মানবসভ্যতার ইতিহাসে কৃষি ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি-২
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:১০
(পূর্ব প্রকাশের পর দ্বিতীয় ও শেষ অধ্যায়)
আজকের পৃথিবীতে কৃষির গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমির ক্রমাগত সংকোচন, নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা এবং দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা আমাদের সামনে এক কঠিন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
এমন এক সময়ে আমরা বাস করছি, যখন একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা সামরিক সক্ষমতায় নয়; বরং তার খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করছে।
যে রাষ্ট্র তার জনগণের খাদ্য নিশ্চিত করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে আত্মনির্ভর ও শক্তিশালী।
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নত জাতের ফসল, আধুনিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট ফার্মিংয়ের সম্ভাবনা; অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং বাজারের অনিশ্চয়তা।
এই চ্যালেঞ্জগুলোকে ভয় পাওয়ার কারণ নেই; বরং এগুলোকে নতুন সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। কারণ প্রতিটি সংকটের ভেতরেই ভবিষ্যতের নতুন পথ লুকিয়ে থাকে।
আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কৃষিকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা। কৃষি কেবল হালচাষ বা মৌসুমি ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, ব্র্যান্ডিং, ই-কমার্স এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।
যে তরুণ একসময় শুধু চাকরির কথা ভাবতেন, তিনিই আজ আধুনিক কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলে নিজের পাশাপাশি অন্যদেরও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। কৃষি এখন আর শুধু পেশা নয়; এটি জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি সম্ভাবনাময় শিল্প।
কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ও ভোক্তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি—বাংলাদেশের কৃষকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তাঁর পরিশ্রম, আর সবচেয়ে বড় চাওয়া সম্মান ও ন্যায্য মূল্য।
কৃষক দান চান না, করুণা চান না; তিনি চান তাঁর উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য এবং তাঁর শ্রমের স্বীকৃতি। যখন একজন কৃষক ন্যায্য মূল্য পান, তখন তিনি শুধু নিজের পরিবারের জীবনমান উন্নত করেন না; দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকেও আরও শক্তিশালী করেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষক কখনো একা কাজ করেন না। তাঁর প্রতিটি বীজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গবেষকের মেধা, কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ, উদ্যোক্তার উদ্যোগ, ব্যবসায়ীর বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তার আস্থা। এই পুরো ব্যবস্থাটি একে অপরের পরিপূরক।
তাই কৃষির উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, গবেষক, উদ্যোক্তা, কৃষক এবং সচেতন ভোক্তা—সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।
মানুষের ইতিহাসে অসংখ্য প্রযুক্তির জন্ম হয়েছে, অসংখ্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আবার সময়ের স্রোতে হারিয়েও গেছে। কিন্তু একটি সত্য আজও অপরিবর্তিত—মানুষ শেষ পর্যন্ত খাদ্যের কাছেই ফিরে আসে, আর খাদ্যের শুরু হয় মাটিতে।
একটি ছোট্ট বীজের ভেতর লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের জীবন, একটি সমাজের স্থিতি, একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
তাই কৃষিকে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যৎকে অবহেলা করা। কৃষককে অসম্মান করা মানে নিজের অস্তিত্বের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেওয়া।
আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কৃষি শুধু একটি পেশা নয়, বরং সম্মান, জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং মানবকল্যাণের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
মানুষ যতই আধুনিকতার শিখরে পৌঁছাক না কেন, তার অস্তিত্বের শিকড় শেষ পর্যন্ত প্রোথিত থাকবে মাটির গভীরেই। কারণ সভ্যতার শুরু হয়েছিল একটি বীজ থেকে, আর সভ্যতার ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে সেই বীজ, সেই কৃষক এবং সেই উর্বর মাটির ওপর।
মানবসভ্যতার ইতিহাস তাই মূলত কৃষির ইতিহাস—মাটি, মানুষ, পরিশ্রম এবং আশার ইতিহাস। যে জাতি তার কৃষিকে ভালোবাসে, কৃষককে সম্মান করে এবং খাদ্য উৎপাদনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়, ইতিহাসও একদিন সেই জাতিকে সমৃদ্ধি ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে।
লেখক: আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষক

