Logo

ধর্ম

কওমি মাদরাসায় কারিগরি শিক্ষা

একটি বাস্তবসম্মত খসড়া প্রস্তাব

Icon

লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০৭

একটি বাস্তবসম্মত খসড়া প্রস্তাব

​আমি তখন একটি কওমি মাদরাসার 'নাযেমে দারুল ইকামা' (আবাসিক তত্ত্বাবধায়ক)। এই পদে কাজ করেছি দীর্ঘ এক যুগ। পাশাপাশি 'নাযেমে তালীমাত' বা শিক্ষা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা দুই যুগেরও বেশি। এই দীর্ঘ পথচলায় অভিভাবকেরা স্বভাবতই তাঁদের সন্তানদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমার কাছে আসতেন, পরামর্শ চাইতেন। আমিও আমার সাধ্যমতো তাঁদের সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

​১. মেধার ভিন্নতা ও শাকিরের গল্প

​একবার এক শাইখুল হাদীস সাহেব তাঁর ছেলেকে নিয়ে এলেন। ছেলেটি সব কিছুতেই একটু উগ্র মেজাজের। ভদ্রলোক অনুরোধ করলেন ছেলেকে যেন আমার নিজের কামরাতেই রাখি। ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার কামরায় ছাত্র রাখা পছন্দ করি না; আমার উস্তাদেরও নসিহত ছিল ছাত্রদের থেকে ব্যক্তিগত কোনো সেবা না নেওয়া। তাছাড়া আমার কামরাটি ছিল বেশ বড় এবং সেখানে নানা বিষয়ের প্রচুর বইপত্র ছিল। তবুও বিশেষ নজরদারির খাতিরে ছেলেটিকে আমার তত্ত্বাবধানেই রাখলাম।

​কিন্তু দেখা গেল, ছেলেটি ক্লাসে ঠিকমতো মন দেয় না। পড়াশোনায় তার চরম অনীহা। একদিন তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, "তোমার আসলে কী করতে ভালো লাগে?" সে অকপটে উত্তর দিল, "পড়াশোনা আমার ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগে মোবাইল ভাঙতে, কম্পিউটারের ভেতরে কী আছে তা ভেঙেচুরে দেখতে।" পড়াশোনা নিয়ে আমার যত ওয়াজ-নসিহত ছিল, তার ক্ষেত্রে সবই ব্যর্থ হলো। একদিন সে নিজের জিনিসপত্র গুটিয়ে মাদরাসা থেকে পালিয়ে গেল। ছেলেটির নাম শাকির।

​২. পুঁথিগত বিদ্যায় অনাগ্রহী 'সাজিদ'

​আমার ক্লাসে আরেকটি হাফেজ ছেলে ছিল। অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু ভীষণ কমবখত। ক্লাসের পড়া সে ভালোই পারত, তবে পরীক্ষা ছাড়া অন্য কখনো তাকে বই হাতে দেখা যাক না। তখন সে 'হেদায়াতুন্নাহু' কিতাব পড়ে, আর আমি পড়াই আরবি সাহিত্য। ক্লাসে অমনোযোগী হয়েও ছেলেটি পরীক্ষার মেধা তালিকায় শীর্ষস্থান অধিকার করত। মিষ্টি চেহারার ছেলেটির মুখে সবসময় একটা মৃদু হাসি লেগে থাকত। একদিন তাকে ক্লাসের বাইরে বাড়তি কিছু বই পড়ার পরামর্শ দিতেই সে বলল, "আমার পড়তে একদম ভালো লাগে না।"

​— "তাহলে কী করতে ভালো লাগে?"

— "যন্ত্রপাতির ভেতরে কী আছে তা দেখতে ভালো লাগে। আমার মনে বড় ইচ্ছা, আমি ইঞ্জিনিয়ার হব।"

​বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হতেই ছেলেটি মাদরাসা ছেড়ে চলে গেল, আর ফিরল না। ধরে নিলাম, তার নাম সাজিদ।

​৩. জীবনযুদ্ধে সফল আল-আমীন

​ঈদের আগে সাধারণত আমি নতুন জামাকাপড় বানাতে আগ্রহী হই না, কারণ শেষ মুহূর্তে দর্জিরা কাজ নিতে চায় না। সেবার আমার স্ত্রী ছেলের মাধ্যমে এক দর্জির দোকানে কাপড় পাঠিয়ে দিলেন। আমার কাজ ছিল শুধু সেটি নিয়ে আসা। বারবার তাগাদা পেয়ে শেষ পর্যন্ত দোকানে গেলাম।

​দোকানের কারিগরটি আর কেউ নয়, আমারই প্রাক্তন ছাত্র। আমাকে দেখে সে বিনীতভাবে বলল, "উস্তাদ, কফি আনি?" আমি বারণ করলাম। কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "দর্জিগিরি করে কেমন আয়-উন্নতি করলে?" সে জানাল, জমি কিনে ফাউন্ডেশন দিয়ে নিজের বাড়ি তৈরি করছে। কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করলাম, "এই ঈদের মৌসুমে কেমন উপার্জন হলো?" সে বলল, "উস্তাদ, চার লাখের মতো হবে। আমাদের তো সারা বছরের মূল আয় এই দুই ঈদেই।"

​ছোট্ট দোকান, কারিগর মাত্র কয়েকজন। সে নিজে শুধু কাপড় কাটে। আমার পাঞ্জাবির মজুরি জানতে চাইলে সে বলল, "যা মন চায় দিন উস্তাদ। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাড়ে তিনশত টাকা নিই। আপনি তিনশত টাকা দিলেই হবে, আর না দিলেও আমি খুশি।" যেহেতু সে আমার কাছে কিতাব পড়েছে, তাই মনে মনে যেন এ কথা না ভাবে যে—'হুজুরদের কাজ করে শান্তি নেই, পয়সা কম দেয়'—আমি তাকে পুরো সাড়ে তিনশত টাকাই দিলাম। মাদরাসায় 'কাফিয়া' কিতাব পর্যন্ত পড়ে পড়াশোনা বাদ দেওয়া এই ছেলেটির নাম আল-আমীন।

​৪. জীবনের ভিন্ন আঙিনায় তিন ছাত্র

​আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যদি ওই তিন ছাত্রের দিকে তাকাই—শাকির এখন কম্পিউটারের দোকান দিয়েছে। গত রমজানে চিল্লা দিয়ে এসেছে। পরিবারে পর্যাপ্ত আর্থিক সহযোগিতা করছে, বিয়েথা করেছে এবং তার মেয়েরা মহিলা মাদরাসায় পড়ছে। সংসারে তার বেশ ভালো আয়।

​সাজিদ তার ধর্মীয় লেবাস (টুপি-পাঞ্জাবি) বজায় রেখেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সে নিয়মিত তারাবিহর নামাজ পড়ায়। মাদরাসায় সে 'শড়হে বেকায়া' কিতাবের পর আর পড়েনি।

​আর আল-আমীন এখন লাখপতি। সে নিজের ছেলেদের মাদরাসায় ভর্তি করিয়েছে। এই তিনজনই একই মাদরাসার ছাত্র ছিল। এদের কেউ আলেম হতে পারেনি। অভিভাবকদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা সেই পথে যায়নি বা যেতে পারেনি। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই এখন হালাল উপায়ে উপার্জন করে পরিবার চালাচ্ছে, সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছে এবং সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় शिक्षित করছে। হয়তো তাদের সন্তানেরা আগামী দিনে আলেম হবে। সবাইকে আলেম হতেই হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, তবে সবাইকে দ্বীনদার হতে হবে এবং ফরজ পরিমাণ দ্বীনি ইলম অর্জন করতে হবে।

​আমার ৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে সাজিদ, শাকির আর আল-আমীনের মতো শত শত ছাত্র দেখেছি, যারা কারিগরি ও প্রায়োগিক জ্ঞানে অত্যন্ত আগ্রহী, কিন্তু কিতাবি পড়াশোনায় অমনোযোগী। এটি মূলত আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের ভেতরের এক সহজাত প্রবণতা বা মেধার ভিন্নতা।

​ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেই একটি বৈদ্যুতিক লাইট লাগাতেও অক্ষম, যার জন্য প্রায়ই খোঁটা শুনতে হয়। কম্পিউটার, ইঞ্জিনিয়ারিং বা দর্জিবিদ্যার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমি বই পড়তে ভালোবাসি; মনে হয় অন্য সব কাজ আমার জন্য দুরূহ ও কঠিন। এমনকি নিয়মিত বাজার করতে যাওয়াতেও আমার তীব্র অনীহা। বাজারে গেলে মনে হয় পড়ার সময়টুকু নষ্ট হচ্ছে, আর সেখানে গিয়ে বারবার প্রতারিতও হই। তবে বই কেনার ক্ষেত্রে আমি বেশ পটু। সুতরাং, মানুষের মেধা ও রুচি ভিন্ন হতেই পারে।

​৫. কওমি মাদরাসায় কারিগরি শিক্ষার প্রস্তাবনা

​প্রতি বছর হাজার হাজার ছেলে কওমি মাদরাসায় ভর্তি হচ্ছে। তারা সবাই আলেম হবে—এমন চিন্তা বাস্তবসম্মত নয়। নানাবিধ কারণে অনেকেই শেষ পর্যন্ত আলেম হতে পারে না। যারা প্রকৃত মেধাবী এবং যাদের ভেতরে ইলমের তৃষ্ণা আছে, তারাই আলেম হবে।

​তবে যাদের আগ্রহ কারিগরি কাজের প্রতি, তাদেরকে দ্বীনি পরিবেশে ফরজ পরিমাণ ইলম শিক্ষা দিয়ে পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার আয়োজন করা অত্যন্ত চমৎকার একটি পদক্ষেপ হতে পারে। অবশ্য এই কারিগরি শিক্ষার জন্য কোনো এনজিও বা কোনো বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হওয়ার প্রয়োজন কওমি মাদরাসার নেই।

​মাদরাসার নিজস্ব উদ্যোগে ও ব্যবস্থাপনায়, দ্বীনি মেজাজ ও পরিবেশ ঠিক রেখে, কিতাবে অনাগ্রহী ছাত্রদের জন্য বহুমুখী কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্বীনদার ও দক্ষ কারিগর এবং প্রযুক্তিবিদদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

​তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে কারিগরি শিক্ষা বলতে আমি শুধু পুরনো দর্জিগিরির কথা বলছি না; এই পরিধি এখন অনেক ব্যাপক। আউটসোর্সিং বা ফ্রিল্যান্সিংও এই প্রস্তাবনার অন্তর্ভুক্ত। মুদ্রণ শিল্পও (প্রিন্টিং মিডিয়া) একটি বড় ক্ষেত্র হতে পারে। ছাত্রদের এই বিষয়ে দক্ষ করে তুললে দ্বীনি বইপত্র ও কিতাবাদি প্রকাশের ক্ষেত্রে একদিন দ্বীনদারদের আধিপত্য তৈরি হবে। এছাড়া কৃষি, গরুর খামার, মৎস্য চাষের মতো প্রজেক্টগুলোর ওপরও প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে—তবে তা অবশ্যই হতে হবে সম্পূর্ণ দ্বীনি পরিবেশ রক্ষা করে।

​একটি মাদরাসার পক্ষে হয়তো সব কাজ একা করা সম্ভব নয়। তবে মাদরাসা যদি আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হয়, তবে দ্বীনদার বিত্তবান ও বিশেষজ্ঞদের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা অবশ্যই পাওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, মাদরাসার প্রধান দায়িত্ব কিন্তু এটি নয়, তাই এর জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে।

​এই উদ্যোগ সব মাদরাসার জন্য প্রযোজ্য নয়। যেসব মাদরাসায় পর্যাপ্ত জায়গা, অর্থ এবং জনবল আছে, তারা পরীক্ষামূলকভাবে এগিয়ে আসতে পারে। ইতিমধ্যে কোনো কোনো জামিয়া এই জাতীয় উদ্যোগ নিয়েছে—কেউ সফল হয়েছে, কেউবা ব্যর্থ। তবে এই সফলতা ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই কওমি মাদরাসাকে যুগের প্রয়োজনে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

​অন্যের সন্দেহজনক আর্থিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর না করে, আমাদের ছাত্ররা যদি হালাল উপায়ে উপার্জন করে তার একটি অংশ মাদরাসায় দান করে, তবে সেই টাকায় বরকত হবে। আর সেই বরকতময় অর্থেই প্রকৃত মেধাবীরা নিঃশঙ্কচিত্তে দ্বীনি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। অন্যথায়, হারাম বা সন্দেহজনক উপার্জনের টাকা মাদরাসার ভেতরের 'রুহানিয়্যাত' বা আধ্যাত্মিকতা ধ্বংস করে দেয়; তখন মাদরাসা পরিণত হয় বরকতহীন এক প্রাসাদের লাশে। যারা আলেম হতে চান, তাঁদের যেমন হালাল খাবার গ্রহণ করা জরুরি, তেমনি তাঁদের থাকতে হবে হালাল উপার্জনকারীদের সাহচর্যেই। আর এই লক্ষ্য অর্জনে কারিগরি শিক্ষা হতে পারে একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও হালাল আয়ের মাধ্যম।

লেখক: ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট, ময়মনসিংহ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন