কওমি মাদরাসার সংকট
নিয়োগ নীতিমালার অভাবে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ১৩:৪৭
কওমি মাদরাসা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা। যুগ যুগ ধরে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং সমাজে আলোকিত নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আজ কওমি শিক্ষাব্যবস্থা একটি নীরব অথচ গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো যোগ্যতা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিয়োগের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর নীতিমালার অনুপস্থিতি।
বর্তমানে অধিকাংশ কওমি মাদরাসায় মুহতামিম, নায়েবে মুহতামিম, নাযেমে তালীমাত, নাযেমে দারুল ইকামা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং অব্যাহতির ক্ষেত্রে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ বা হাইআতুল উলইয়ার পক্ষ থেকে কোনো বাধ্যতামূলক ও বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা নেই। ফলে এসব বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা পারিবারিক সম্পর্ক মুখ্য হয়ে ওঠে। এর ফলে প্রকৃত যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পায়, যা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কওমি অঙ্গনে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, তা সাধারণ মানুষ ও অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় এখন আর কেবল মাদরাসার অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং জাতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে গত এক দশকে “সাহেবজাদা সংস্কৃতি”, স্বজনপ্রীতি এবং বংশানুক্রমিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বহু মেধাবী, পরিশ্রমী ও জনপ্রিয় শিক্ষক তাঁদের প্রাপ্য মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর। শিক্ষক সমাজের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মাঝে আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে এবং মাদরাসার সামগ্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যে কওমি শিক্ষাব্যবস্থা সমাজে সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতার অবস্থান তৈরি করেছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই সংকটময় বাস্তবতার মধ্যেও কওমি শিক্ষার সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সাধারণ শিক্ষকদের অধিকার সংরক্ষণ, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন কিংবা আধুনিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ খুব একটা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে প্রতিটি মাদরাসা কার্যত নিজস্ব পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, যা সামগ্রিকভাবে কওমি শিক্ষাব্যবস্থার ঐক্য, শৃঙ্খলা ও গ্রহণযোগ্যতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
আজ সময়ের দাবি হলো কওমি মাদরাসাগুলোর জন্য একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, যোগ্যতাভিত্তিক এবং বাস্তবমুখী নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতিমালা প্রণয়ন করা। এই নীতিমালায় শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, নৈতিক চরিত্র, জনপ্রিয়তা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবদানকে মূল্যায়নের সুস্পষ্ট মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীর একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠিত না হয়।
একই সঙ্গে দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় রাজনীতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং ব্যক্তিস্বার্থের সংঘাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা জরুরি। কারণ মাদরাসা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি দ্বীন, আখলাক ও আদর্শিক নেতৃত্ব গঠনের কেন্দ্র। যদি এসব প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, ক্ষমতার বাণিজ্য কিংবা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবের শিকার হয়, তবে এর পবিত্রতা, মর্যাদা ও ঐতিহ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কওমি শিক্ষার ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থে এখনই প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, সংস্কার এবং সাহসী পদক্ষেপ। অদূরদর্শিতা, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক মানসিকতা পরিহার করে যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও তাকওয়াভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাহলেই কওমি মাদরাসা তার ঐতিহ্য, গ্রহণযোগ্যতা ও দ্বীনি খেদমতের ধারাকে আরও শক্তিশালীভাবে এগিয়ে নিতে পারবে।
জাগো কওম, জাগো মাদরাসা
আলোর এই পথযাত্রায় তুমি থেকো অটুট, থেকো সবুজ ও প্রাণবন্ত।
দ্বীনের জোনাকি কওমি মাদরাসা,
আঁধারেও তুমি আলো জ্বেলে যাও।
জিন্দা রাখো ইলম, আমল ও ঈমানকে;
জাগ্রত রাখো উম্মাহর আশা, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়কে।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট

