যে কারণে বিয়ের পর অধিকাংশ নারীর ঈমানের স্বাদ কমে যায়
মুফতি উবায়দুল হক খান
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৬:২০
মানুষের জীবনে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি শুধু সামাজিক বা পারিবারিক বন্ধন নয়; বরং ইবাদতের একটি মাধ্যম, দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিয়ের আগে অনেক নারী ইবাদতে আগ্রহী থাকেন—নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-জিকির—এসবের মধ্যে তারা প্রশান্তি খুঁজে পান। কিন্তু বিয়ের পর অনেকের মধ্যেই সেই আগ্রহ ও আত্মিক তৃপ্তি কমে যেতে দেখা যায়। প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হয়?
উল্লিখিত ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এক মহিলা যখন তার ইবাদতে আগের মতো স্বাদ না পাওয়ার কথা বলেন, তখন ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) তার স্বামীর হক আদায়ের বিষয়টি সামনে আনেন। প্রথম বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এখানেই লুকিয়ে আছে গভীর সত্য।
১. ইবাদতের সামগ্রিকতা না বোঝা
অনেকেই ইবাদত বলতে শুধু নামাজ, রোজা বা কুরআন তিলাওয়াতকেই বোঝেন। অথচ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি দায়িত্ব, প্রতিটি সম্পর্কই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। একজন স্ত্রীর জন্য স্বামীর হক আদায় করা, সংসার পরিচালনা করা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালন করা—এসবই ইবাদত।
যখন কেউ ইবাদতকে সীমিত করে ফেলে কেবল কিছু নির্দিষ্ট আমলের মধ্যে, তখন জীবনের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো অবহেলিত হয়। এর ফলে অন্তরে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যা ঈমানের স্বাদ কমিয়ে দেয়।
২. স্বামীর হক আদায়ে অবহেলা
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,কোনো নারী ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ ঈমানের স্বাদ পাবে না, যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করে।
এই হাদিসটি আমাদের বুঝিয়ে দেয়, বৈবাহিক সম্পর্ক ঈমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। স্বামীর প্রতি দায়িত্বে অবহেলা করলে তা শুধু পারিবারিক অশান্তিই সৃষ্টি করে না, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়। কারণ, আল্লাহ যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা যথাযথভাবে পালন না করলে ইবাদতের পূর্ণতা আসে না।
৩. নিয়তের ঘাটতি
বিয়ের আগে ইবাদত অনেক সময় একান্ত ব্যক্তিগত হয়। তখন মানুষ নিজেকে গড়ে তোলার জন্য ইবাদত করে। কিন্তু বিয়ের পর দায়িত্ব বাড়ে, কাজের চাপ বাড়ে। যদি তখন এসব কাজকে ইবাদত হিসেবে গণ্য না করা হয়, তাহলে মনে হবে—"আমি আগের মতো ইবাদত করতে পারছি না।"
কিন্তু যদি নিয়ত ঠিক করা হয়—"আমি স্বামীর খেদমত করছি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, আমি সন্তান লালন-পালন করছি আল্লাহর জন্য"—তাহলে এই কাজগুলোও ইবাদতে পরিণত হয় এবং ঈমানের স্বাদ ফিরে আসে।
৪. সময় ব্যবস্থাপনার অভাব
বিয়ের পর নতুন পরিবেশ, নতুন দায়িত্ব, নতুন সম্পর্ক—সব মিলিয়ে সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে। অনেক নারী এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন না। ফলে ধীরে ধীরে ইবাদতের সময় কমে যায়, মনোযোগ কমে যায়। এটি একটি বাস্তব সমস্যা। তবে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। অল্প হলেও নিয়মিত ইবাদত করা, নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা—এসব খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৫. পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব
বিয়ের আগে একজন নারী যে পরিবেশে বড় হন, সেখানে হয়তো ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নতুন পরিবারে সেই পরিবেশ না-ও থাকতে পারে। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা যদি দ্বীনের ব্যাপারে উদাসীন হন, তাহলে তার প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ধৈর্য, হিকমাহ (প্রজ্ঞা) এবং দোয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। নিজে আমল ঠিক রাখা এবং ধীরে ধীরে পরিবেশকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা—এটাই করণীয়।
৬. মানসিক চাপ ও ক্লান্তি
সংসারের কাজ, সন্তান লালন-পালন, বিভিন্ন দায়িত্ব—এসব কারণে অনেক নারী শারীরিক ও মানসিকভবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এই ক্লান্তি ইবাদতে মনোযোগ কমিয়ে দেয়। কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে, ইসলাম সহজ ধর্ম। আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। তাই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ইবাদত করা এবং বিশ্রামের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
৭. আত্মসমালোচনার অভাব
অনেক সময় আমরা সমস্যার মূল কারণ খুঁজে দেখি না। আমরা ভাবি—"আমার ঈমান কমে গেছে", কিন্তু কেন কমেছে তা বিশ্লেষণ করি না। ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) যে প্রশ্নটি করেছিলেন—"তুমি তোমার স্বামীর হক কতটুকু আদায় করেছ?"—এটি আসলে একটি আত্মসমালোচনার দরজা খুলে দেয়। আমাদেরও উচিত নিজেদের আমল, দায়িত্ব ও আচরণ নিয়ে নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা।
সমন্বয়ের প্রয়োজন
একজন নারীর জীবনে ইবাদত ও সংসার—দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি পূর্ণতা পায় না। বরং এই দুইয়ের মধ্যে সুন্দর সমন্বয়ই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়। যে নারী তার স্বামীর প্রতি দায়িত্বশীল, সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলে এবং পাশাপাশি আল্লাহর ইবাদতে যত্নবান—সেই প্রকৃত সফল।
ঈমানের প্রকৃত স্বাদ
বিয়ের পর ঈমানের স্বাদ হারিয়ে ফেলা কোনো স্বাভাবিক বা অনিবার্য বিষয় নয়। বরং এটি আমাদের কিছু ভুল ধারণা, অবহেলা এবং অসচেতনতার ফল। ইবাদতের সঠিক ধারণা, দায়িত্বের প্রতি সচেতনতা, নিয়তের বিশুদ্ধতা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার—এসবের মাধ্যমে আবারও সেই ঈমানি স্বাদ ফিরে পাওয়া সম্ভব।
আমাদের মনে রাখতে হবে—ইসলাম শুধু মসজিদ বা জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আমাদের পুরো জীবনই ইবাদত। একজন নারী যখন তার স্বামীর হক আদায় করে, সংসারকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিটি কাজ করে—তখনই সে প্রকৃত ঈমানের স্বাদ অনুভব করতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করার তাওফিক দান করুন এবং ঈমানের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়াতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, গাজীপুর

