Logo

ধর্ম

আমাদের সবকিছুই একমাত্র আল্লাহর জন্য

Icon

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৫:৪৬

আমাদের সবকিছুই একমাত্র আল্লাহর জন্য

মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত ও আনুগত্য করার জন্য। ইসলামে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ হলো ঈমানের মূল ভিত্তি। একজন মুমিনের জীবনের প্রতিটি কাজ, ইবাদত এবং উদ্দেশ্য হতে হবে একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টির জন্য।

এই চিরন্তন সত্যটি ঘোষণা করে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফে ইরশাদ হয়েছে: "আপনি বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত (নামাজ), আমার কোরবানি (উৎসর্গ), আমার জীবন ও আমার মরণ একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। তাঁর কোনো শরিক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে এবং আমিই প্রথম আত্মসমর্পণকারী।" (সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২-১৬৩)

​এই মহান আয়াতের নির্দেশনা কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত আগত প্রতিটি মুসলিমের জন্য এটি একটি অলঙ্ঘনীয় বিধান। আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আয়াতে ‘সালাত’ বলতে সব ধরনের শারীরিক ইবাদত ও দোয়া-দুরুদকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘নুসুক’ তথা কোরবানি বলতে আল্লাহর উদ্দেশ্যে যেকোনো উৎসর্গ, মানত, জবেহ বা সদকাকে নির্দেশ করা হয়েছে। একইভাবে আমাদের জীবন ও মরণ, অর্থাৎ ইহকালীন সকল কর্মকাণ্ড ও পরকালীন প্রাপ্তির আশা সবকিছুই সমর্পণ করতে হবে সেই মহান সত্তার চরণে।

অতএব, এই আয়াতের অমোঘ বিধানের পর একজন মুসলিমের জীবনে দ্বিচারিতার কোনো সুযোগ থাকে না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ আমাদের সমাজে অনেকে মুখে ইসলামের কথা বললেও কাজে তার বিপরীত আচরণ করছেন। সম্পদের মোহে পড়ে অনেকে ফরজ বিধান জাকাত আদায়ে কার্পণ্য করছেন, আল্লাহর রাস্তায় ত্যাগ স্বীকারে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন, কিংবা ভোগ-বিলাস ও অনৈতিক প্রমোদ-প্রমোদে লিপ্ত হয়ে জীবন পার করছেন।

​এর চেয়েও বড় বিচ্যুতি দেখা যায় আকিদাগত ক্ষেত্রে। বর্তমান বাংলাদেশে ধর্মের নামে একশ্রেণীর ভণ্ড পীর ও মাজার পূজারীদের আধিপত্য আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এরা সরলমনা মানুষদের অন্ধ আবেগকে পুঁজি করে এক বিশাল বিভ্রান্তির জাল বিছিয়ে রেখেছে।

কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট আলো পরিহার করে এই সব ভণ্ডদের মুরিদেরা পীর বা মাজারের নামে নানাবিধ শিরকি ও কুফরি স্লোগান দিচ্ছে, যা সরাসরি ঈমান ধ্বংসকারী। তারা আল্লাহর ইবাদত বাদ দিয়ে মাজারে শায়িত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে সিজদা করছে, মানত করছে এবং ফরিয়াদ জানাচ্ছে। অথচ ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও উদ্দেশ্যে ইবাদত, সিজদা বা মানত করা স্পষ্ট শিরক, যা মার অযোগ্য অপরাধ। অনেকে পীর ধরার অন্ধ মোহে পড়ে ইসলামের মৌলিক হুকুম-আহকাম ও পারিবারিক দায়িত্ব ভুলে যাচ্ছেন। ঘরের বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অবহেলা ও ভরণপোষণ না করে পীরের দরবারে গিয়ে অর্থ-সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া কিংবা পীরের পা টেপাকে পুণ্য মনে করা চরম অজ্ঞতা ও ধর্মের বিকৃতি।

​হাদিস শরীফে পিতা-মাতার সেবা করাকে সর্বোত্তম জিহাদ ও জান্নাত লাভের মাধ্যম বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে তাঁর পিতা-মাতার সেবা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে এসে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলেন, তখন রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার পিতামাতা জীবিত আছে কি?’ সে ব্যক্তি বলল, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, ‘তুমি তাঁদের জন্য (সেবায় সব সময় রত থাকার) জিহাদ করো।’ (সুনানে নাসায়ি-৩১০৭)। অথচ ধর্মের নামে আজ এই পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্বগুলো পদদলিত হচ্ছে।

​অনেকে পীরদের অলৌকিক কারামত বা কথিত ভেলকিবাজির শিকার হয়ে তাঁদের অন্ধ অনুকরণ করছেন। এমনকি কিছু কিছু চরম বিভ্রান্ত দল নিজেদের পীরকে ‘নবী’ বা সমকক্ষ (নাউযুবিল্লাহ) দাবি করার মতো ধৃষ্টতাও দেখাচ্ছে, যা ইসলামের ‘খতমে নবুয়ত’ বা শেষ নবী বিশ্বাসের পরিপন্থী এবং সরাসরি কুফরি। ইসলামে একজন সৎ, যোগ্য ও সুন্নাহর অনুসারী হক্কানি আলেমের কাছ থেকে দ্বীন শেখা বা দিকনির্দেশনা নেওয়া প্রশংসনীয়, কিন্তু কোনো পীর বা ব্যক্তিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা কিংবা তাঁকে নিষ্পাপ মনে করা শরিয়তসম্মত নয়। কোনো আলেম বা পীরই ইসলামের মৌলিক বিধানের ঊর্ধ্বে নন।

​পবিত্র কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী, আমাদের জীবনের সকল মানত, দোয়া, ইবাদত এবং জান-মালের কোরবানি হতে হবে একমাত্র এক আল্লাহর জন্য, কোনো পীর, ব্যক্তি বা মাজারের নামে নয়। আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। আসুন, সামাজিকভাবে আমরা এই সমস্ত ধর্মীয় ভণ্ডামি, মাজার ব্যবসা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলি। নিজের এবং সমাজ ও পরিবারের সবার ঈমান সুরক্ষায় কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দিই। আমাদের ইবাদত, জীবন ও মরণ হোক একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে। আল্লাহ তাআলা আমাদের এই প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং সঠিক পথের ওপর অবিচল রাখুন। আমিন।


লেখক: প্রাবন্ধিক; ​সালনা বাজার, জয়দেবপুর, গাজীপুর। ​ইমেইল: jony90siddique@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন