বাজেট বা অনুদান গ্রহণ করে না। সম্পূর্ণ জনকল্যাণমূলক ও সেবামূলক মানসিকতা থেকে, কেবল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দান, সদকা ও জাকাতের তহবিলের ওপর ভর করে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যুগের পর যুগ টিকে রয়েছে। একে যদি আমরা একটি 'বেসরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী' বলি, তবে মোটেও বাড়িয়ে বলা হবে না। সরকারি এতিমখানাগুলোর ধারণক্ষমতা যেখানে খুবই সীমিত এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ভরা, সেখানে কওমি মাদরাসাগুলো প্রতিদিন লাখ লাখ শিশুর আশ্রয় দিচ্ছে কোনো রকম শর্ত ছাড়াই।
এবার একটু ভিন্নভাবে ভাবা যাক। কওমি মাদরাসাগুলো যদি আজ এই লাখ লাখ এতিম ও গরিব শিশুর দায়িত্ব না নিত, তবে সমাজ ও রাষ্ট্রের চিত্রটা কেমন হতো? এই বিশালসংখ্যক শিশু শিক্ষা ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হয়ে ফুটপাতে, রেললাইনে কিংবা বস্তিতে বড় হতো। ক্ষুধা ও বেঁচে থাকার তাগিদে তারা বাধ্য হতো ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে লিপ্ত হতে। আরও ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, এরা খুব সহজেই অন্ধকার জগতের চোরাকারবারি, মাদক ব্যবসায়ী ও পেশাদার অপরাধীদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো। বর্তমান যুগে কিশোর গ্যাংয়ের যে ভয়াবহ বিস্তার আমরা দেখছি, তা মূলত সঠিক দায়িত্ব বা অভিভাবকত্ব ও আশ্রয়ের অভাবেরই ফসল। রাষ্ট্রকে তখন এই বিশাল অপরাধপ্রবণতা সামাল দিতে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে বিপুল অর্থ ও শক্তি ব্যয় করতে হতো। কওমি মাদরাসাগুলো এই শিশুদের শুধু আশ্রয়ই দিচ্ছে না, বরং অপরাধের হাত থেকে বাঁচিয়ে তাদের সুনাগরিক, দেশপ্রেমিক ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে। ফলে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কওমি মাদরাসা এক নীরব ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
মাদরাসার শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা থাকতেই পারে, কিন্তু একটি সত্যকে কোনো বাস্তববাদী মানুষ অস্বীকার করতে পারবেন না—তা হলো এখানকার নৈতিক ও আত্মিক শিক্ষা। বর্তমান অবক্ষয়গ্রস্ত সমাজে যেখানে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে, বৃদ্ধ পিতা-মাতা বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় পাচ্ছেন এবং মানবিক মূল্যবোধ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে, সেখানে এই মাদরাসাগুলো শিক্ষার্থীদের শৈশব থেকেই শেখায় বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ, সততা এবং নিঃস্বার্থ মানবসেবা। এখান থেকে শিক্ষা শেষ করে হাজার হাজার তরুণ আজ সমাজের বোঝা না হয়ে দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হচ্ছে। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মসজিদে ইমামতি, মাদরাসায় শিক্ষকতা, ইসলামি প্রকাশনা এবং বিভিন্ন আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে যুক্ত হয়ে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক সংস্কারে অবদান রাখছে। তারা সমাজের বোঝা নয়, বরং সমাজ বিনির্মাণের একেকজন শৃঙ্খলাবদ্ধ কারিগর।
তাই কওমি মাদরাসাকে কেবল একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষালয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত রাষ্ট্র ও সমাজের এক বিশাল অবৈতনিক মানবিক অঙ্গ। জাতীয় বাজেটে এদের জন্য কোনো বরাদ্দ না থাকলেও, এদের সামাজিক অবদান জাতীয় প্রবৃদ্ধির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। শত বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের কাঁধ থেকে এক বিশাল সামাজিক দায়িত্বের বোঝা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে। সুতরাং, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সমাজ, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের আরও ইতিবাচক, বস্তুনিষ্ঠ ও সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রাখা প্রয়োজন। এতিম ও অসহায় শিশুদের মুখে হাসি ফুটিয়ে, তাদের অন্ধকার ভবিষ্যৎকে আলোয় আলোকিত করে কওমি মাদরাসাগুলো প্রতিনিয়ত যে মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করছে, তার ঋণ কোনো রাষ্ট্র বা সচেতন সমাজ কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে না।
লেখক: ইসলামী গবেষক ও লেখক; বিন্নাকুলী, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ।

