কওমি মাদরাসার ঐতিহ্য ও স্বকীয়তা
রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও অস্তিত্বের সংকট
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৪:১৭
গৌরবময় ঐতিহ্যের সামনে নতুন সংকট
বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলনে কওমি মাদরাসার একটি গৌরবোজ্জ্বল ও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এই ধারার শিক্ষাব্যবস্থা সবসময়ই শোষণের বিরুদ্ধে, অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষায় এক আপসহীন শক্তির নাম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কওমি মাদরাসা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘদিনের গৌরবময় ঐতিহ্য, অনন্য স্বকীয়তা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলছে। যে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর প্রত্যয় এই ধারার মূল শক্তি ছিল, সেখানে আজ এক ধরনের আপসকামিতা ও আদর্শিক নিষ্ক্রিয়তা দৃশ্যমান।
দেওবন্দের আদর্শ: স্বাধীনতার আপসহীন শিক্ষা
ইতিহাস সাক্ষী, কওমি মাদরাসার মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে দেওবন্দের মহান আদর্শের ওপর, যার প্রধানতম বৈশিষ্ট্যই ছিল—শত প্রলোভন বা চাপের মুখেও দ্বীনি আদর্শ ও স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো শক্তির কাছে মাথা নত না করা। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, কওমি মাদরাসার একটি বড় অংশ সমকালীন রাজনীতির গ্যাঁড়াকলে আটকে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার সমীকরণ ও সাময়িক মোহের পেছনে অন্ধভাবে ছুটে তারা নিজেদের স্বাধীন সত্ত্বাকে বিসর্জন দিচ্ছে।
রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি: স্বকীয়তা হারানোর পথ
রাজনীতির এই সস্তা লেজুড়বৃত্তি কওমি ধারাকে কেবল আদর্শিকভাবে দেউলিয়া করছে না, বরং তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত সামাজিক আস্থাকেও চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। যে শক্তি একসময় সমাজের দিকনির্দেশক ছিল, আজ তারা রাজনৈতিক ক্রীড়নক বা স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে—যা কওমি ধারার সোনালী ইতিহাসের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান।
তরুণ প্রজন্মের প্রতি আহ্বান
কওমির তরুণ শিক্ষার্থী, আলেম ও শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুদের প্রতি বিনীত আহ্বান—আমাদের এই আত্মবিসর্জনের ধারা এখনই রুখে দিতে হবে। স্বকীয়তা, ঐতিহ্য আর স্বাধীনতার মতো মৌলিক স্তম্ভগুলোকে যদি আমরা সাময়িক কোনো রাজনৈতিক লাভ বা ভয়ের কারণে বিসর্জন দিয়ে দিই, তবে এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। যে সমাজ বা আদর্শ নিজের মেরুদণ্ড সোজা রেখে কথা বলতে পারে না এবং অন্যের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নিজের মূল লক্ষ্য ভুলে যায়, সময়ের ব্যবধানে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত, প্রভাবহীন এবং চরমভাবে উপেক্ষিত হয়ে পড়ে। লেজুড়বৃত্তি কখনো কোনো আদর্শিক কাফেলাকে সম্মান এনে দিতে পারে না, বরং তা চিরতরে পঙ্গু করে দেয়।
আত্মসমালোচনা ও আত্মসংশোধনের সময়
আজকের এই ক্রান্তিকালে কওমি মাদরাসা সংশ্লিষ্ট প্রতিটি স্তরের মানুষকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে গভীর অবহেলা আর ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে। সময়ের দাবি হলো তীব্র আত্মোপলব্ধি ও আত্মসংশোধন। রাজনীতির মোহে অন্ধ না হয়ে যদি আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের রেখে যাওয়া আমানত, চেতনা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা পুনরুদ্ধার করতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
মেরুদণ্ড সোজা রাখার অঙ্গীকার
তাই আসুন, সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা সচেতন হই। কওমি মাদরাসার স্বকীয়তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় কোনো প্রকার রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি ও আপস আর নয়। সজাগ থাকো কওমি মাদরাসা, সজাগ থাকো কওমির সন্তানরা। নিজেদের অস্তিত্ব ও ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে হলে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইন্সটিটিউট ময়মনসিংহ

