Logo

ধর্ম

উস্তাযের সান্বিধ্য: ইলমের রূহ ও তাফাক্কুহের চাবিকাঠি

Icon

আহমাদ

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ২১:৩৪

উস্তাযের সান্বিধ্য: ইলমের রূহ ও তাফাক্কুহের চাবিকাঠি

দ্বীনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিনিয়তই ইলমের মান ও গভীরতার অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো উস্তাদ-ছাত্র সম্পর্কের সাময়িকতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রাধান্য। যুগের প্রয়োজনে শিক্ষা-দীক্ষা র ধারাটি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় ছাত্রদের সম্পর্ক উস্তাদের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অধিকতর নিবিড় হয়ে উঠেছে। ফলে উস্তাদের সঙ্গে ছাত্রদের সম্পর্ক এখন অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়মরক্ষার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। এর পরিণতিও অত্যন্ত স্পষ্ট। নেসাব সমাপনকারী ছাত্রদের মধ্যে কিতাবি ইস্তেদাদসম্পন্ন ছাত্র হাতেগুনা কয়েকজন থাকে মাত্র। আর ফন্নি তথা, শাস্ত্রীয় জ্ঞানে সুপণ্ডিত ছাত্রের সংখ্যা তো আরও নগণ্য। অপরদিকে রুসুখ ফিল ইলম (ইলমে পরিপক্বতা) ও তাফাক্কুহ ফিদ্দীন (দ্বীনের গভীর পাণ্ডিত্য)-এর অধিকারী, অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্বের বিষয়টি তো বলাই বাহুল্য।

পূর্ণাঙ্গ আলেম হওয়ার পাথেয়

কোনো তালিবুল ইলম কখনোই অনুসরণীয় আলেমে পরিণত হতে পারে না, যতক্ষণ না সে আহলে ফন ও শাস্ত্রজ্ঞ উস্তাদদের সাহচর্যে থেকে গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী ইলম ও বিভিন্ন ফনের গভীর জ্ঞান অর্জন করে। একইভাবে সজাগ, দূরদর্শী ও আহলে ফিকহ ব্যক্তিদের সোহবত থেকে সচেতনতা, প্রাজ্ঞতা, সুদূরপ্রসারী চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত ও কর্মে ভারসাম্য, আদাবুল মুয়াশারা তথা সমষ্টিগত জীবনের শিষ্টাচার ও রীতি-নীতির শিক্ষা এবং তার বাস্তব অনুশীলন অর্জন করাও অপরিহার্য। সর্বোপরি, আহলে দিল ও আহলে তাকওয়ার সোহবত গ্রহণের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি, অন্তরের পবিত্রতা এবং তাকওয়ার গুণে নিজেকে সমৃদ্ধ করা ছাড়া পূর্ণাঙ্গ আলেম হিসেবে গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। সমাজে সুদূরপ্রসারী অবদান রাখতে যারা সক্ষম হয়

বাস্তবতা হলো, সমাজে তাঁরাই উল্লেখযোগ্য ও সুদূরপ্রসারী অবদান রাখতে সক্ষম হন, যারা নিজেদেরকে উস্তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রাখেন এবং তাঁর সোহবত ও ছায়া কখনো ত্যাগ করেন না। কেননা উস্তা যের বিশেষ মনোযোগ, স্নেহ ও মোহাব্বত লাভ মূলত তাঁর সোহবতে অবিচল থাকার ওপরই নির্ভরশীল।

আমাদের আকাবিরগণের যে বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁদের ইলমি ও আমলি জীবনের অন্যতম শক্তি ছিল, আমরা আজ তা থেকে অনেকাংশেই বঞ্চিত, তার মধ্যে একটি হলো, উস্তাযের প্রতি ছাত্রের আন্তরিক মোহাব্বত এবং ছাত্রের সঙ্গে উস্তাদের দৃঢ় ও স্থায়ী সম্পর্ক। এই দৃঢ় সম্পর্কের অর্থ হলো, তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতা, নিয়মরক্ষা বা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সম্পর্ক না হয়; বরং তা হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আন্তরিক ভালোবাসা, আস্থা, ইস্তিফাদা (উপকৃত হওয়া) এবং ইলম ও আদব অর্জনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক জীবন্ত সম্পর্ক। আর স্থায়ী সম্পর্কের অর্থ হলো, উস্তাদ-ছাত্রের বন্ধন যেন কেবল শ্রেণিকক্ষ বা পাঠদানকালেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং শিক্ষা-জীবনের পরও তা অব্যাহত থেকে আজীবন ইলম, আমল, তারবিয়াত ও ইসলাহের এক অবিচ্ছিন্ন সূত্রে পরিণত হয়। অতএব, উস্তায-ছাত্র সম্পর্কের দৃঢ়তা ও স্থায়িত্ব উভয়ই অপরিহার্য।

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নেওয়ার পরও উস্তা যের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রাখা, প্রয়োজনমতো তাঁর পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা গ্রহণ করা, ইলমি জটিলতা ও গবেষণাগত সমস্যার সমাধানের জন্য তাঁর শরণাপন্ন হওয়া এবং তাঁর দোয়া ও শুভকামনা লাভের চেষ্টা করা, এসব বিষয়ে একজন তালিবুল ইলমের সর্বদা সচেতন ও যত্নবান থাকা উচিত।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

তবে এ সম্পর্কের চেয়েও একটি বিষয় অধিক গুরুত্বপূর্ণ, অথচ আজ সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত; তা হলো উস্তাযের দীর্ঘ, নিবিড় ও বিশেষ সোহবত। কেননা কেবল পাঠ গ্রহণ নয়, বরং উস্তাযের সোহবতেই ইলমের রূহ, ফিকহের গভীরতা, চিন্তার পরিপক্বতা, আদব-আখলাক এবং আমলগত ভারসাম্য বিকশিত হয়। এ বিশেষ সোহবতের প্রয়োজনীয়তা মূলত দুই পর্যায়ে।

প্রথমত, প্রচলিত পরিভাষায় 'মাওলানা' হওয়া পর্যন্ত, অর্থাৎ নেসাবের শিক্ষা সম্পন্ন করে ইলমের মৌলিক যোগ্যতা অর্জনের সময় পর্যন্ত।

দ্বিতীয়ত, নেসাব সমাপ্তির পরও রুসূখ ফিল ইলম (ইলমে সুগভীর প্রজ্ঞা), তাফাক্কুহ ফিদ্দীন (দ্বীনের গভীর অনুধাবন ও পাণ্ডিত্য), প্রজ্ঞাপূর্ণ দাওয়াতি দৃষ্টিভঙ্গি এবং খোদাভীতিসম্পন্ন, অনুসরণযোগ্য আলেম হিসেবে আত্মগঠনের লক্ষ্যে। এ দ্বিতীয় পর্যায়ের সোহবতই একজন সাধারণ ফারিগকে ক্রমান্বয়ে একজন পরিণত ও পরিপক্ক আলেমে রূপান্তরিত করে।

সালাফের কর্ম পদ্ধতি

সালাফের যুগে অনেক আলেম এমন ছিলেন, যারা শিক্ষা সমাপণের পরেও দশ, বিশ, ত্রিশ ও চল্লিশ বছর পর্যন্ত বিশেষ আহলে ফন উস্তাযের সাহচর্যে কাটিয়েছেন। কেউ তো অন্য সব ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে এ সাধনা করেছেন। আর কেউ অন্য কিছু দ্বীনী ব্যস্ততার পাশাপাশি দিন-রাতের অধিকাংশ সময় বা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সময় উস্তাদের সাহচর্য গ্রহ ণ করেছেন। এ ধরণের দৃষ্টান্ত তারিখ ও তারাজিমের গ্রন্থাবলিতে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান । কয়েকটি আমরা উল্লেখ করছি:

এক: বিশিষ্ট আরবী ভাষাবিদ ইমাম আবু উবায়দা মা'মার ইবনুল মুসান্না আল বাসরী রহ. (১১০-২০৯ হিজরী) বলেছেন, আমি আমার উস্তায প্রসিদ্ধ আরবী ভাষাবিদ ইউনুস ইবনে হাবিব রহ. (৯০-১৮২ হিজরী)-এর খেদমতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত আসা-যাওয়া করেছি। (ওফায়াতুল আ'য়ান, ইবনে খাল্লিকান, ৭/২৪৫, দারু সাদের, বৈরুত)

দুই: ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বলেছেন, আমরা পূর্ণ দশ বছর ইসমাইল ইবনে উলাইয়া রহ. এর সান্বিধ্য গ্রহণ করেছি। প্রতিদিন তার খেদমতে উপস্থিত হতাম। বিশেষ কোনো অসুবিধা ছাড়া কখনো অনুপস্থিত থাকি নি। (আল ইলাল ওয়া মা 'রিফাতুর রিজাল, আব্দুল্লাহ ইবনে আহমাদ বিন হাম্বল রহ., ২/৬৯, আল-ফারুক আল-হাদিসা)

তিন: বরিত অনুসরণীয় ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর বিষয়টি তো খুবই প্রসিদ্ধ। তিনি একাধারে আঠারো বছর ফকিহুল ইরাক হাম্মাদ ইবনে আবু সুলাইমান রহ.-এর সোহবত গ্রহণ করেছেন।

কাজী ইউসুফ রহ. ও তার উস্তায আবু হানিফা রহ. এর সান্বিধ্যে সতের বছর অবস্থান করেছেন।

আমাদের নিকট অতীতের কিছু নমুনা

শিক্ষা-দীক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক রূপ লাভের পরেও আকাবিরের যুগে এ রীতির বিলুপ্ত ঘটেনি। হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. ও হযরত সাহারানপুরী রহ. উভয়ে হযরত রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহ. এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যস্ততার সময়েও। মাওলানা জফর আহমাদ উসমানী রহ. ছাত্র জীবন শেষ হওয়ার পরেই হযরত থানভী রহ. এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন। শায়খুল হাদিস মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী রহ. ও মাওলানা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী রহ. এর এবং মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. ডক্টর আব্দুল আলী নদভী রহ. এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা তাকী উসমানী সাহেব দা. বা. হযরত মাওলানা মুফতী শফী রহ. এর এবং মুফতী সাইদ আহমাদ পালনপুরী রহ. মাওলানা মুফতী মাহদী হাসান শাহজাহানপুরী রহ. ও আল্লামা বিলয়াবী রহ. এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন। যদি নিকট অতীতের আকাবিরের জীবন অধ্যয়ন করা হয় তাহলে দেখা যাবে, যারা গভীর জ্ঞানের অধিকারী হয়েছেন এবং দ্বীনি খেদমতের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তারা শুধু নিয়মের সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানভিত্তিক সম্পর্কের মাঝে সিমাবদ্ধ ছিলেন না বরং কোনো না কোনো শাস্ত্রাভিজ্ঞ মেহেরবান উস্তাদের সাহচর্য গ্রহণ করেছিলেন।

অতএব, আমাদের আকাবিররা যে নিজেদেরকে স্বীয় উস্তাদগণের রঙে রাঙিয়ে তুলেছেন, সেটা একমাত্র সম্ভব হয়েছিলো আবেগ, আস্থা ও ভালোবাসাপূর্ণ দীর্ঘ সোহবত ও সান্নিধ্যের বরকতেই। তাদের জীব নের পরতে পরতে আমরা এই শিক্ষাই পাই। তাই যারা আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও নিরবচ্ছিন্ন যত্নের সঙ্গে দীর্ঘদিন উস্তাদের সোহবতে নিজেদের গড়ে তুলবেন, তারাই একদিন ইলম ও আমলের দিগন্তে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উদিত হবেন। তাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, তাকওয়া ও চরিত্রের আলো শুধু নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজ, জাতি ও উম্মাহর সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়বে। মানুষ তাঁদের থেকে ইলম গ্রহণ করবে, তাঁদের অনুসরণ করবে এবং তাঁদের মাধ্যমে দ্বীনের খেদমতের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে আকাবির ও সালাফদের মতো উস্তাযের সান্বিধ্য ও সাহচর্য গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ আলেম হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শিক্ষার্থী: জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন