ঐতিহ্য ও সুনাগরিক গড়ার চর্চাকেন্দ্র
মাদরাসা শিক্ষা আমাদের গৌরবময় অতীতের এক অনন্য ঐতিহ্য। এটি মূলত ইসলামী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার প্রধান কেন্দ্র। এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এটি মানুষকে উদারতা ও শান্তিপ্রিয়তা শেখায় এবং সমাজকে উপহার দেয় সত্যিকারের দেশপ্রেমিক ও সুনাগরিক। মাদরাসা শিক্ষায় মূলত ‘দ্বীন’ বা ইসলাম শিক্ষা দেওয়া হয় এবং মানুষের মানবিক গুণের বিকাশ ঘটানো হয়। এককথায়, পৃথিবীতে যা কিছু কল্যাণকর, তা-ই শেখানো হয় মাদরাসায়।
১. পবিত্র কুরআন ও আরবী ভাষার বহুমুখী জ্ঞান
মাদরাসায় শেখানো হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও নির্ভুল গ্রন্থ আল-কুরআন। এখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কুরআনের বিশুদ্ধ তিলাওয়াত, অনুবাদ, ব্যাখ্যা এবং ‘উলূমুল কুরআন’ (কুরআন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞান) শিক্ষা দেওয়া হয়। পুরো কুরআন মুখস্থ করানোর মাধ্যমে এই মাদরাসাগুলো থেকেই প্রতিবছর তৈরি হচ্ছে বিশ্বমানের লাখ লাখ হাফেজে কুরআন। কওমী মাদরাসার আলোকিত ক্যাম্পাসগুলো সদা মুখরিত থাকে কুরআনের সুমধুর সুরে।
একজন মুসলিমকে আদর্শ মানুষ হতে হলে কুরআন শেখা আবশ্যক। মাদরাসা শিক্ষা সেই কুরআন শিখিয়েই সমাজে আদর্শ মানুষ উপহার দেয়। আর এই কুরআনকে গভীরভাবে বুঝতে হলে আরবী ভাষার নানামুখী জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এজন্য কওমী মাদরাসায় আরবী ব্যাকরণ ও সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা যেমন: নাহু, সরফ, বালাগাত, ইমলা ও আরুজ ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শেখানো হয়।
২. হাদীস শাস্ত্রের গভীর চর্চা ও এর বিশ্বায়ন
পৃথিবীর শুদ্ধতম বাণী হলো আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখনিঃসৃত বাণী, যা মূলত ‘ইলমে ওহী’রই আরেক রূপ। কুরআন সরাসরি আল্লাহর বাণী, আর হাদীসের ভাব ও বিষয়বস্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে হলেও এর ভাষা মহানবীর (সা.)। তিনি ছিলেন ‘আফসাহুল আরব’ অর্থাৎ আরবের বিশুদ্ধতম ভাষী; যিনি জীবনে কখনো কোনো অশুদ্ধ কথা বলেননি।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ ও মৌন সম্মতিকে হাদীস বলা হয়। কওমী মাদরাসায় এই হাদীস শাস্ত্রের পঠন-পাঠন চলে দিন-রাত। হাদীসের বিশুদ্ধতম কিতাব বুখারী শরীফ ও মুসলিম শরীফসহ ‘কুতুবে সিত্তা’র (প্রধান ছয়টি হাদীস গ্রন্থ) পুঙ্খানুপুঙ্খ দরস দেওয়া হয় এখানে। আধুনিক যুগে কওমী মাদরাসা ছাড়া এভাবে হাদীস পড়ানোর নজির পৃথিবীতে বিরল। যেখানেই এই পদ্ধতিতে হাদীসের দরস হয়, সেটিই মূলত কওমী মাদরাসার ধারা।
এখানে ‘কওম’ শব্দটি কোনো সংকীর্ণ অর্থে নয়, বরং ‘উম্মাহ’ বা জনসমষ্টির অর্থে ব্যবহৃত হয়। উপমহাদেশে যা দ্বীনি বা কওমী মাদরাসা, বিশ্বের অন্য দেশে তা হয়তো ভিন্ন নামে পরিচিত, তবে মূল আদর্শ একই। এখানে হাদীসের ‘রেওয়ায়াত’ (বর্ণনা সূত্র) ও ‘দেরায়াত’ (মর্মার্থ) এবং উলূমুল হাদীস বা হাদীস বিজ্ঞান শিক্ষা দেওয়া হয়। কুরআন-হাদীসের এই সুবিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার মুখস্থ করতে ও এর মর্ম অনুধাবন করতে প্রখর মেধা এবং জীবনব্যাপী সাধনার প্রয়োজন হয়। এটি সাধারণ অনার্স-মাস্টার্সের মতো কোনো সংক্ষিপ্ত কোর্স নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মেহনত। শত সীমাবদ্ধতার মাঝেও কওমী মাদরাসাগুলো ইলমী ও আমলী চর্চার মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। এমনকি তাবলীগ জামাতের কিতাবী তালীমের হালাকাগুলোও এই কওমী মাদরাসারই ইলমী বিশ্বায়নের এক একটি সুন্দর নমুনা।
৩. ইসলামী আইন বা ইলমে ফিকহের সমৃদ্ধি
কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই ইসলামের বিধিবদ্ধ আইন উৎসারিত হয়েছে। কওমী মাদরাসায় কুরআন-হাদীসের সূক্ষ্ম গবেষণালব্ধ মাসআলা-মাসাইল তথা ‘ইলমে ফিকহ’ বা ইসলামী আইনশাস্ত্র শেখানো হয়। একজন মানুষের মাতৃগর্ভ থেকে শুরু করে জন্ম, সমাজজীবন, মৃত্যু এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের যাবতীয় বিধিবিধানের নামই ইলমে ফিকহ। গভীর গবেষণার মাধ্যমে এই আইন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
কওমী মাদরাসায় ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে পাঠ দেওয়া হয়। শেখানো হয় ইসলামী আইনের ক্রমবিকাশের ইতিহাস। কওমী মাদরাসার ‘ইফতা’ বা ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বর্তমানে এই আইনগুলোর পূর্ণ প্রয়োগ না থাকলেও, কওমীর মেধাবী শিক্ষার্থীরা একটি ইসলামী রাষ্ট্রের যাবতীয় নীতিমালার পাশাপাশি ‘আদাবুল কাজা’ (বিচারিক নিয়মাবলী), ‘কিতাবুল খারাজ’ (রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থা) এবং ‘ইসলামী পারিবারিক আইন’ সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান লাভ করে।
ইসলামী আইন অনুযায়ী আধুনিক বিশ্ব পরিচালিত হলে পৃথিবী হবে শান্তি ও সুশাসনের এক অনন্য ঠিকানা। মানুষ ফিরে পাবে তার মৌলিক অধিকার, সমাজ হবে সন্ত্রাসমুক্ত। কওমী মাদরাসার চট বা চাটাইয়ে বসে শিক্ষার্থীরা বিশ্ব পরিচালনার এই বিজ্ঞানময় ও শাশ্বত থিওরিটিক্যাল আইনগুলোই শিখছে, যা মানুষের তৈরি যেকোনো আইনের চেয়ে বহুগুণ শ্রেষ্ঠ ও যুগোপযোগী। একজন মুফতি মূলত পশ্চিমা আইনের ‘বার অ্যাট ল’ ডিগ্রিধারীদের চেয়েও গভীর আইন বিশেষজ্ঞ।
৪. আধুনিক সমস্যা ও যুগোপযোগী গবেষণা
কুরআন ও সুন্নাহর মূল বাণী অপরিবর্তনীয় হলেও, যুগের ও স্থানের ভিন্নতায় ফিকহের প্রায়োগিক আইন পরিবর্তনযোগ্য (বিশেষ করে মুয়ামালাত বা লেনদেনের ক্ষেত্রে)। আধুনিক ব্যাংকিং সেক্টরসহ অর্থনীতির নানা শাখাকে ইসলামীকরণ করতে হলে নতুন গবেষণার প্রয়োজন হয় এবং বর্তমান যুগের ফকীহগণ প্রতিনিয়ত তা করছেন। ইসলামী অর্থনীতিতে এখন এমন অনেক আধুনিক গবেষণা যুক্ত হয়েছে যা প্রাচীন যুগের চেয়ে ভিন্ন।
তবে ইসলামের মূলনীতি ও চার মাযহাবের গবেষণার পদ্ধতি না জেনে যে কেউ চাইলেই এই আইন নিয়ে কথা বলতে পারেন না। এর জন্য আরবী ভাষা ও শরীআতের বিভিন্ন শাখায় গভীর পাণ্ডিত্য থাকা আবশ্যক। কওমী মাদরাসায় এই আধুনিক মাসআলার গবেষণাপদ্ধতিও (ইজতিহাদ) শেখানো হয়।
শিক্ষার পদ্ধতি বা কারিকুলাম নিয়ে সমালোচনা বা সংস্কারের কথা থাকতেই পারে, এবং তা মাদরাসার ভালো চাওয়া শুভাকাঙ্ক্ষীরাই বলবেন। আধুনিক সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও যেমন কথা আছে, কওমী মাদরাসার শিক্ষাপদ্ধতি নিয়েও কথা থাকবে এবং যুগের প্রয়োজনে তা আরও সমৃদ্ধ হবে।
কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহ ছাড়াও কওমী মাদরাসায় যুক্তিবিদ্যা (ইলমে মান্তেক), দর্শন (ফালসাফা) ও সমৃদ্ধ আরবী সাহিত্য (আদব) পড়ানো হয়। উপমহাদেশে কওমী শিক্ষার ঐতিহ্যগত মাধ্যম উর্দু বা ফার্সি হলেও, বর্তমানে ব্রিটেন, আমেরিকা বা আফ্রিকার কওমী মাদরাসাগুলোর শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি। সেখানকার আলেমরা ইংরেজিতেই ওয়াজ করেন, ফতোয়া দেন এবং খুতবা প্রদান করেন। বাংলাদেশেও এখন ইংলিশ মিডিয়াম কওমী মাদরাসা গড়ে উঠছে এবং নতুন প্রজন্ম এ নিয়ে কাজ করছে।
একইসাথে কওমী মাদরাসায় প্রমিত বাংলা ভাষার চর্চাও ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছে। কওমীর উলামায়ে কেরাম বর্তমানে হাজার হাজার মৌলিক ও অনূদিত বই লিখছেন। বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ার, বাড্ডার মাকতাবাতুল আযহার কিংবা যাত্রাবাড়ী মাদরাসা সংলগ্ন কিতাব মার্কেটগুলো কওমী মাদরাসার মাতৃভাষা চর্চার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুতরাং, "মাদরাসায় বাংলা শেখানো হয় না"—এই পুরোনো অপবাদের দিন শেষ হয়ে এসেছে।
৫. সামাজিক অবদান ও মিডিয়ার ভুল ধারণা
মিডিয়ায় যারা কাজ করেন, কওমী মাদরাসায় কী শেখানো হয় তা জানতে তাদের একটু সময় দেওয়া উচিত। দূর থেকে কাল্পনিক মন্তব্য না করে, কাছ থেকে দেখে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন করা প্রয়োজন। কোনো কওমী মাদরাসায় কখনোই জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাসবাদ শেখানো হয় না।
এ দেশের লাখ লাখ মসজিদের ইমাম ও খতীবদের দিকে তাকালেই বোঝা যায় মাদরাসায় কী শেখানো হয়। দেশের সাধারণ মসজিদ থেকে শুরু করে বঙ্গভবন বা সংসদ ভবন জামে মসজিদ এবং জাতীয় ঈদগাহের ইমাম ও খতীবদের সিংহভাগই কওমী মাদরাসার সৃষ্টি। কোনো সাধারণ কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সরকারি আলিয়া মাদরাসায় (যেখানে হিফজ বিভাগ নেই) এই বিপুল পরিমাণ হাফেজ, ইমাম ও খতীব তৈরি হয় না। দেশের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকের বিয়ে-শাদী, জানাজা ও ধর্মীয় যেকোনো প্রয়োজনে এই কওমীর সন্তানরাই পাশে থাকেন।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কখনো দাবি করে না যে তারা শিক্ষার্থীদের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানাচ্ছে। তবে তারা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের প্রয়োজনীয়তাকেও কখনো অস্বীকার করে না। কওমী মাদরাসার মূল কাজ হলো দ্বীনের ইলম চর্চা করা, যার মাধ্যমে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অস্তিত্ব টিকে থাকে।
৬. বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
কওমী মাদরাসা মূলত একটি ‘বিশেষায়িত’ (Specialized) ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় বুনিয়াদ রক্ষা করছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা ও অনুকূল পরিবেশ থাকলে তারা ভবিষ্যতে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারও উপহার দিতে পারবে, তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিশ্বমঞ্চে মুসলিমদের সঠিক ও সমন্বিত নেতৃত্ব না থাকায় আজ ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক সাধারণ শিক্ষা দুটি পৃথক ধারায় বিভক্ত হয়ে গেছে। যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে একজন ইমাম যেমন খতীব হবেন, তেমনি তিনি একইসাথে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারও হতে পারবেন। অতীতের মুসলিম শাসকরা নিজেরা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতেন এবং সন্তানদের সেখানে পড়াতেন। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্বীন ও দুনিয়াকে আলাদা করে দেখে।
শাসকদের এই ‘একচোখা নীতি’র কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় এই বিভাজন তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র যতদিন দ্বীন ও দুনিয়াকে এক চোখে না দেখবে, ততদিন ডিফেন্সিভ পজিশনে (আত্মরক্ষামূলক অবস্থানে) থেকে কওমী মাদরাসা যতটুকু দ্বীনি শিক্ষা দিচ্ছে, এর চেয়ে বেশি কিছু করা তাদের পক্ষে কঠিন।
কাজেই, "মাদরাসায় কেন ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হচ্ছে না"—এই প্রশ্নটি অবান্তর। বরং উল্টোভাবে এই প্রশ্নটি করা কি যুক্তিসঙ্গত নয় যে—একটি মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে মেডিকেল কলেজ, বুয়েট কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদগুলোতে কেন পবিত্র কুরআনের তরজমা, তাফসির বা ফিকহ শাস্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয় না?
তাই আমাদের এমন শাসনব্যবস্থা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব প্রয়োজন, যা স্কুল-কলেজে অন্তত ফরজে আইন (আবশ্যিক) দ্বীনি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করবে এবং একইসাথে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞানের মৌলিক ধারণা অর্জনের সুযোগ তৈরি করে দেবে।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

