Logo

ধর্ম

ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মহান ত্যাগ

Icon

জনি সিদ্দিক

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৪:৩৭

ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মহান ত্যাগ

​ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসে যে কয়েকটি ঘটনা মানবজাতিকে মর্মান্তিকভাবে অনুপ্রাণিত এবং অশ্রুসিক্ত করেছে, তার মধ্যে হিজরি ৬১ সনের ১০ই মহররমের কারবালার ঘটনা সর্বাগ্রে। ইরাকের ফোরাত নদীর তীরে কারবালার তপ্ত বালুকা প্রান্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় নাতি, জান্নাতের যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও বিশ্বস্ত সঙ্গীদের শাহাদাত ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। এটি কেবল সাধারণ কোনো সামরিক সংঘর্ষ ছিল না; বরং এটি ছিল সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায়, আদর্শ ও স্বৈরাচারের মধ্যকার সংগ্রাম। কারবালার মূল চেতনা হলো— অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের সর্বস্ব উৎসর্গ করার মহান ঈমানি শিক্ষা।

​১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও খিলাফতের আদর্শ

​কারবালার ট্র্যাজেডির মূল পটভূমি বুঝতে হলে তৎকালীন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতি জানা প্রয়োজন। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি ছিল ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ’ বা নবুয়তের আদলে খিলাফতের আদর্শ, যার মূল স্তম্ভ ছিল শুরা (পারস্পরিক পরামর্শ), সমতা, জবাবদিহিতা এবং যোগ্যতার নীতি। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে এই মহান আদর্শেরই পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যেত।

​তবে হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর ইন্তিকালের পর খিলাফতের এই চমৎকার ধারাটি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ে, যখন তাঁর পুত্র ইয়াজিদ দামেস্কের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। ইয়াজিদ ইসলামের পবিত্র ও সর্বজনীন খিলাফতের আসনটিকে একটি বংশানুক্রমিক ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে রূপান্তর করেন, যা ছিল ইসলামের মৌলিক সাম্য ও সুবিচারের পরিপন্থী। তৎকালীন যুগের অনেক বিশিষ্ট সাহাবি ও তাবেঈন ইয়াজিদের এই অনৈসলামিক শাসনপদ্ধতি, ব্যক্তিগত জীবনাচার এবং নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে তীব্র আপত্তি উত্থাপন করেন। তাঁদের দৃঢ় আশঙ্কা ছিল, খিলাফতের এই নৈতিক বিচ্যুতি ইসলামের মূল রূপ ও আদর্শকে চিরতরে বিকৃত করে দেবে। দামেস্কের অধিবাসীরা কোনোভাবেই ইয়াজিদের নেতৃত্ব মেনে নিতে চাননি। ইয়াজিদের এই সংকটময় মুহূর্তে ইমাম হোসাইন (রা.) উপলব্ধি করেন যে, সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে নীরব থাকা আল্লাহর রাসুলের নাতি হিসেবে তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তিনি ইয়াজিদের কবল থেকে ইসলামের মৌলিক আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন।

​২. কুফাবাসীদের আহ্বান এবং ইমামের যাত্রা

​ইয়াজিদ ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই মদিনার তৎকালীন গভর্নর ওয়ালিদ ইবনে উতবাহর মাধ্যমে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর নিকট আনুগত্যের শপথ বা বাইয়াত দাবি করে। মদিনার প্রাক্তন গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হাকামও ইমামের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য গভর্নরের ওপর প্রভাব বিস্তার করছিলেন। কিন্তু ইমাম হোসাইন (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে সেই অন্যায় বাইয়াত প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, ইয়াজিদের মতো একজন স্বৈরাচারী ও শরিয়তের আদর্শচ্যুত শাসকের আনুগত্য স্বীকার করার অর্থ হলো অন্যায় ও অধর্মকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া। আর সেটা তাঁর পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

​এরপর ইয়াজিদের হুমকি-ধমকির কারণে মদিনায় তাঁর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তিনি মদিনা ত্যাগ করে পবিত্র মক্কায় সাময়িক আশ্রয় গ্রহণ করেন। এই সময় ইরাকের কুফা নগরী থেকে শত শত চিঠি তাঁর নিকট পৌঁছাতে শুরু করে। কুফাবাসীরা ইয়াজিদের অত্যাচারী শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে ইমামকে সেখানে আসার আকুল অনুরোধ জানায় এবং সত্যের পক্ষে তাঁর সর্বাত্মক নেতৃত্বের প্রতি সমর্থনের আশ্বাস দেয়। কুফাবাসীদের এই আহ্বানের আন্তরিকতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে ইমাম তাঁর চাচাতো ভাই হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে কুফায় প্রেরণ করেন। প্রাথমিকভাবে কুফার হাজার হাজার মানুষ তাঁর হাতে ইমামের পক্ষে বাইয়াত গ্রহণ করে। কিন্তু এই খবর দামেস্কে পৌঁছালে ইয়াজিদের নিষ্ঠুর গভর্নর উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদ কুফায় এসে চরম দমনপীড়ন ও নৃশংসতা শুরু করে। ফলশ্রুতিতে, ভীতি ও প্রলোভনের মুখে কুফাবাসীদের একটি বড় অংশ তাদের অঙ্গীকার থেকে সরে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে অত্যন্ত নির্মমভাবে হযরত মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে শহীদ করা হয়। তবে সৌভাগ্যক্রমে মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) মৃত্যুর আগেই কুফাবাসীর বিশ্বাসঘাতকতার বিষয়ে একটি চিঠি লিখে ইমামের নিকট পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চিঠি পাওয়ার আগেই ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার-পরিজন, নারী ও শিশুদের নিয়ে মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেছিলেন। সাথে নেন বিশ্বস্ত কয়েকজন সহচর ও যোদ্ধা।

​৩. কারবালার অবরোধ ও আত্মত্যাগ

​হিজরি ৬১ সনের ২রা মহররম ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পরিবার, নারী, শিশু এবং অনুসারীসহ মাত্র ৭২ জনের একটি ছোট কাফেলা নিয়ে কারবালার প্রান্তরে পৌঁছান। এ খবর ইয়াজিদের কানে পৌঁছামাত্রই সেখানে উবাইদুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশনায় ইয়াজিদপন্থী এক বিশাল ও অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনী প্রেরণ করা হয়। নির্দয় সে বাহিনী এসে তাঁদের চারপাশ থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে। এরপর একসময় ফোরাত নদী থেকে ইমামের শিবিরের পানি সরবরাহের পথও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তপ্ত মরুভূমির প্রচণ্ড উত্তাপ এবং পানির তীব্র সংকটে ছোট ছোট অবুঝ শিশু, নারী ও পুরুষেরা চরম কষ্টের সম্মুখীন হন। তৃষ্ণার্ত শিশুদের কান্নায় কারবালার ফোরাত কূলের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। কিন্তু এই অবর্ণনীয় এবং হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতেও ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গীরা ধৈর্য, বীরত্ব ও ঈমানের এক অনন্য ও অটল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। অসহায় নারী-শিশুদের এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেও সেদিন ইয়াজিদ বাহিনীর পাষাণ সেনারা বিচলিত হয়নি। ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের চরম ধৈর্য দেখে ইয়াজিদ বাহিনী আর সহ্য করতে পারেনি। এরপর ১০ মহররম তথা আশুরার দিনে ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতি ওমর ইবনে সাদ ইমামকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেয়, যা ইমাম সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

​ইমামের দৃঢ়, অনড় মন-মানসিকতা দেখে বিরক্ত হয়ে ইয়াজিদ বাহিনী যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর শুরু হয় এক অসম কিন্তু বীরত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক লড়াই। ইমামের অল্পসংখ্যক সঙ্গী এক বিশাল সুসজ্জিত বাহিনীর বিরুদ্ধে আল্লাহর ওপর ভরসা করে লড়াইয়ে নামেন। একে একে ইমামের ভাই হযরত আব্বাস (রা.), বীরপুত্র আলী আকবর (রা.) এবং তৃষ্ণার্ত ছয় মাসের শিশুপুত্র আলী আসগরসহ বহু প্রিয়জন তাঁর চোখের সামনে শহীদ হন। অবশেষে জোহরের সালাত আদায়ের পর, সীমার নামক পাষাণের নির্দেশে ও তরবারির আঘাতে সেজদারত অবস্থায় অকুতোভয় এই মহান নায়ক শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ ইসলামের ইতিহাসে এক অনন্য ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য হিসেবে অমর হয়ে যায়।

​৪. কারবালার মূল চেতনা ও ঈমানি শিক্ষা

​অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতা: কারবালার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— অন্যায় বা অসত্য যত শক্তিশালী বা সংখ্যায় যত বেশিই হোক না কেন, তার সামনে কখনও মাথা নত করা যাবে না। নিজের জীবন বিপন্ন হলেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকা একজন প্রকৃত মুমিনের প্রধান দায়িত্ব।

​জীবনের চেয়ে আদর্শের মূল্য বেশি: ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর কর্মের মাধ্যমে দেখিয়ে গেছেন যে, আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে পার্থিব লাভ-লোকসান বা জীবনের নিরাপত্তা কখনোই মুখ্য হতে পারে না। ইসলামের শাশ্বত রূপকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।

​বিপদে ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি তাওয়াক্কুল: চরম প্রতিকূল অবস্থা, প্রিয়জনদের মৃত্যু এবং তৃষ্ণার যন্ত্রণার মধ্যেও ইমাম হোসাইন (রা.) বা তাঁর পরিবারের সদস্যরা আল্লাহর প্রতি আস্থা হারাননি। কারবালা আমাদের চরম বিপদেও ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং ঈমানি দৃঢ়তার শিক্ষা দেয়। যা আমাদের বর্তমান যুগের দায়ীদের জন্য প্রেরণাদায়ক।

​দায়িত্ববোধ ও নৈতিক নেতৃত্ব: কারবালার ট্র্যাজেডি প্রমাণ করে যে, একজন সত্যনিষ্ঠ ও আদর্শবান নেতা কখনো নিজের স্বার্থের জন্য অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেন না। ব্যক্তিগত জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ, উম্মাহ ও মানবতার কল্যাণকে প্রাধান্য দেন।

​৫. সমসাময়িক বিশ্বে হোসাইনি চেতনার প্রাসঙ্গিকতা

​বর্তমান অতি আধুনিক পৃথিবী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানবসমাজ এখনো নানা ধরনের অবিচার, বৈষম্য, দুর্নীতি, শোষণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি। এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কারবালার শিক্ষা ও হোসাইনি চেতনা আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যক্তিগত জীবনে সততা ও নৈতিকতা বজায় রাখা, কর্মক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া, সমাজে শোষিত ও মজলুম মানুষের অধিকার রক্ষা করা এবং স্বৈরাচারী মানসিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া—এসবই হলো হোসাইনি চেতনার প্রকৃত বাস্তব প্রয়োগ। ইমাম হোসাইন (রা.)-এর এই মহান আদর্শ কেবল মুসলমানদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা পৃথিবীর সকল ন্যায়পরায়ণ, স্বাধীনতাপ্রিয় এবং বিবেকবান মানুষের জন্য একটি সর্বজনীন ও অনুকরণীয় আদর্শ। তাঁর এই মহিমান্বিত ত্যাগ যুগে যুগে মহাত্মা গান্ধী ও নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বিশ্বের বড় বড় মনীষী ও চিন্তাবিদকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং অন্যায় ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে আজও বিশ্ববাসীকে আলো দেখাচ্ছে।

শেষ কথা

কারবালা পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিনের জন্য প্রমাণ করে গেছে যে, অস্ত্রের শক্তি বা পাশবিক বলের চেয়ে ঈমানের শক্তি এবং নৈতিক আদর্শের শক্তি অনেক বেশি স্থায়ী, প্রভাবশালী ও অপরাজেয়। ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর পবিত্র রক্তের বিনিময়ে মানবজাতিকে শিখিয়ে গেছেন— সত্যের পথ যতই কঠিন, কণ্টকাকীর্ণ বা একাকী হোক না কেন, ন্যায় ও আদর্শের সেই সংগ্রাম কখনো বৃথা যায় না।

লেখক: প্রাবন্ধিক; দক্ষিণ সালনা, গাজীপুর। ইমেইল: jony90siddique@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন