Logo

ধর্ম

মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ও কীর্তি

Icon

যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১১:৪৮

মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ও কীর্তি

আজকের দুনিয়ার মুসলিম প্রজন্ম একটি বিষয় নিয়ে খুব হীনম্মন্যতায় ভোগে। তাদের অন্তরে প্রশ্ন জাগে, মুসলমানদের মেধা শক্তি এত দুর্বল কেন যে, তারা কিছুই আবিষ্কার করতে পারে না? তারা মনে করে, পৃথিবীর সকল বিজ্ঞানীই অমুসলিম। তাদের আবিষ্কৃত বিভিন্ন এর মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষদের কত কল্যাণ সাধিত হচ্ছে। কিন্তু মুসলমানরা শুধু বসে বসে সেসব কল্যাণ ভোগ করছে। অথচ বাস্তবতা হলো এই যে, আজকের জ্ঞান-বিজ্ঞান সাফল্যের যে বিশাল উচ্চতায় পৌঁছতে পেরেছে, এর পেছনে বৃহত্তর মুসলিম সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

কিন্তু এ সকল মহান মুসলিম বিজ্ঞানীগণ কেন অপরিচিত? কেন বলা হয় যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে উজ্জ্বল তারকা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মেধা মুসলমানদের নেই? এর বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো—

​ক. সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মুসলিম মহা-মনীষী ও বিজ্ঞানীদের পরিচয়, অবদান ও কীর্তি গোপন করার ঘৃণ্য প্রচেষ্টা।

​খ. মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান ও আবিষ্কার বিষয়ক ইতিহাস কৌশলে পাঠ্য-পুস্তক থেকে সরিয়ে দেওয়া।

​গ. এর পরিবর্তে অমুসলিম বিজ্ঞানীদের কীর্তি ও উদ্ভাবনের বৃত্তান্ত পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা।

​ঘ. নির্ভরযোগ্য সঠিক ইসলামিক ইতিহাস গ্রন্থ থেকে মুসলিম মহা-মনীষী ও বিজ্ঞানীদের পরিচয় ও কীর্তি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন না করা।

​ঙ. মুসলিম বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব ঢেকে রাখার জন্য গভীর ষড়যন্ত্রের জাল বিছিয়ে তাদের আসল নাম বিকৃত করা ইত্যাদি।

​জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আবিষ্কারের জগতে আলবার্ট আইনস্টাইন, আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল, স্যার আইজ্যাক নিউটন, গ্যালিলিও গ্যালিলিই, নিকোলা টেসলা, মেরি কুরি, স্টিফেন হকিং-এর নাম ইতিহাসের পাতায় অম্লান। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণ প্রজন্ম তাদের খুব ভালোভাবে চেনে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, তারা চেনে না জাবের ইবনে হাইয়ান, ইবনে সিনা, আল ফারাবি, আবুল কাসিম জাহরাভি, আল কিন্দি, আল রাজি, মূসা আল খারেজমিকে; যাদের জ্ঞান ও আবিষ্কার একসময় পৃথিবীর ইতিহাসে সমুজ্জ্বল কিরণ ছড়িয়েছিল। যাদের রচনাবলী একসময় ইউরোপের বড় বড় নামী ইউনিভার্সিটির মূল পাঠ্য ছিল। আব্বাসীয় খিলাফতকালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র ছিল বাগদাদ। এখানে খলিফা আল মামুন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাইতুল হিকমাহ বা জ্ঞান-গৃহ। বাইতুল হিকমাহর অধীনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বৈদেশিক গ্রন্থ আরবিতে অনূদিত হতো। হিজরি তৃতীয় শতাব্দী থেকে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত সময়টিতে মুসলিমগণ বিভিন্ন দেশের প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণ করে সেগুলোর ওপর গবেষণামূলক পর্যালোচনা শুরু করে এবং হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে তারা আবিষ্কার কার্য আরম্ভ করেন। তাদের মাধ্যমেই আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হয়।

​নিচে কয়েকজন মুসলিম জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার ও কীর্তি তুলে ধরা হলো—

​ক. জাবের ইবনে হাইয়ান

​তিনি ছিলেন রসায়ন শাস্ত্রের জনক। তিনিই পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কেমিস্ট্রির মৌলিক প্রক্রিয়াগুলো চর্চা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। দর্শন, জ্যোতির্বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসা, জ্যামিতি ইত্যাদি বিষয়েও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার, যেগুলোর মধ্যে পাঁচশ গ্রন্থ ছিল চিকিৎসা বিষয়ে। ইংরেজ সাইন্টিস্ট হোলমার্ডের মতে, প্রায় তিনশ বছর ধরে ইউরোপীয় আলকেমি জাবের ইবনে হাইয়ানের প্রবর্তিত পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে বিস্তৃত হয়েছে।

​খ. ইবনে সিনা

​আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ক্লিনিক্যাল ফার্মাকোলজির জনক ছিলেন ইবনে সিনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ হচ্ছে ‘আল কানুন ফিত তিব’। পাঁচ খণ্ডে বিভক্ত মূল্যবান এই গ্রন্থটির ল্যাটিন অনুবাদ একসময় ইউরোপের বহু ইউনিভার্সিটি ও মেডিকেল ইনস্টিটিউশনে পাঠ্যবই হিসেবে পড়ানো হতো। ‘আল কানুন ফিত তিব’ ছাড়াও তিনি আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন।

​গ. আল ফারাবি

​বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ছিলেন আল ফারাবি। রাষ্ট্র ও সমাজ দর্শনে তাঁর বিশাল অবদান রয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানে তাঁর অবদান ও কীর্তি অনস্বীকার্য। তাছাড়া তিনি ছিলেন বহুভাষাবিদ পণ্ডিত। সত্তরটি ভাষায় আল ফারাবি অবলীলায় কথা বলতে পারতেন।

​ঘ. আবুল কাসিম জাহরাভি

​আবুল কাসিম জাহরাভি ছিলেন আধুনিক সার্জারিবিদ্যার পথিকৃৎ। ইতিহাসবিদ ডোনাল্ড ক্যাম্পবেলের মতে, আবুল কাসিম জাহরাভির চিকিৎসা এত বেশি উন্নত ছিল যে, ইউরোপীয়ানরা অন্ধ মানুষের মতো তাঁকে অনুসরণ করত। ইউরোপে তাঁর দেখানো পথেই আধুনিক সার্জারির উৎকর্ষ সাধিত হয়। তিনি ছিলেন কাটাছেঁড়া ব্যতীত মূত্রথলির পাথর অপসারণ যন্ত্র ‘মিশআব’-এর প্রথম আবিষ্কারক। আবুল কাসিম জাহরাভি ত্রিশ খণ্ডের একটি বিশাল গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন, যা কিতাবুত তাসরিফ নামে পরিচিত। এই গ্রন্থে তিনি দুই শতাধিক অস্ত্রোপচারের বর্ণনা দিয়েছেন। গ্রন্থটিতে সার্জারি, প্যাথলজি, ফার্মাকোলজি, অর্থোপেডিকস, মেডিসিন, অফথালমোলজি, দন্তবিজ্ঞান-সহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

ঙ. আল কিন্দি

​বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আল কিন্দি। চিকিৎসা বিজ্ঞান, গণিতশাস্ত্র, ক্রিপ্টোগ্রাফি ও রসায়নে তাঁর অগাধ ভূমিকা রয়েছে। তাছাড়া তিনি ছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, সংগীতবিশারদ ও বিখ্যাত দার্শনিক। ইবনে আল নাদিমের মতে, বিভিন্ন বিষয়ে আল কিন্দি দুইশত চল্লিশটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গণিত ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের জ্ঞানের সাহায্যে তিনি ওষুধের কার্যকারিতা পরিমাপক যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন।

​চ. আল রাজি

​সর্বপ্রথম সালফিউরিক অ্যাসিড তৈরি করেছিলেন আল রাজি। তিনি ইথানল উৎপাদন, বিশুদ্ধকরণ এবং চিকিৎসায় এর ব্যবহার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। তিনি বিভিন্ন রাসায়নিক প্রক্রিয়া ও যন্ত্রপাতি সফল আবিষ্কারক। তাঁর হাতেই তৈরি হয়েছে কেরোসিন ল্যাম্প। আল রাজি বিখ্যাত চিকিৎসক হিসেবেও সুপরিচিত।

​ছ. মূসা আল খারেজমি

​অভিজ্ঞ গণিতজ্ঞ হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন মূসা আল খারেজমি। বীজগণিত সম্পর্কে রচিত ‘আল কিতাব আল মুখতাসার ফি হিসাব আল জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ নামক গ্রন্থটি তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি। এই গ্রন্থের নাম ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবিলা’ থেকে বীজগণিতের ইংরেজি নাম ‘অ্যালজেব্রা’ (Algebra) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তাছাড়া পাটিগণিত, ভূগোল, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মানচিত্রকরণের ক্ষেত্রেও মূসা আল খারেজমি উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তিনি ‘সুরাত আল আরদ’ নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানচিত্র হিসেবে পরিচিত।

​কেবল তারাই নন, বরং আরও অনেক মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানী রয়েছেন, যারা অমুসলিমদের বহু পূর্বেই অনেক কিছু আবিষ্কার করে গেছেন। যেমন: ইউসুফ ইবনে উমর সর্বপ্রথম তুলো থেকে তুলট কাগজ তৈরি করেছেন। কম্পাস যন্ত্রের আবিষ্কারক ছিলেন ইবনে আহমদ। স্বীয় আবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে আব্বাস ইবনে ফিরনাস সর্বপ্রথম আকাশে উড়েছিলেন। আলোকবিজ্ঞানী ইবনে হাইসাম প্রথম ক্যামেরা আবিষ্কার করেছিলেন। মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিবিদ ছিলেন আল জাজারি, যাঁর আবিষ্কৃত স্বয়ংক্রিয় রোবট দেখে বিস্ময়ে যে কারোরই চোখ কপালে উঠত। ঘড়ির মেকানিজম বা টাইমিং ডিভাইসের প্রবর্তক ছিলেন বনু মূসার তিন ভাই। প্রথম শ্যাম্পু ব্যবহারের প্রচলন করেছিলেন শেখ দীন মুহাম্মদ। ফাতিমা আল ফিহরি মরক্কোতে বিশ্বের প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ্ববিদ্যালয় ‘কায়রাউইন ইউনিভার্সিটি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

​তাছাড়াও আরও রয়েছেন ইব্রাহিম আল ফাজারি, ইবনে রুশদ, খালিদ ইবনে ইয়াজিদ, ইবনে খালদুন, আবু রায়হান আল বিরুনি, মিমার সিনান, আল মাসুদি, আবুল হাসান ইবনে আলী আল কালাসাদি, ইবনুন নাফিস, ইসহাক ইবনে আলী আল রাহবি, ইবনে জুহর-সহ বহু মুসলিম জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞানী, যাদের সবার নাম উল্লেখ করলে তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।

​কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার জন্য আমাদের বহু মনীষীর নাম বিকৃত করে ফেলা হয়েছে এবং তাদের দীর্ঘ নামকে এক শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন:

​১. রসায়ন শাস্ত্রের জনক জাবের ইবনে হাইয়ানের পুরো নাম হলো আবু আবদুল্লাহ জাবের ইবনে হাইয়ান। কিন্তু তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত করে রাখা হয়েছে ‘জেবার’ (Geber)।

​২. আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পথিকৃৎ ইবনে সিনার পুরো নাম হলো আবু আলী আল হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে সিনা। কিন্তু তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত করে রাখা হয়েছে ‘আভিসেনা’ (Avicenna)।

​৩. বিখ্যাত দার্শনিক আল ফারাবির পুরো নাম হলো আবু নাসর মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল ফারাবি। কিন্তু তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত করে রাখা হয়েছে ‘আলফারাবিয়াস’ (Alpharabius)।

​৪. বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী আল কিন্দির পুরো নাম হলো আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল কিন্দি। কিন্তু তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত করে রাখা হয়েছে ‘আলকিন্ডাস’ (Alkindus)।

​৫. রসায়নবিদ ও চিকিৎসক আল রাজির পুরো নাম হলো আবু বকর মুহাম্মদ ইবনে জাকারিয়া আল রাজি। কিন্তু তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত করে রাখা হয়েছে ‘রাজেস’ (Rhazes) বা ‘রাজিস’।

​৬. বিখ্যাত গণিতজ্ঞ মূসা আল খারেজমির পুরো নাম হলো আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মূসা আল খারেজমি। কিন্তু তাঁর নাম সংক্ষিপ্ত ও বিকৃত করে রাখা হয়েছে ‘algorithm’ (অ্যালগরিদম) বা ‘Algoritmi’।

​এসব বিকৃত নাম দেখে বোঝার উপায় নেই যে এগুলো মুসলমানদের নাম। বিশ্বের সব দেশেরই প্রত্যেক বিজ্ঞানী ও দার্শনিকের মূল নাম অক্ষুণ্ণ রেখে বিভিন্ন ভাষায় তাঁদের গ্রন্থ অনুবাদ ও কর্ম সম্পাদন করা হয়েছে। কিন্তু মুসলিম বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের নাম বিকৃত করা হয়েছে, যা সুস্পষ্ট অন্যায়। মূলত এভাবে তাঁদের পরিচয় ও কীর্তি ঢেকে রাখার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। তাই তো আমরা সবাই খুব ভালোভাবে নিউটন আর গ্যালিলিওদের চিনি; কিন্তু তাঁদের ওস্তাদ আল রাজি, আল ফারাবিদের চিনি না। আমাদের উচিত মুসলিম সভ্যতার গৌরব, মহান জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞানীদের অবদান ও কীর্তি সম্পর্কে গভীরভাবে পড়াশোনা করা এবং তাঁদের সাথে আগামী প্রজন্মের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

​মহান আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তৌফিক দান করুন। আমিন।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন