কওমি মাদরাসায় সরকারি অনুদান
ঐতিহ্য, বিবর্তন ও প্রাসঙ্গিকতা
আবু আবদুল্লাহ
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৪
বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় এদেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রেক্ষাপটে মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। এ দেশে মূলত দুই ধারার মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে— সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও অনুদানভুক্ত আলিয়া মাদরাসা এবং সম্পূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত দেওবন্দি ভাবধারার কওমি মাদরাসা।
বাংলাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দ্বীনি ইলমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। সমাজের অসংখ্য দরিদ্র, এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী এখানে বিনামূল্যে বা স্বল্প ব্যয়ে শিক্ষা, আবাসন ও খাদ্যের সুযোগ পায়। জনগণের দান-সদকা, যাকাত, ওয়াকফ এবং শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেই কওমি মাদরাসাগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিকভাবে কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি অনুদান বা হস্তক্ষেপ এড়িয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে জনসাধারণের আর্থিক সহায়তায়। তবে ইদানিং কওমি মাদরাসার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সরকারি অনুদানের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
'কওম' শব্দের অর্থ জাতি বা জনগোষ্ঠী। জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গড়ে ওঠে বলেই একে কওমি মাদরাসা বলা হয়। ১৮৬৬ সালে ভারতের দেওবন্দে দারুল উলুম মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই ধারার সূচনা হয়েছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব থেকে ইসলামি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখাই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
শুরু থেকেই এই ব্যবস্থার মূলনীতি ছিল সরকারি অনুদান গ্রহণ না করা। কওমি ধারার পুরোধা ব্যক্তিত্বগণ মনে করতেন, সরকারি অনুদান গ্রহণ করলে মাদরাসার পাঠ্যক্রম, অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বাড়বে। ফলে দেওবন্দি সনদের অষ্টম মূলনীতি (উসূলে হাশতাহ) অনুযায়ী, সরকারি বা নিয়মিত কোনো ফিক্সড অনুদান গ্রহণ করা থেকে কওমি মাদরাসাগুলো বিরত থাকত।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি অনুদানের বিষয়টি বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন মত ব্যক্ত করা হচ্ছে। কেউ এটিকে আর্থিক স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কওমি মাদরাসার স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার প্রশ্নে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তাই বিষয়টি আবেগের পরিবর্তে দূরদর্শিতা, বাস্তবতা ও জাতীয় স্বার্থের আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি অনুদান পাওয়া গেলে অনেক কওমি মাদরাসার ভবন, লাইব্রেরি, প্রযুক্তিগত সুবিধা, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন হতে পারে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে এবং জাতীয় উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে এর পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও রয়েছে। কওমি মাদরাসার মূল বৈশিষ্ট্য হলো তাদের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত স্বাধীনতা। যদি সরকারি অনুদানের সঙ্গে এমন কোনো শর্ত যুক্ত হয়, যা তাদের আকিদা, পাঠ্যক্রম, শিক্ষাব্যবস্থা বা পরিচালনায় অযাচিত হস্তক্ষেপ সৃষ্টি করে, তাহলে সেই স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
হতে পারে প্রথমত শর্ত ছাড়াই অনুদান অনুমোদন হলেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিভিন্ন শর্ত আরোপিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান। তাই উল্লেখযোগ্য আকাবির ও উলামায়ে কেরাম সরকারি অনুদান থেকে বিরত থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন।
সরকারি অনুদানে বিতর্ক ও আশঙ্কার দিক
সরকারি অনুদান গ্রহণের বিষয়টি কওমি অঙ্গনে সম্পূর্ণ বিতর্কহীন নয়। এর পেছনে মূল আশঙ্কাগুলো হলো- কওমি আলেমদের বড় অংশের ধারণা, নিয়মিত সরকারি অনুদান নিলে মাদরাসার পাঠ্যসূচি, শিক্ষক নিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হবে, যা কওমি শিক্ষার মূল আদর্শের পরিপন্থী।
তছাড়া সরকারি অনুদান অনেক সময় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হতে পারে, যা মাদরাসার নিরপেক্ষ ও স্বাধীন চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, সরকারি অনুদান নিজে ভালো বা মন্দ নয়; বরং এর কার্যপদ্ধতি ও শর্তই নির্ধারণ করবে এর সুফল বা কুফল। কওমি মাদরাসার দ্বীনি আদর্শ, স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে যদি শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং জনকল্যাণে অনুদান ব্যবহৃত হয়, তবে তা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে। আর যদি অনুদান প্রতিষ্ঠানের মৌলিক বৈশিষ্ট্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হবে। সুতরাং বিচক্ষণতা, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।
এক্ষেত্রে সরকার ও কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট আলেমদের মধ্যে আন্তরিক সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা ও স্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। অনুদান যদি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন এবং কোনো অযৌক্তিক শর্ত ছাড়া প্রদান করা হয়, তবে তা শিক্ষার উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
কওমি মাদরাসা বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। যুগের প্রয়োজনে এবং শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও বিশেষ অনুদানের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। তবে তা হতে হবে কওমি মাদরাসার নিজস্ব স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে। সরকার এবং কওমি মাদরাসার শীর্ষ বোর্ডগুলোর (যেমন- হাইয়াতুল উলয়া বা বেফাক) পারস্পরিক আস্থা ও সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল এই প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু ও কল্যাণকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব।
লেখক: আলেম, শিক্ষক, গবেষক

