Logo

ধর্ম

কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও সনদের স্বীকৃতি

একটি বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬, ১০:২৭

কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও সনদের স্বীকৃতি

এক. ইতিহাসের আয়নায় কওমি শিক্ষা

​কওমি মাদরাসা কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি এ দেশের সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাধারা। ব্রিটিশ উপনিবেশ শুরুর আগে এই দেওবন্দী ধারার শিক্ষাই ছিল এ অঞ্চলের মূলধারার শিক্ষা। মোঘল আমলে এই শিক্ষায় শিক্ষিত মনীষীরাই দেশের প্রশাসন পরিচালনা করতেন, আদালত ও বিচারালয়ের প্রধান হতেন, ‘সাদরুশ শরীয়া’র আসন অলঙ্কৃত করতেন। তখন আদালতের ভাষা ছিল আরবি, যার জাজ্বল্যমান প্রমাণ ‘ফাতওয়ায়ে হিন্দিয়া’। আর দাপ্তরিক ভাষা ছিল ফারসি।

​১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার আগে এ দেশে প্রায় আশি হাজার মক্তব-মাদরাসা ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা এই দেশীয় শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করার জন্য মাদরাসার লাখেরাজ (নিষ্কর) ভূমি বাজেয়াপ্ত করে। ১৮৩৭ সালে লর্ড মেকলের প্রেসক্রিপশনে ইংরেজি শিক্ষা চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং ফারসির বদলে ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা করা হয়। ফলে মুসলিম সমাজ এক চরম শিক্ষাগত বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, বন্ধ হয়ে যায় হাজার হাজার মাদরাসা।

​এই মহাসংকটে মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় ও জাতীয় স্বকীয়তা রক্ষার্থে ১৮৬৬ সালে মাওলানা কাসেম নানুতবী (রহ.)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’। ব্রিটিশদের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকার জন্য তিনি ‘উসূলে হাশতেগানা’ বা আট মূলনীতির মাধ্যমে ঘোষণা করেন—এই মাদরাসা চলবে জনগণের দানে। দেওবন্দ শুধু মাদরাসা ছিল না, এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইয়ের দুর্গ। দেওবন্দের প্রথম ছাত্র শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.) ছিলেন আজাদী আন্দোলনের এক অকুতোভয় সেনাপতি, যাকে ব্রিটিশরা মাল্টায় নির্বাসন দিয়েছিল। পক্ষান্তরে, ১৭৮০ সালে ব্রিটিশরা তাদের প্রশাসনিক স্বার্থে ‘কলকাতা আলিয়া মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করে, যার প্রথম ২৭ জন প্রিন্সিপালই ছিলেন ইংরেজ। অন্যদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে ব্রিটিশদের সাথে আপস করেছিলেন। কিন্তু দেওবন্দ ছিল আপসহীন। তাই সাম্রাজ্যবাদীদের উত্তরাধিকারী ও তাদের মানসিক দাসেরা কওমী মাদরাসার বিরোধিতা করবে—এটাই স্বাভাবিক।

​৯/১১-এর পর বৈশ্বিক মিডিয়া ও পশ্চিমা শক্তি মাদরাসার বিরুদ্ধে এক নতুন ‘তথ্যসন্ত্রাস’ শুরু করেছে। ভারত ও পাকিস্তানে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি ভারতের মোদি সরকার দেওবন্দকে শত কোটি রুপির অনুদান দিতে চাইলেও দেওবন্দ তা বিনম্র সাহসিকতায় প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তানের পারভেজ মোশাররফের নিয়ন্ত্রণচেষ্টাও সফল হয়নি। আজ বাংলাদেশের কওমী মাদরাসার দিকেও সেই একই শ্যেনদৃষ্টি।

দুই. অপপ্রচার ও কওমীর স্বকীয়তা

​১৮৬৬ সালের পর থেকেই কওমী মাদরাসাকে নানা বিশেষণে বিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। কখনো ‘খারেজি’, কখনো ‘ওহাবী’, আবার কখনো ‘মোল্লা-মুনশী’ বলে বিদ্রুপ করা হয়েছে। আর বর্তমান কর্পোরেট মিডিয়া পশ্চিমা পরিভাষার অন্ধ অনুবাদ করে একে ‘জঙ্গিবাদ’ বা ‘মৌলবাদের’ প্রজনন কেন্দ্র বলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

​অথচ কওমী মাদরাসা শত বছর ধরে সমাজে শান্তির বার্তা ছড়াচ্ছে। তাদের রয়েছে অসাম্প্রদায়িক ও উদার নৈতিক আদর্শ। কওমী মাদরাসার সম্পর্ক এ দেশের আমজনতার সাথে। দেশের লাখ লাখ মসজিদের ইমাম, খতীব এবং আপনার পাশের হিফজখানাটিই এর জীবন্ত প্রমাণ।

​২০১৮ পালে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও যুগের প্রয়োজনে কওমী মাদরাসার মুরব্বীগণ শর্তসাপেক্ষে সরকারের দেওয়া সনদের স্বীকৃতি গ্রহণ করেছেন। যদিও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে খোদ কওমী অঙ্গনেও ভিন্নমত রয়েছে; অনেকেই ভয় পাচ্ছেন—আলিয়া মাদরাসার মতো কওমী মাদরাসাও না আবার সরকারি বেড়াজালে পড়ে তার স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। এই স্বীকৃতির পর গণমাধ্যম ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীরা একতরফা কলাম ও টকশোতে নানা নেতিবাচক আলোচনা শুরু করেছেন, যার উপযুক্ত জবাব কওমী স্কলারদের দিতে হবে।

তিন. সিলেবাস সংস্কার: কার, কতটুকু প্রয়োজন

​যারা কওমীর সিলেবাস সংস্কারের কথা বলেন, তাদের ভাবা উচিত—সংস্কার তো আমাদের সাধারণ (জেনারেল) শিক্ষারও প্রয়োজন। ব্রিটিশদের গোলামী আমলের ছক থেকে আমাদের সাধারণ শিক্ষা কি বের হতে পেরেছে? এই শিক্ষা কি আজ বাণিজ্যিকীকরণ আর বেকার তৈরির কারখানায় পরিণত হয়নি?

​মাদরাসা শিক্ষার একমুখীীকরণের নামে আলিয়া মাদরাসাকে আজ যেভাবে স্কুল-কলেজের আদলে রূপান্তর করা হয়েছে, তার পরিণতি আমরা দেখছি। সেখানে কি এখন পর্যাপ্ত যোগ্য আলেম তৈরি হচ্ছে? কওমী মাদরাসার শিক্ষা চৌদ্দশত বছরের ঐতিহ্যবাহী। কুরআন-হাদিসের মূল পাঠ্যকে অক্ষুণ্ণ রেখেই আজকের কওমী সিলেবাস তৈরি হয়েছে। ওলামায়ে কেরাম যদি কোনো সংস্কার বা পরিমার্জন করেন, তবে তা আরও যোগ্য আলেম বানানোর জন্য করবেন, সরকারের কেরানী তৈরির জন্য নয়।

চার. দাওরায়ে হাদীসের সনদ: কেন এটি মাস্টার্সের সমতুল্য নয়?

​সরকার কওমীর সর্বোচ্চ স্তর ‘দাওরায়ে হাদীস’কে ইসলামিক স্টাডিজ ও অ্যারাবিকে মাস্টার্সের সমমান দিয়েছে। কিছু সুশীল ও আধুনিকতাবাদী এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই—আপনারা কি কওমীর গভীরতা পরিমাপ করেছেন?

​একজন কওমী শিক্ষার্থী সাধারণত হাফেজে কুরআন হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজে কি হিফজ বাধ্যতামূলক? কওমীর ছাত্ররা প্রায় এক যুগ ধরে নাহু-সরফ (ব্যাকরণ), বালাগাত (অলঙ্কারশাস্ত্র), ফিকহ ও উসূলে ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র), তাফসীর ও উসূলে তাফসীর এবং সমৃদ্ধ আরবি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। চূড়ান্ত বর্ষে (দাওরায়ে হাদীসে) তারা ‘সিহাহ সিত্তা’ বা হাদিসের প্রধান ছয়টি কিতাবের মূল টেক্সট (ইবারত) অক্ষরে অক্ষরে পড়েন, যার মধ্যে প্রায় লাখো হাদিস রয়েছে। তাদের পরীক্ষার প্রশ্ন হয় আরবিতে এবং উত্তরও দিতে হয় আরবিতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বা আরবি বিভাগে কি পুরো সিহাহ সিত্তা কিংবা সম্পূর্ণ কুরআনের তরজমা-তাফসীর এভাবে পড়ানো হয়?

​বিশ্ববিদ্যালয়ের গোছানো সিলেবাস, সেমিস্টার সিস্টেম বা গবেষণার কদর অবশ্যই আছে। কিন্তু কওমীর দীর্ঘ আঠারো থেকে একুশ বছরের (নূরানী, নাজেরা, হিফজ, ইবতেদায়ী থেকে শুরু করে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত) কঠোর পরিশ্রমের পর এই সনদ কি মাস্টার্সের সমমান পাওয়ার উপযুক্ত নয়? অবশ্যই উপযুক্ত। চট্টগ্রামের ‘দারুল মা’আরিফ আল-ইসলামিয়া’র মতো আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী মাদরাসার সিলেবাসগুলো পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট হবে যে, একজন কওমী গ্রাজুয়েট আরবি ভাষায় কতটা বুৎপত্তি অর্জন করেন।

পাঁচ. আমাদের আগামীর প্রত্যাশা

​ব্যক্তিগতভাবে আমি আমাদের ছেলেদের শুধু ইমাম বা কাজী বানানোর পক্ষে নই। আমাদের শিক্ষাবিদদের উচিত যুগের চাহিদার আলোকে মূল সিলেবাস ঠিক রেখে এমন কিছু আধুনিক বিষয় বা ভাষার সংযোজন করা, যাতে কওমীর মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে বিসিএসসহ দেশের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী জায়গায় অবদান রাখতে পারে।

​পরিশেষে বলব, কওমী মাদরাসার দাওরায়ে হাদীসের সনদ জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকে অবশ্যই ইসলামিক স্টাডিজের সমমান। যারা এতে সন্দিহান, তাদের প্রতি অনুরোধ—সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করে ইনসাফের সাথে কওমীর বিশাল সিলেবাসটি একবার চোখ বুলিয়ে দেখুন। কওমী মাদরাসা জনগণের ছিল, জনগণেরই থাকবে।

লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন