১৪৪৮ হিজরি নববর্ষের প্রথম জুমা
রহমত, মাগফিরাত ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:১৫
আজ শুক্রবার। নতুন হিজরি বছরের প্রথম মাস মহররমের প্রথম জুমা। ১৯ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ এবং ৩ মহররম ১৪৪৮ হিজরি। নতুন বছরের সূচনালগ্নে আগত এই জুমা মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ। এটি শুধু একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; বরং আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি, তাওবা, তাকওয়া, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ।
মানুষের জীবনে সময় সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে মানুষের ক্ষতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। একটি বছর বিদায় নেওয়া মানে আমাদের জীবন থেকে আরও একটি বছর কমে যাওয়া এবং আখিরাতের যাত্রাপথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। তাই নতুন হিজরি বছর আমাদের সামনে আত্মসমালোচনার এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়—গত বছরের আমল পর্যালোচনা, ভুলত্রুটির জন্য তাওবা এবং নতুন উদ্যমে আল্লাহর পথে ফিরে আসার সুযোগ।
হিজরি সনের সূচনা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
ইসলামি ইতিহাসে হিজরি সনের সূচনা হয়েছে মানবজাতির ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনার স্মৃতিকে কেন্দ্র করে। মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত ছিল শুধু স্থান পরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা, ঈমানের স্বাধীনতা, ত্যাগ, ধৈর্য ও ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সূচনা।
খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলে সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শক্রমে এই ঐতিহাসিক হিজরতকে ভিত্তি করে ইসলামী বর্ষপঞ্জি বা হিজরি সনের প্রচলন করা হয়। সেই থেকে মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম।
রমজান, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, হজ, যাকাত, ইদ্দত এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও বিধান হিজরি মাসের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমান, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম, হিজরি সন ও আরবি মাসগুলোর গুরুত্ব সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখে না। তাই নতুন হিজরি বছর আমাদের ইসলামী ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে নতুনভাবে জানারও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
মহররম: আল্লাহর সম্মানিত মাস
হিজরি বছরের প্রথম মাস হলো মহররম। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত (হারাম) মাসের অন্যতম। অন্য তিনটি হলো জিলকদ, জিলহজ ও রজব।
মহান আল্লাহ বলেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত।" (সূরা তাওবা: ৩৬)
হারাম মাসগুলোর মর্যাদা ইসলাম বিশেষভাবে ঘোষণা করেছে। এ মাসগুলোতে অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও পাপাচার থেকে অধিক সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এসব মাসে নেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহের ভয়াবহতাও অধিক গুরুতর বিবেচিত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মহররমকে বিশেষভাবে "শাহরুল্লাহ" বা "আল্লাহর মাস" বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন: "রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।" (সহিহ মুসলিম: ১১hex/১১৬৩)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে রমজানের পর নফল রোজার ক্ষেত্রে মহররম মাসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
আশুরা: ইতিহাস, শিক্ষা ও ফজিলত
মহররম মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন হলো ১০ মহররম, যা ‘ইয়াওমে আশুরা’ নামে পরিচিত। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এই দিনে মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে সাগরে নিমজ্জিত করেছিলেন। আল্লাহর এই মহান অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মুসা (আ.) রোজা পালন করেন।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় এসে ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখলেন। কারণ জানতে চাইলে তারা বলল: "এটি এমন একটি দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে বিজয় দান করেছিলেন।"
তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:"মুসার অনুসরণের ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।" (সহিহ বুখারি: ২০০৪; সহিহ মুসলিম: ১১৩০)
এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে তা পালনের নির্দেশ দেন।
আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে তিনি আরও বলেন:"আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)
তবে ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়াতে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুই দিন রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।
কারবালার শিক্ষা ও মুসলিম ঐক্যের বার্তা
মহররম মাসের সঙ্গে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাও জড়িয়ে আছে। ৬১ হিজরিতে এই মাসেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে শাহাদাত বরণ করেন।
কারবালার ঘটনা মুসলিম উম্মাহকে সত্যের জন্য ত্যাগ, ধৈর্য, সাহস ও আদর্শিক varsity/দৃঢ়তার শিক্ষা দেয়। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শরিয়তবিরোধী শোকানুষ্ঠান, আত্মনির্যাতন বা কুসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড ইসলামে অনুমোদিত নয়। বরং এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ, ন্যায় ও সত্যের পথে অবিচল থাকা এবং মুসলিম ঐক্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত আমাদের দায়িত্ব।
মহররম মাসে করণীয়
১. আন্তরিক তাওবা ও ইস্তিগফার করা।
২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাসময়ে আদায় করা।
৩. কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা।
৪. তাহাজ্জুদ ও অন্যান্য নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
৫. মহররম মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা।
৬. আশুরার রোজা গুরুত্বসহকারে পালন করা।
৭. জিকির, দরুদ ও দোয়ার আমল বৃদ্ধি করা।
৮. দান-সদকা ও মানবসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ করা।
৯. আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়া।
১০. সন্তানদের ইসলামের ইতিহাস ও হিজরি সনের গুরুত্ব শেখানো।
১১. নিজের চরিত্র, আচার-আচরণ ও আমল সংশোধনের চেষ্টা করা।
১২. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে নতুন বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
মহররম মাসে বর্জনীয়
১. সকল প্রকার গুনাহ ও পাপাচার।
২. জুলুম, অন্যায় ও অবিচার।
৩. বিদআত ও কুসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ড।
৪. আশুরাকে কেন্দ্র করে শরিয়তবিরোধী অনুষ্ঠান।
৫. আত্মনির্যাতন ও শোকের নামে অতিরঞ্জিত আচরণ।
৬. হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভেদ সৃষ্টি।
৭. মিথ্যা, প্রতারণা, ঘুষ ও সুদভিত্তিক লেনদেন।
৮. হারাম মাসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে এমন সব কর্মকাণ্ড।
আত্মশুদ্ধি ও নবজাগরণের আহ্বান
মহররম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মাস এবং প্রতিটি বছর আমাদের মৃত্যুর আরও নিকটবর্তী করে। তাই নতুন বছরের সূচনা হওয়া উচিত আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও আল্লাহমুখী জীবনের নতুন অঙ্গীকারের মাধ্যমে।
আজ মুসলিম উম্মাহ নানামুখী সংকট, বিভক্তি, নৈতিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় মহররমের শিক্ষা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—আমরা কতটুকু কুরআন ও সুন্নাহর পথে আছি, কতটুকু ইসলামের আদর্শ অনুসরণ করছি এবং কতটুকু মানবতার কল্যাণে কাজ করছি।
নতুন হিজরি বছরের প্রথম জুমা আমাদের জন্য হোক আত্মবিশ্লেষণের দিন, গুনাহ থেকে ফিরে আসার দিন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দৃঢ় অঙ্গীকারের দিন।
আসুন, আমরা হিজরি নববর্ষকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া ও নেক আমলের নতুন অভিযাত্রা হিসেবে গ্রহণ করি। মহররমের মর্যাদা রক্ষা করি, আশুরার রোজা পালন করি, কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন গড়ে তুলি এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে ইসলামের সৌন্দর্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখি।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহররম মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করার, আশুরার ফজিলত অর্জন করার, বেশি বেশি নেক আমল করার এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: তরুণ আলেম ও কলামিস্ট; প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার।

