মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বসবাস করতে গিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু একজন মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতা সীমিত। তাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্যের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ইসলামে পরামর্শ বা 'শূরা' এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়—সব ক্ষেত্রে সাফল্য ও কল্যাণের পথ সুগম করে। পরামর্শ মানুষের চিন্তাকে সমৃদ্ধ করে, ভুলের সম্ভাবনা কমায় এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করে।
পরামর্শের আরবি প্রতিশব্দ হলো 'শূরা' বা 'মাশওয়ারা'। এর অর্থ হলো—কোনো বিষয়ে অভিজ্ঞ, বিজ্ঞ ও কল্যাণকামী ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। ইসলাম পরামর্শকে শুধু একটি সামাজিক রীতি হিসেবে নয়; বরং একটি ইবাদত ও মহান গুণ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন— "আর তাদের কার্যাবলি পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।" [সূরা শূরা: ৩৮]
এই আয়াতে স্পষ্টভবে বলা হয়েছে, মুমিনদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ, একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে সম্মিলিত চিন্তা ও মতবিনিময়ই ইসলামের আদর্শ।
আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন— "আর আপনি তাদের সঙ্গে কাজের বিষয়ে পরামর্শ করুন।" [সূরা আলে ইমরান: ১৫৯]
এই আয়াতের বিশেষ তাৎপর্য হলো—এখানে পরামর্শের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। তিনি ছিলেন ওহির মাধ্যমে পরিচালিত, তারপরও আল্লাহ তাঁকে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, পরামর্শ করা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি মহান নেতৃত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল পরামর্শের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে আলোচনা করতেন। বদর যুদ্ধের আগে তিনি সৈন্যদের অবস্থান নির্ধারণের ব্যাপারে সাহাবি হযরত খুবাব ইবনুল মুনযির রাদিয়াল্লাহু আনহুর মতামত গ্রহণ করেছিলেন। একইভাবে উহুদ যুদ্ধের সময় তিনি নিজের ব্যক্তিগত মতের বিপরীতে অধিকাংশ সাহাবির মতামতকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এতে প্রমাণিত হয়, একজন প্রকৃত নেতা নিজের মতামত চাপিয়ে দেন না; বরং অন্যের মতামতের মূল্যায়ন করেন।
একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— "যে ব্যক্তি ইস্তিখারা করবে, সে ব্যর্থ হবে না; আর যে ব্যক্তি পরামর্শ করবে, সে অনুতপ্ত হবে না।"
অর্থাৎ, আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা এবং অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ গ্রহণ করা মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। পরামর্শ মানুষের ভুল কমিয়ে দেয় এবং তার সিদ্ধান্তকে আরও বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করে তোলে।
পরামর্শের সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো—এটি মানুষকে একনায়কতন্ত্র ও আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে রক্ষা করে। অনেক সময় মানুষ নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে যথেষ্ট মনে করে একক সিদ্ধান্ত নেয়, যার ফলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কিন্তু বিভিন্ন মানুষের মতামত ও অভিজ্ঞতা একত্রিত হলে সিদ্ধান্ত অধিক পরিপক্ব ও কল্যাণকর হয়। এ কারণেই বলা হয়, "একটি মাথার চেয়ে অনেক মাথার চিন্তা অধিক ফলপ্রসূ।"
পরিবারে পরামর্শের গুরুত্ব অপরিসীম। স্বামী-স্ত্রী যদি পারস্পরিক আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে সংসার পরিচালনা করেন, তাহলে পারিবারিক শান্তি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি পায়। সন্তানদের শিক্ষা, বিয়ে, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল বোঝাবুঝি কমে যায় এবং সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও পরামর্শের বিকল্প নেই। ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদিনের শাসনআমল ছিল পরামর্শভিত্তিক শাসনের অনন্য দৃষ্টান্ত। হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত ওমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু, হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। এর ফলে তাঁদের শাসনব্যবস্থা ছিল ন্যায়ভিত্তিক, কল্যাণমুখী ও জনগণের আস্থাশীল।
তবে পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু নীতিমালা অনুসরণ করা জরুরি।
প্রথমত: সৎ, বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে। অসৎ বা স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির পরামর্শ ক্ষতির কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত: পরামর্শ গ্রহণের পর সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
তৃতীয়ত: পরামর্শ গ্রহণের পর আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন— "আর যখন তুমি দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো।" [সূরা আলে ইমরান: ১৫৯]
বর্তমান যুগে ব্যক্তিকেন্দ্রীকতা ও আত্মঅহমিকার কারণে অনেকেই অন্যের পরামর্শ গ্রহণ করতে চান না। ফলে পারিবারিক কলহ, সামাজিক অস্থিরতা এবং নানা ধরনের সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো—বিনয়ী হওয়া, অন্যের মতামতের মূল্যায়ন করা এবং সম্মিলিতভাবে উত্তম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
পরামর্শ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা। এটি ব্যক্তিগত জীবনে সফলতা, পারিবারিক জীবনে শান্তি, সামাজিক জীবনে ঐক্য এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে। কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা অনুসারে পরামর্শভিত্তিক জীবন গড়ে তুলতে পারলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই কল্যাণ ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত অহংকার পরিহার করে বিজ্ঞ ও সৎ ব্যক্তিদের সঙ্গে পরামর্শ করা এবং জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শূরার নীতি অনুসরণ করা। কেননা পরামর্শ মানুষকে ভুল থেকে রক্ষা করে, জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে এবং তাকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দেয়।
লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

