Logo

ধর্ম

আল্লাহর বিধানকে কটূক্তি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১৯:২২

আল্লাহর বিধানকে কটূক্তি করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ

মানুষের জীবনে মতভেদ থাকবে, সমালোচনা থাকবে, রাজনৈতিক বিরোধও থাকবে; কিন্তু একজন মুসলমানের জন্য এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যা সমালোচনা বা তামাশার ঊর্ধ্বে। আল্লাহ তাআলার বিধান তেমনই একটি বিষয়। ইসলামের কোনো বিধানকে হালকাভাবে নেওয়া, তা নিয়ে হাসি-তামাশা করা কিংবা কটূক্তি করা শুধু নৈতিক অপরাধই নয়; বরং এটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও শাস্তিযোগ্য একটি গুনাহ। বিশেষ করে পর্দা, হিজাব বা বোরকার মতো সুস্পষ্ট ইসলামি বিধানকে বিদ্রূপ করা মুসলিম সমাজের জন্য উদ্বেগজনক বিষয়।

​পর্দা কোনো সংস্কৃতি নয়, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর আবির্ভাব নয়; এটি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— ​"আর মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং যা সাধারণত প্রকাশিত থাকে তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে; আর তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বুকের ওপর ফেলে রাখে।" [সূরা নূর: ৩১]

​অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন— ​"হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ ও মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের সহজে চেনা যাবে এবং তারা উত্ত্যক্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।" [সূরা আহযাব: ৫৯]

​এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, পর্দা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান। সুতরাং এটি নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা মানে শুধু একটি পোশাক বা সামাজিক রীতিকে নিয়ে উপহাস করা নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশকেই অবজ্ঞা করা।

​কুরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা এমন আচরণের ভয়াবহতা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বর্ণনা করেছেন। একদল লোক আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং দ্বীনের কিছু বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেছিল। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন— ​"তুমি বলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ এবং তাঁর রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা কোনো ওজর পেশ কোরো না, তোমরা ঈমান আনার পর আবার কুফরি করেছ।" [সূরা তাওবাহ: ৬৫-৬৬]

​এই আয়াতের তাফসিরে মুফাসসিরগণ লিখেছেন, দ্বীনের কোনো বিষয়কে উপহাস করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। কারণ, এটি মানুষের অন্তরে আল্লাহর বিধানের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে এবং সমাজে দ্বীনের প্রতি অবজ্ঞার পরিবেশ সৃষ্টি করে। বর্তমান সময়ে দেখা যায়, কেউ কেউ বোরকা বা হিজাব পরা নারী ও তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে, কেউ তাদের পশ্চাৎপদ বলে আখ্যায়িত করে।

​আবার কেউ পর্দাকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতিবন্ধক বলে উপস্থাপন করে। এমনকি কোনো কোনো রাজনৈতিক মঞ্চ বা জনসমাবেশে পর্দা নিয়ে কটূক্তি করা হয়। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।

​রাজনীতি নিয়ে সমালোচনা হতেই পারে। কোনো দলের নীতি, কর্মসূচি বা নেতার সমালোচনা করা মানুষের অধিকার; কিন্তু আল্লাহর বিধানকে রাজনৈতিক কৌতুকের উপাদান বানানো কিংবা জনসমক্ষে তা নিয়ে হাস্যরস করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, আল্লাহর হুকুম মানুষের ভোটে নির্ধারিত হয় না, এটি সর্বশক্তিমানের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চিরন্তন সত্য।

​একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো আল্লাহর বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। কেউ যদি কোনো বিধানের হিকমত বুঝতে নাও পারে, তাহলেও তার উচিত বিনয়ী থাকা এবং জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞাসা করা। কিন্তু না জেনে কিংবা জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে তা নিয়ে কটূক্তি করা নিজের ঈমানের জন্য এক মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

​পর্দা শুধু পোশাকের বিষয় নয়; এটি শালীনতা, আত্মমর্যাদা ও পবিত্রতার প্রতীক। ইসলাম নারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং তাকে সম্মান ও নিরাপত্তার আবরণ দিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, মুসলিম নারীরা পর্দা রক্ষা করেই জ্ঞানচর্চা করেছেন, সমাজ পরিচালনায় অবদান রেখেছেন এবং মানবতার সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাই পর্দাকে পশ্চাৎপদতার প্রতীক হিসেবে দেখানো ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।

​এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণীয়— কোনো ব্যক্তি পর্দা পালন না করলে তাকে সুন্দর ভাষায় উপদেশ দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু পর্দা পালনকারীকে উপহাস করা বা পর্দার বিধানকে বিদ্রূপ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি ব্যক্তিগত দুর্বলতা, আর দ্বিতীয়টি আল্লাহর বিধানের মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত।

​ইসলামি শরিয়তে সমাজের ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যে ব্যক্তি সমাজে আল্লাহর বিধানকে হেয় প্রতিপন্ন করে, সে শুধু নিজের ক্ষতিই করে না; বরং অন্যদের ঈমান ও ধর্মীয় অনুভূতিতেও আঘাত করে। তাই এ ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদেরও বিরত রাখা প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।

​তবে প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও উত্তম আচরণ। কোনো কটূক্তির জবাবে বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়; বরং যুক্তি, শালীন ভাষা ও আইনি উপায়ে প্রতিবাদ করা উচিত। কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়— ​"তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে।" [সূরা নাহল: ১২৫]

​অতএব, পর্দা যেহেতু আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ, তাই এটি নিয়ে কটূক্তি বা বিদ্রূপ করার কোনো সুযোগ নেই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কখনোই মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আল্লাহর বিধানকে অপমান করার স্বাধীনতা হতে পারে না। মুসলিম সমাজের উচিত আল্লাহর নির্দেশনার মর্যাদা রক্ষা করা, পর্দার সৌন্দর্য ও উপকারিতা মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং যারা এ বিষয়ে অবমাননাকর বক্তব্য দেয়, তাদের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ, নৈতিক ও আইনসম্মতভাবে প্রতিবাদ জানানো।

​আল্লাহর বিধান মানুষের কল্যাণের জন্যই প্রণীত। যে ব্যক্তি এই বিধানের মর্যাদা রক্ষা করে, আল্লাহ তাকে মর্যাদাবান করেন। আর যে ব্যক্তি তা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে, সে নিজেকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই আমাদের সবার উচিত— আল্লাহর প্রতিটি বিধানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা, তার ওপর আমল করা এবং কোনো অবস্থাতেই তা নিয়ে তামাশা বা কটূক্তি না করা।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন