Logo

ধর্ম

বিশ্ব শ্বেতী রোগ দিবস আজ

ধবল রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

Icon

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১৮:৫৯

ধবল রোগ সম্পর্কে সচেতনতা ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি

প্রতি বছর ২৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব শ্বেতী রোগ দিবস। এ দিবসের লক্ষ্য হলো শ্বেতী বা ধবল রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, রোগীদের প্রতি বিদ্যমান কুসংস্কার দূর করা এবং সমাজে তাদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে ধবল রোগ কোনো সংক্রামক ব্যাধি নয়, তবুও অজ্ঞতা ও ভুল ধারণার কারণে অনেক রোগী সামাজিক বৈষম্য, অবহেলা ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হন।

ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্যের পরিবর্তে তার ঈমান, তাকওয়া, চরিত্র ও আমলকে গুরুত্ব দেয়। তাই ধবল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞা নয়; বরং সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা।

ধবল রোগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ধবল রোগ মানবসভ্যতার প্রাচীনতম পরিচিত ত্বকজনিত রোগগুলোর একটি। প্রাচীন মিশর, ভারত ও গ্রিসের চিকিৎসাবিষয়ক গ্রন্থে এ রোগের বর্ণনা পাওয়া যায়। একসময় এটি কুষ্ঠরোগের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হতো, ফলে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমাজে নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হতেন।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ধবল রোগ কুষ্ঠ নয়, এটি সংক্রামকও নয়। এটি মূলত ত্বকের রঞ্জক পদার্থ উৎপাদনকারী কোষের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়। বর্তমানে চিকিৎসা ও সচেতনতার মাধ্যমে রোগীদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করা সম্ভব হচ্ছে।

রোগ আল্লাহর পরীক্ষা, অভিশাপ নয়

অনেক মানুষ এখনো মনে করেন শারীরিক অসুস্থতা বা ত্বকের রোগ আল্লাহর শাস্তি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রোগ সব সময় শাস্তি নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা পরীক্ষা, গুনাহ মাফের মাধ্যম এবং মর্যাদা বৃদ্ধির উপায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন—আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।”(সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে মানুষের জীবনে আসা বিভিন্ন কষ্ট, অসুস্থতা ও বিপদ আল্লাহর পরীক্ষার অংশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—মুমিনের যে কোনো ক্লান্তি, রোগ, দুশ্চিন্তা, কষ্ট, এমনকি শরীরে কাঁটা ফুটলেও আল্লাহ এর মাধ্যমে তার গুনাহ মাফ করে দেন।”(সহিহ বুখারি: ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩) অতএব ধবল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে অভিশপ্ত মনে করবেন না; বরং ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখবেন।

মানুষের মর্যাদা চেহারায় নয়, তাকওয়ায়

বর্তমান সমাজে সৌন্দর্যকে অনেক সময় মানুষের মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়। ফলে ত্বকের কোনো সমস্যা বা শারীরিক ভিন্নতার কারণে অনেকেই হীনমন্যতায় ভোগেন।কিন্তু ইসলাম এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক তাকওয়াবান।”(সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের চেহারা ও সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।”(সহিহ মুসলিম: ২৫৬৪)

এই হাদিস মানবজাতির জন্য একটি মহান শিক্ষা। একজন মানুষের গায়ের রং, মুখমণ্ডল, শারীরিক গঠন বা রোগ তার সম্মান নির্ধারণ করে না; বরং তার ঈমান ও সৎকর্মই তার প্রকৃত পরিচয়।

উপহাস, বিদ্রূপ ও বৈষম্য ইসলামে নিষিদ্ধ

ধবল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই সমাজে উপহাস, কটূক্তি ও অপমানের শিকার হন। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন—হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।” (সূরা আল-হুজুরাত: ১১) আরও বলেন—তোমরা একে অপরের দোষ অন্বেষণ করো না এবং একে অপরকে মন্দ উপাধিতে ডেকো না। (সূরা আল-হুজুরাত: ১১)

ধবল রোগে আক্রান্ত কাউকে “দাগওয়ালা”, “অসুস্থ”, “অভিশপ্ত” ইত্যাদি বলে ডাকা বা তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা ইসলামের দৃষ্টিতে গুনাহের কাজ।

অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা

ইসলাম শুধু রোগীকে সহ্য করার শিক্ষা দেয়নি; বরং তার পাশে দাঁড়ানোকে ইবাদত হিসেবে ঘোষণা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার প্রতি জুলুম করে না এবং তাকে অসহায় অবস্থায় ছেড়ে দেয় না।(সহিহ বুখারি: ২৪৪২; সহিহ মুসলিম: ২৫৮০)

আরও বলেছেন—যে ব্যক্তি কোনো রোগীর খোঁজখবর নেয়, সে জান্নাতের ফল সংগ্রহ করতে থাকে।” (সহিহ মুসলিম: ২৫৬৮) এ হাদিসগুলো আমাদের শেখায়, রোগীদের একঘরে না করে তাদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তা প্রদান করা ঈমানের দাবি।

চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নাহ

কিছু মানুষ রোগকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। অথচ ইসলাম চিকিৎসা গ্রহণকে উৎসাহিত করেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা গ্রহণ করো। কেননা আল্লাহ এমন কোনো রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিকার সৃষ্টি করেননি।(সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫; জামে তিরমিজি: ২০৩৮) তাই ধবল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের উচিত অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা গ্রহণ করা।

ধৈর্যশীলদের জন্য সুসংবাদ

দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য ধৈর্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তাআলা বলেন—নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অগণিতভাবে দেওয়া হবে।”(সূরা আয-যুমার: ১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—আল্লাহ যখন কারো কল্যাণ চান, তখন তাকে পরীক্ষায় ফেলেন।”(সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৪৫) ধবল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি ধৈর্য ধারণ করেন, চিকিৎসা গ্রহণ করেন এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখেন, তবে এ রোগ তার জন্য আখিরাতের কল্যাণের মাধ্যম হতে পারে।

পরিবারের করণীয়

ধবল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। বিশেষ করে বিবাহ, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। এ অবস্থায় পরিবারের উচিত তাদের সাহস জোগানো এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ানো।

সমাজের করণীয়

* ধবল রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার করা।

* আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করা।

* শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। 

* মানসিক সহায়তা প্রদান করা।

* চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করা।

ইসলামের ইতিহাসে রোগীদের প্রতি সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত

রাসুলুল্লাহ (সা.) অসুস্থ, দরিদ্র ও শারীরিকভাবে ভিন্ন মানুষদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন। তিনি কখনো কাউকে তার শারীরিক অবস্থা বা চেহারার কারণে হেয় করেননি। বরং দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহ দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন—তোমাদের দুর্বলদের কারণেই তোমরা সাহায্য ও রিজিক লাভ করে থাকো।”(সহিহ বুখারি: ২৮৯৬) এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমাজের দুর্বল ও রোগাক্রান্ত মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উপায়।

পরিশেষে বলা যায়, বিশ্ব শ্বেতী রোগ দিবস কেবল একটি স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক দিবস নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বার্তা বহন করে। ধবল রোগ কোনো অভিশাপ নয়, কোনো পাপের ফলও নয়; এটি মানুষের জীবনের একটি শারীরিক অবস্থা মাত্র। কোরআন ও হাদিসের শিক্ষা হলো—রোগীকে অবজ্ঞা নয়, ভালোবাসা দিতে হবে; উপহাস নয়, সম্মান দিতে হবে; বিচ্ছিন্ন নয়, আপন করে নিতে হবে।

বিশ্ব শ্বেতী রোগ দিবস ২০২৬-এ আমাদের অঙ্গীকার হোক—ধবল রোগ সম্পর্কে কুসংস্কার দূর করা, আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং ইসলামের মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক আদর্শ অনুসরণ করে একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তোলা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মানবতার এই মহান শিক্ষা বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। ইমেইল :drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন