বাংলাদেশের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কওমি ও আলিয়া—এই দুই ধারার মাদ্রাসা শিক্ষা দীর্ঘকাল ধরে সমান্তরালভাবে চলে আসছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, সরকারি কর্মসংস্থান এবং সিলেবাসের ভিন্নতার কারণে কওমি মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় মূলধারার পেশাদার সুযোগ-সুবিধা থেকে এক প্রকার বঞ্চিত ছিলেন।
২০১৭ সালে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদিস’ (তাকমীল)-কে ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি সাহিত্যে মাস্টার্স (স্নাতকোত্তর) সমমান প্রদান করার মাধ্যমে এই বৈষম্যের অবসান ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায়, সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক জারিকৃত এক ঐতিহাসিক পরিপত্রের মাধ্যমে আলিয়া মাদ্রাসার শূন্যপদগুলোতে কওমি গ্র্যাজুয়েটদের আবেদনের সরাসরি আইনি সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
ঐতিহাসিক পরিপত্রের প্রেক্ষাপট
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এমপিও শাখা কর্তৃক ২৩ জুন ২০২৬ (৯ আষাঢ় ১৪৩৩) তারিখে জারিকৃত স্মারক নম্বর ৫৭.০০.০০০০.০০০.০৮০.০৬.০০০১.২৬.৭২ এর পরিপত্রটি দেশের শিক্ষাখাতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬’-এর পরিশিষ্ট-ঘ এর ক্রমিক নং ২৩ এবং ৪২ এ বর্ণিত পদের নিয়োগের কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা সংশোধন করে এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই সংশোধনের ফলে আলিয়া মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কওমি সনদের বৈধতা সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা দুই ধারার শিক্ষার দূরত্ব দূর করতে মেলবন্ধন হিসেবে কাজ করবে।
পদভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বেতন স্কেলের বিবরণ
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আলিয়া মাদ্রাসার ‘ইবতেদায়ি ক্বারী’ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ মাদ্রাসা বোর্ডের পাশাপাশি ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন ‘দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)’ ডিগ্রি এবং কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হতে ইলমে কিরাত বা হিফজুল কোরআন সনদধারীদের সরাসরি আবেদনের যোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এই পদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড-১৬ (৯৩০০-২২৪৯০/) নির্ধারণ করা হয়েছে।
একইভাবে, ‘সহকারী মৌলভী (ক্বারী)’ পদের ক্ষেত্রেও কিরাত ও ফাজিল ডিগ্রির সমন্বয় সাধন করা হয়েছে, যেখানে যোগ্যতা ভেদে ১০ম ও ১১শ গ্রেডে বেতনের সুযোগ রয়েছে।
সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব
১. বেকারত্ব নিরসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ: প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ স্তর শেষ করে বের হন। আলিয়া মাদ্রাসায় কওমি সনদের মাধ্যমে চাকরির পথ সুগম হওয়ায় বিশাল এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মেধা রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
২. দুই ধারার মাদ্রাসার দূরত্ব হ্রাস: কওমি ধারার আলেমদের আলিয়া মাদ্রাসার সরকারি কাঠামোতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের এই সুযোগ উভয় ধারার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করবে।
৩. শুদ্ধ কোরআন শিক্ষার প্রসার: কওমি মাদ্রাসার হিফজ ও কিরাত বিভাগ অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। আলিয়া মাদ্রাসার ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে কওমি ধারার দক্ষ ক্বারী ও হাফেজদের নিয়োগের ফলে সাধারণ ও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের শুদ্ধভাবে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও তাজবিদ শিক্ষার মান বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এই প্রজ্ঞাপনটি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার ঐতিহাসিক অবদানের রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। কওমি গ্র্যাজুয়েটদের জন্য আলিয়া মাদ্রাসায় চাকরির এই দ্বার উন্মোচন দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী করবে। এর মাধ্যমে জাতীয় মূলধারায় কওমি আলেমদের সম্পৃক্ততা যেমন বাড়বে, তেমনি ধর্মীয় শিক্ষার সামগ্রিক মান ও সামাজিক মর্যাদা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
লেখক: প্রভাষক‚ ইসলামিক স্টাডিজ, দশমিনা ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা‚ পটুয়াখালী

