Logo

ধর্ম

সেবককে মানুষ ভাবুন

Icon

মুফতি মুহাম্মাদ ইয়াসীন

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪৮

সেবককে মানুষ ভাবুন

মানুষ কখনোই একা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। জীবনের প্রতিটি স্তরে তাকে অন্য মানুষের সহযোগিতা নিতে হয়। কেউ কারও শিক্ষক, কেউ সহচর, কেউ শ্রমিক, কেউ সহকারী, কেউ খাদেম। সভ্যতার চাকা মূলত পারস্পরিক সহযোগিতার উপরই আবর্তিত হয়। ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, কর্তা-সহকারী— সবার মিলিত প্রয়াসেই গড়ে ওঠে মানবজীবনের ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো।

ইসলাম মানুষের এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে অস্বীকার করেনি; বরং একে স্বীকৃতি দিয়েছে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল নীতিমালার মাধ্যমে। তাই যে সকল কাজে অন্যের সহযোগিতা গ্রহণের প্রয়োজন হয়, সেখানে ইসলাম বৈধ উপায়ে সেবা গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। যেমনিভাবে অতীতে ক্রীতদাসের খেদমত গ্রহণ করা হতো, তেমনিভাবে স্বাধীন মানুষ থেকেও নির্ধারিত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেবা গ্রহণের অনুমতি রয়েছে। তবে ইসলাম শুধু সেবা গ্রহণের অনুমতি দিয়েই থেমে থাকেনি; বরং সেবাদাতার অধিকার, সম্মান ও মানবিক মর্যাদাকেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

হজরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে উপদেশ দিয়ে বলেন, “যখন তুমি গনিমতের মাল মানুষদের মাঝে বণ্টন হতে দেখবে, তখন তা হতে তোমার জন্য একটি খাদেম এবং আল্লাহর পথে ব্যবহারের জন্য একটি বাহনই যথেষ্ট মনে করবে।”(সুনানুন নাসায়ি: ৫৩৭২)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, প্রয়োজনের তাগিদে সেবক রাখা বা সহযোগী গ্রহণ করা বৈধ। কিন্তু সেই বৈধতার আড়ালে যেন জুলুম, কঠোরতা ও অহংকার স্থান না পায়— ইসলাম সে ব্যাপারেও অত্যন্ত সতর্ক করেছে।

আজকের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, অনেক মানুষ গৃহকর্মী, ড্রাইভার, কর্মচারী কিংবা শ্রমিকদেরকে মানুষ হিসেবে নয়; বরং যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে। তাদের ক্লান্তি নেই, অনুভূতি নেই, দুঃখ নেই— যেন এমনটাই ধরে নেওয়া হয়। সামান্য ভুলে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, রূঢ় আচরণ, কখনো শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। অথচ ইসলাম বহু আগেই এ ধরনের নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেছে।

সেবকও একজন মানুষ। তারও ক্ষুধা লাগে, শরীর ক্লান্ত হয়, মন ভাঙে, হৃদয় কষ্ট পায়। তাই তার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ চাপিয়ে দেওয়া, তার প্রতি রূঢ় হওয়া কিংবা তাকে অপমান করা ইসলামি শিক্ষা পরিপন্থী।

হজরত সুওয়াইদ ইবনু মুকরিন আল-মুজানি রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “আমরা সাত ভাই ছিলাম। আমাদের মাত্র একজন খাদেম ছিল। আমাদের এক ভাই তাকে থাপ্পড় মারে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিলেন তাকে মুক্ত করে দিতে।” (তিরমিজি: ১৫৪২)

একটি থাপ্পড়ের প্রতিক্রিয়ায় একজন খাদেমকে মুক্ত করে দেওয়ার নির্দেশ— এ ঘটনা ইসলামের দৃষ্টিতে সেবকের মর্যাদা কত উচ্চে, তা স্পষ্ট করে দেয়। আজ যেখানে নির্যাতনকে অনেকেই স্বাভাবিক মনে করে, সেখানে দয়াল নবিজির শিক্ষা মানুষকে শিখিয়েছে— অধীনস্থ মানুষের উপর ক্ষমতা দেখানো নয়, বরং দয়া ও সহমর্মিতাই তাদের প্রাপ্য।

হজরত আবু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “আমি আমার এক গোলামকে প্রহার করছিলাম। এমন সময় পিছন থেকে একটি আওয়াজ শুনলাম— ‘হে আবু মাসউদ! জেনে রাখো, আল্লাহ তোমার উপর তার চেয়েও অধিক ক্ষমতাবান, যতটা তুমি এ গোলামের উপর ক্ষমতাবান।’ আমি ফিরে তাকিয়ে দেখি, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম— ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমি তাকে মুক্ত করে দিলাম। তখন তিনি বললেন, তুমি যদি তা না করতে, তবে জাহান্নামের আগুন তোমাকে স্পর্শ করত। (সহিহ মুসলিম: ১৬৫৯)

কী ভয়াবহ সতর্কবাণী! একজন দুর্বল মানুষের উপর অন্যায়ভাবে হাত তোলা আল্লাহর নিকট কত বড় অপরাধ— এই হাদিস তার জীবন্ত দলিল। ক্ষমতা মানুষকে উদ্ধত করে তোলে, কিন্তু ইসলাম ক্ষমতার মাঝেও বিনয় ও জবাবদিহিতার শিক্ষা দেয়।

আর সেবকের প্রতি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিজের আচরণ ছিল মানবতার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন— “আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করেছি। এ সময়ে তিনি কখনো আমাকে ‘উহ’ শব্দটিও বলেননি। আমি কোনো কাজ করলে জিজ্ঞেস করেননি— কেন করলে? আর কোনো কাজ না করলে বলেননি— কেন করলে না? (সহিহ বুখারি: ৬০৩৮)

ভাবা যায়! দশটি দীর্ঘ বছর— অথচ একটি তিরস্কারও নয়! এটি শুধু একজন মহান নেতার চরিত্র নয়; বরং মানবতার এক অতুলনীয় আদর্শ। আজ পরিবারে, কর্মস্থলে, সমাজে— সামান্য ভুলেই মানুষ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। অথচ নবিজির শিক্ষা হলো ধৈর্য, কোমলতা ও ভালোবাসা।

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন— “আল্লাহর পথে জিহাদ ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজের হাতে কাউকে প্রহার করেননি; না কোনো দাস-দাসীকে, না কোনো স্ত্রীলোককে। (আবু দাউদ: ৪৭৮৮)

এ শিক্ষা শুধু সপ্তম শতাব্দীর আরবের জন্য নয়; বরং আজকের পৃথিবীর প্রতিটি ঘর, অফিস, কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের জন্য সমান প্রযোজ্য। যে ব্যক্তি তার অধীনস্থ মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করে, সে কেবল একজন ভালো মালিক নয়; বরং একজন উত্তম মুমিনও বটে।

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে— সেবককে ছোট করে নয়, মানুষ হিসেবে দেখতে। তাকে অবজ্ঞা নয়, সম্মান দিতে। কারণ মর্যাদা কেবল পদবির দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং মানবিকতার দ্বারাই মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়।

আজ সমাজে মানবিক সম্পর্কের যে অবক্ষয়, তার একটি বড় কারণ হলো— আমরা ক্ষমতাকে দয়া দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে ভুলে গেছি। অথচ দয়াল নবিজির জীবন আমাদের শেখায়, মানুষের হৃদয় জয় করা যায় কঠোরতা দিয়ে নয়; বরং কোমলতা, সহমর্মিতা ও উত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে।

সেবকের ঘামে কেবল শ্রমের গন্ধ নয়, সেখানে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বস্তি, একটি জীবনের সংগ্রাম এবং একটি মানুষের নীরব আত্মত্যাগ। তাই যারা আমাদের সেবা করে, তাদের প্রতি উত্তম আচরণ করা কেবল সামাজিক ভদ্রতা নয়; এটি ঈমানি দায়িত্বও বটে।

লেখক: মুহাদ্দিস, দিলু রোড মাদ্রাসা, নিউ ইস্কাটন, ঢাকা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন