Logo

ধর্ম

বিদায় ১৪৪৭, স্বাগতম ১৪৪৮

হিজরি বর্ষের শিক্ষা ও মুমিনের অঙ্গীকার

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১৯:৩৭

হিজরি বর্ষের শিক্ষা ও মুমিনের অঙ্গীকার

আলহামদুলিল্লাহ! সময়ের অমোঘ নিয়মে বিদায় নিয়েছে ১৪৪৭ হিজরি এবং মুসলিম উম্মাহ প্রবেশ করেছে নতুন বছর ১৪৪৮ হিজরিতে। বাংলাদেশে ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে ১৪৪৮ হিজরি সনের সূচনা হয়েছে। একইভাবে ১০ মহররম ১৪৪৮ হিজরি তথা পবিত্র আশুরা পালিত হবে ২৬ জুন ২০২৬। নতুন হিজরি বছরের আগমন কেবল একটি নতুন বর্ষপঞ্জির সূচনা নয়; বরং এটি আত্মসমালোচনা, তাওবা, তাকওয়া এবং নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

একটি বছর চলে যাওয়া মানে আমাদের জীবন থেকে আরও একটি বছর কমে যাওয়া। তাই হিজরি নববর্ষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। একজন মুমিনের জন্য নতুন বছর হওয়া উচিত আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নতুন অঙ্গীকারের সময়।

হিজরি সনের ইতিহাস

হিজরি সনের সূচনা ইসলামের ইতিহাসের এক মহান ঘটনার সঙ্গে জড়িত। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন, তখন ইসলামের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এই হিজরত ছিল কেবল স্থান পরিবর্তন নয়; বরং সত্য, ন্যায় ও আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য এক ঐতিহাসিক সংগ্রাম।

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর শাসনামলে প্রশাসনিক প্রয়োজনের কারণে একটি ইসলামী বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে রাসুল (সা.)-এর জন্ম, নবুয়ত বা ওফাতের বছরকে ভিত্তি না করে হিজরতের ঘটনাকে ইসলামী সনের সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সেই থেকে ইসলামী বর্ষপঞ্জি “হিজরি সন” নামে পরিচিত।

হিজরতের শিক্ষা

হিজরতের ঘটনা মুসলমানদের জন্য বহুমাত্রিক শিক্ষা বহন করে। এর মাধ্যমে আমরা শিখি—

* আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।

* সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য কষ্ট ও বাধাকে ভয় করা যাবে না।

* পরিকল্পনা, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের সমন্বয়ই সফলতার চাবিকাঠি।

* ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্যের গুরুত্ব অপরিসীম।

* আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে কঠিন পরিস্থিতিও সহজ হয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন,যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে বহু আশ্রয়স্থল ও প্রাচুর্য লাভ করবে।” (সুরা আন-নিসা: ১০০)

সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে ইসলামের শিক্ষা

ইসলাম সময়কে অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করেছে। আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করে বলেন—সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।” (সুরা আল-আসর: ১-২) এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সময়ের সঠিক ব্যবহারই সফলতার মূল চাবিকাঠি। একটি হিজরি বছর শেষ হওয়া মানে আমাদের জীবনের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হওয়া। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করা একজন মুমিনের দায়িত্ব।

কুরআনের আলোকে বারো মাস

আল্লাহ তাআলা বলেন—নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি; যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকেই তা নির্ধারিত।” (সুরা আত-তাওবা: ৩৬) এ আয়াত প্রমাণ করে যে, বারো মাসের ব্যবস্থা আল্লাহর নির্ধারিত। ইসলামী ক্যালেন্ডারের প্রতিটি মাসের রয়েছে নিজস্ব তাৎপর্য ও শিক্ষা।

চারটি সম্মানিত মাস

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—বারো মাসের মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত—জিলকদ, জিলহজ, মহররম এবং রজব।” (সহিহ বুখারি: ৩১৯৭, সহিহ মুসলিম: ১৬৭৯) এই মাসগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

হিজরি বছরের বারো মাসের তাৎপর্য

১. মহররম: হিজরি বছরের প্রথম মাস এবং সম্মানিত চার মাসের অন্যতম। রাসুল (সা.) বলেছেন—রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬৩)

আশুরার রোজা সম্পর্কে তিনি বলেন—আমি আশা করি, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

২. সফর: জাহেলি যুগে এ মাসকে অশুভ মনে করা হতো। ইসলাম এ কুসংস্কার দূর করেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন— “সফর মাস অশুভ নয়।” (সহিহ বুখারি: ৫৭৫৭)

৩. রবিউল আউয়াল: এ মাসে মহানবী (সা.)-এর জন্ম ও হিজরতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় এই মাস।

৪. রবিউস সানি: ইলম, দাওয়াত ও আত্মশুদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার শিক্ষা দেয়।

৫. জমাদিউল উলা: আল্লাহর আনুগত্য ও নেক আমলে অবিচল থাকার মাস।

৬. জমাদিউস সানি: আত্মসমালোচনা, জ্ঞান অর্জন ও আখিরাতমুখী জীবন গঠনের অনুপ্রেরণা দেয়।

৭. রজব: সম্মানিত চার মাসের একটি। গুনাহ থেকে বিরত থাকা ও ইবাদতে মনোযোগী হওয়ার মাস।

৮. শাবান: রমজানের প্রস্তুতির মাস। রাসুল (সা.) এ মাসে অধিক নফল রোজা রাখতেন।

তিনি বলেছেন—এ মাসে মানুষের আমল আল্লাহর নিকট উত্থাপন করা হয়; তাই আমি চাই আমার আমল রোজাদার অবস্থায় উত্থাপিত হোক।” (সুনান নাসাঈ: ২৩৫৭)

৯. রমজান: কুরআন নাজিলের মাস এবং বছরের শ্রেষ্ঠ মাস। আল্লাহ বলেন—রমজান মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে।” (সুরা আল-বাকারা: ১৮৫) রাসুল (সা.) বলেছেন—যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।” (সহিহ বুখারি: ৩৮)

১০. শাওয়াল: শাওয়ালের ছয়টি রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন—যে ব্যক্তি রমজানের রোজা পালন করে এবং পরবর্তীতে শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)

১১. জিলকদ: সম্মানিত চার মাসের একটি। আত্মসংযম, শান্তি ও ইবাদতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

১২. জিলহজ: হজের মাস এবং বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। রাসুল (সা.) বলেছেন—জিলহজের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো দিনের আমল নেই।” (সহিহ বুখারি: ৯৬৯) আরাফার রোজা সম্পর্কে তিনি বলেন—আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়।” (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)

মুসলিম পরিচয়ের অংশ হিসেবে হিজরি সন

হিজরি বর্ষপঞ্জি মুসলিম জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোজা, হজ, যাকাত, ঈদ, আশুরা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হিজরি মাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাই মুসলমানদের উচিত ইসলামী মাস ও তারিখ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং দৈনন্দিন জীবনে হিজরি তারিখ ব্যবহারে উৎসাহিত হওয়া।

নতুন বছরে আত্মসমালোচনা

হিজরি নববর্ষ আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; বরং আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সময়। গত এক বছরে আমরা কী অর্জন করেছি, কতটুকু আল্লাহর আনুগত্য করতে পেরেছি, কোথায় ভুল করেছি—সেগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

হযরত উমর (রা.) বলেছেন—তোমরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ করো, তোমাদের হিসাব গ্রহণের আগে।

১৪৪৮ হিজরিতে আমাদের অঙ্গীকার

নতুন বছর উপলক্ষে প্রত্যেক মুসলমানের কিছু বাস্তব অঙ্গীকার গ্রহণ করা উচিত—

* পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করা।

* প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করা।

* তাওবা ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা।

* মিথ্যা, গীবত ও হিংসা থেকে বিরত থাকা।

* পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনের হক আদায় করা।

* অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

* সমাজ ও পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।

* মানবকল্যাণমূলক কাজে অংশগ্রহণ করা।

* ইসলামী জ্ঞান অর্জনে সময় ব্যয় করা।

* সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধে গড়ে তোলা।

পরিশেষে বলা যায়, ১৪৪৭ হিজরির বিদায় আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে। আর ১৪৪৮ হিজরির শুভাগমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনা ও নতুন দায়িত্ব নিয়ে এসেছে। এই নতুন বছরকে আমরা যদি তাওবা, তাকওয়া, ইবাদত, মানবসেবা এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে শুরু করতে পারি, তবে তা হবে প্রকৃত অর্থেই সফলতার পথচলা।

আসুন, আমরা নতুন হিজরিকে কেবল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন হিসেবে না দেখে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার, আমল সংশোধনের এবং আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের এক নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের ১৪৪৮ হিজরিকে ঈমান, আমল, ইলম, সুস্বাস্থ্য, শান্তি, কল্যাণ ও বরকতময় বছর হিসেবে কবুল করুন। আমিন।

লেখক : কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন