Logo

ধর্ম

প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুমিনের করণীয়

Icon

আমীনুর রহমান নড়াইলী

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬, ১০:০০

প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুমিনের করণীয়

মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ নতুন কোনো ঘটনা নয়। যুগে যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভূমিকম্প, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, ভূমিধস, মহামারি ও অগ্নিকাণ্ডের মতো নানা দুর্যোগ মানবজাতিকে বিপর্যস্ত করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষ সত্ত্বেও মানুষ এখনো প্রকৃতির সামনে অনেকাংশেই অসহায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত ভয়াবহ ভূমিকম্প, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—মানুষ যত শক্তিশালীই ভাবুক না কেন, প্রকৃতির ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে এসব দুর্যোগ কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; বরং এগুলো মানুষের জন্য শিক্ষা, সতর্কবার্তা, পরীক্ষা ও আত্মসমালোচনার উপলক্ষও বটে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে পরীক্ষা করব। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।" (সুরা আল-বাকারা : ১৫৫)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে, দুনিয়ার জীবন মূলত পরীক্ষার ক্ষেত্র। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মতো দুঃখ-কষ্ট ও দুর্যোগও মানুষের জন্য পরীক্ষা। একজন মুমিন এসব পরিস্থিতিতে ধৈর্য, আল্লাহর প্রতি আস্থা ও সঠিক কর্মপন্থার মাধ্যমে নিজের ঈমানের পরিচয় দেন।

দুর্যোগকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে দেখা

প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হলে একজন মুমিন সর্বপ্রথম উপলব্ধি করবেন যে, সমগ্র বিশ্বজগতের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। পৃথিবীর শক্তিশালী রাষ্ট্র, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক সক্ষমতা কোনো কিছুই আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, "আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব তাঁরই। তিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। আর তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান।" (সুরা হাদিদ : ২)

প্রকৃতির এই অপ্রতিরোধ্য শক্তি মানুষকে তার সীমাবদ্ধতা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে একজন মুমিন অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হন এবং মহান সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে আসেন।

তওবা ও আত্মসমালোচনা করা

দুর্যোগের সময় একজন মুমিনের অন্যতম করণীয় হলো নিজের আমল ও জীবনযাপন সম্পর্কে আত্মসমালোচনা করা। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমাদের ওপর যে বিপদ-আপদ আসে, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল; তবে তিনি অনেক কিছু ক্ষমা করে দেন।" (সুরা শুরা : ৩০)

এর অর্থ এই নয় যে, প্রত্যেক দুর্যোগই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির গুনাহের শাস্তি। বরং দুর্যোগ মানুষের জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই এমন সময়ে আমাদের উচিত বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রতিদিন বহুবার ইস্তিগফার করতেন। তাহলে আমরা, যারা নানাভাবে পাপ ও অবহেলায় জড়িয়ে পড়ি, তাদের জন্য তওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব আরও বেশি।

ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা

প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক মানুষ প্রিয়জন, সম্পদ ও আশ্রয় হারিয়ে চরম মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হন। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ‘সবর’ বা ধৈর্য।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।" (সুরা আল-বাকারা : ১৫৩)

ধৈর্য মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়; বরং বিপদের সময় বিচলিত না হয়ে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং প্রয়োজনীয় সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা। মুমিন জানেন, প্রতিটি কষ্টের মধ্যেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে এবং আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দার প্রতি অবিচার করেন না।

আতঙ্ক নয়, সচেতনতা

ইসলাম বাস্তবতাবিমুখ কোনো ধর্ম নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কেবল দোয়া-দরুদ পড়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং প্রয়োজন যথাযথ সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "প্রথমে উটকে বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।" (তিরমিজি)

এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা ঈমানেরই অংশ। তাই ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সময় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা, নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া, উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা ইসলামী দৃষ্টিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবসেবাকেও ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকে, আল্লাহও তার প্রয়োজন পূরণে নিয়োজিত থাকেন।" (সহিহ বুখারি)

দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, ওষুধ, আশ্রয় ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের উচিত উদারহস্তে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। একই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, রক্তদান করা এবং উদ্ধারকর্মীদের সহায়তা করাও একজন মুমিনের দায়িত্ব।

মৃতদের জন্য দোয়া ও জীবিতদের সান্ত্বনা

প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ইসলাম মৃতদের জন্য দোয়া করতে এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে উৎসাহিত করেছে। দুর্গত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া, আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা করা এবং তাদের কষ্ট ভাগ করে নেওয়া ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের দাবি।

একজন মুমিন জানেন, মৃত্যু অনিবার্য এবং প্রত্যেক মানুষকেই একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তাই দুর্যোগের ঘটনাগুলো আমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।

গুজব ও অপপ্রচার থেকে বিরত থাকা

দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের গুজব, ভুয়া তথ্য ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারী প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। এসব গুজব মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, "হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে এলে তোমরা তা যাচাই করে নাও।" (সুরা হুজুরাত : ৬)

অতএব, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকা, বিভ্রান্তিকর পোস্ট শেয়ার না করা এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য অনুসরণ করা একজন সচেতন মুমিনের দায়িত্ব।

দোয়া ও আল্লাহর স্মরণ বৃদ্ধি করা

দুর্যোগের সময় বেশি বেশি দোয়া, জিকির ও ইবাদতে মনোনিবেশ করা উচিত। বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কারণ প্রকৃত আশ্রয় ও নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহর কাছেই।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।" (সুরা গাফির : ৬০)

তাই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিকভাবে দোয়া করা, নফল নামাজ আদায় করা, কোরআন তিলাওয়াত করা এবং আল্লাহর স্মরণে নিজেকে নিয়োজিত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের অসহায়ত্ব, পার্থিব জীবনের অনিত্যতা এবং মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। একজন মুমিন দুর্যোগে হতাশ হন না; বরং ধৈর্য ধারণ করেন, তওবা করেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন এবং দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান। একই সঙ্গে তিনি বাস্তবসম্মত সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং সমাজে সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চা বাড়িয়ে তোলেন।

আজ যখন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানছে, তখন আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের ঈমান ও আমলের হিসাব নেওয়া, আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করা। কেননা, বিপদ-আপদে ধৈর্য, সহমর্মিতা ও আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থাই একজন প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

লেখক: শিক্ষক, মাদরাসাতুদ দাওয়াহ আশ-শরইয়্যাহ, নারায়ণগঞ্জ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন