মানুষের জীবনে সম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত। তবে ইসলাম সম্পদকে শুধু ভোগের উপকরণ হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। এই সম্পদ দ্বারা মানুষ যেমন নিজের প্রয়োজন পূরণ করে, তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বহু কল্যাণকর কাজও সম্পাদন করে। তাই একজন মুমিন যখন সম্পদ বৃদ্ধির জন্য দোয়া করবে, তখন তার উদ্দেশ্য হবে নেক কাজের সক্ষমতা অর্জন করা। কেবল দুনিয়াবি বিলাসিতা নয়; বরং দান-সদকা, আত্মীয়তার হক আদায়, জাকাত, কোরবানি, হজ ও উমরার মতো মহান ইবাদত পালনের জন্য সম্পদ কামনা করাই একজন ঈমানদারের পরিচয়।
মহান আল্লাহ বলেন— ‘তোমরা আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে খাও এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করো না।’ -[সুরা বাকারা : ৬০] আবার রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘নেককার সম্পদ নেককার ব্যক্তির জন্য কতই না উত্তম!’ -[মুসনাদে আহমদ]
অতএব সম্পদ খারাপ নয়; বরং সম্পদের সঠিক ব্যবহারই মূল বিষয়। একজন মুসলমানের উচিত এমন নিয়ত রাখা, আল্লাহ যদি তাকে সম্পদ দান করেন তবে সে সেই সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।
দান-সদকা করার জন্য সম্পদ কামনা
দান-সদকা ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। এটি মানুষের গুনাহ মাফের কারণ হয়, বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম হয়। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের দায়িত্ব। কিন্তু সামর্থ্য না থাকলে অনেক সময় মানুষের সাহায্য করা সম্ভব হয় না। তাই একজন মুসলমানের উচিত আল্লাহর কাছে এমন সম্পদ চাওয়া, যা দ্বারা সে মানুষের উপকার করতে পারে।
রাসুল (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বেশি দানশীল। তিনি নিজের প্রয়োজনের চেয়েও অন্যের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতেন। সাহাবায়ে কেরামও সম্পদ অর্জন করতেন আল্লাহর পথে ব্যয় করার জন্য। হজরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) ছিলেন ধনী সাহাবি; কিন্তু তার সম্পদের বড় অংশই ব্যয় হতো ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণে।
দান-সদকার মাধ্যমে সমাজে ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, হিংসা-বিদ্বেষ কমে যায় এবং মানুষের হৃদয়ে প্রশান্তি আসে। তাই সম্পদ বৃদ্ধির জন্য এই নিয়ত রাখা উচিত— ‘হে আল্লাহ! আমাকে এতটুকু সম্পদ দিন, যাতে আমি আপনার বান্দাদের উপকার করতে পারি।’
আত্মীয়-স্বজনের হক আদায়ের জন্য সম্পদ কামনা
ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং আর্থিক সহযোগিতা করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। কিন্তু অনেক সময় অভাবের কারণে মানুষ আত্মীয়দের হক আদায় করতে পারে না। এজন্য একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর কাছে এমন রিজিক কামনা করা, যার মাধ্যমে সে আত্মীয়দের সহযোগিতা করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আত্মীয়কে তার হক দাও, অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও।’ -[সুরা রূম : ৩৮]
বর্তমান সমাজে অনেকেই ধনী হলেও আত্মীয়দের ভুলে যায়। অথচ আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বড় গুনাহের কাজ। যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সাহায্য করে, আল্লাহ তার রিজিকে বরকত দান করেন এবং আয়ু বৃদ্ধি করেন। রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বৃদ্ধি পাক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ -[সহিহ বুখারি] তাই সম্পদ বৃদ্ধির দোয়া করার সময় এই নিয়ত থাকা উচিত— ‘হে আল্লাহ! আমাকে এমন রিজিক দিন, যাতে আমি আত্মীয়দের হক আদায় করতে পারি।’
জাকাত দেওয়ার জন্য সম্পদ কামনা
জাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। এটি সম্পদের পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম। যে সম্পদের জাকাত আদায় করা হয় না, সেই সম্পদে প্রকৃত বরকত থাকে না। কিন্তু জাকাত দেওয়ার জন্য নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া প্রয়োজন। এজন্য অনেক নেককার বান্দা আল্লাহর কাছে এমন সম্পদ কামনা করেছেন, যার মাধ্যমে তারা জাকাত আদায় করতে পারেন।
জাকাত গরিব-দুঃখীদের অধিকার। এটি সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি করে এবং ধনী-গরিবের ব্যবধান কমিয়ে আনে। একজন মুসলমান যখন জাকাত দেয়, তখন সে কেবল একটি ফরজ ইবাদত আদায়ই করে না; বরং নিজের অন্তরকেও কৃপণতা থেকে মুক্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করুন, যা দ্বারা আপনি তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ -[সুরা তাওবা : ১০৩]
অনেকেই শুধু নিজের জন্য সম্পদ চায়। কিন্তু একজন মুমিনের মনোভাব হবে ভিন্ন। সে বলবে— ‘হে আল্লাহ! আমাকে এতটুকু সম্পদ দিন, যাতে আমি জাকাত আদায় করতে পারি এবং আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।’
কোরবানি করার জন্য সম্পদ কামনা
কোরবানি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর মহান ত্যাগের স্মৃতি। এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রতীক। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য কোরবানি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অনেক মানুষ এই ইবাদত পালনে কষ্ট অনুভব করে। তাই একজন মুসলমানের উচিত কোরবানি করার সামর্থ্য লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা।
কোরবানির মাধ্যমে মানুষ নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করতে শেখে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কোরবানির গোশত গরিবদের মাঝে বণ্টন করলে সমাজে সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায়। রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ -[ইবনে মাজাহ]
এই হাদিস থেকে কোরবানির গুরুত্ব বোঝা যায়। তাই সম্পদ বৃদ্ধির জন্য এই নিয়ত করা উচিত— ‘হে আল্লাহ! আমাকে এমন রিজিক দিন, যাতে প্রতি বছর আমি কোরবানি করতে পারি এবং গরিবদের মাঝে তা বণ্টন করতে পারি।’
হজ ও উমরা করার জন্য সম্পদ কামনা
হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ। প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। উমরাও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। কিন্তু হজ ও উমরা পালনের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। তাই অনেক মুমিন আল্লাহর কাছে এমন সম্পদ কামনা করেন, যার মাধ্যমে তাঁরা বাইতুল্লাহর মেহমান হতে পারেন।
কাবাঘর দেখা প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা। মক্কা ও মদিনায় গিয়ে ইবাদত করা, রাসুল (সা.)-এর রওজা জিয়ারত করা এবং আল্লাহর ঘরে কান্নাকাটি করে দোয়া করা— এগুলো একজন মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয়। রাসুল (সা.) বলেছেন— ‘এক উমরা থেকে আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী গুনাহের কাফফারা হয়ে যায় এবং কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ -[সহিহ বুখারি] তাই একজন ঈমানদারের উচিত আল্লাহর কাছে এমন রিজিক কামনা করা, যা তাকে হজ ও উমরার মতো মহান ইবাদত পালনের সুযোগ করে দেয়।
সম্পদ কল্যাণের কাজে ব্যয় হোক
ইসলাম মানুষকে সম্পদ অর্জনে নিরুৎসাহিত করেনি; বরং সম্পদকে কল্যাণের পথে ব্যয় করতে শিক্ষা দিয়েছে। একজন মুমিনের দৃষ্টিতে সম্পদ কখনো অহংকারের কারণ নয়; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। তাই আমাদের সম্পদ বৃদ্ধির দোয়া হতে হবে পবিত্র নিয়তের উপর ভিত্তি করে। দান-সদকা, আত্মীয়দের হক আদায়, জাকাত প্রদান, কোরবানি এবং হজ-উমরার মতো ইবাদত পালনের উদ্দেশ্যে সম্পদ কামনা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হালাল রিজিক দান করুন, রিজিকে বরকত দিন এবং সেই সম্পদ তাঁর সন্তুষ্টির পথে ব্যয় করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর।

