Logo

ধর্ম

খেলাধুলার শরয়ি বিধান ও ইসলামের সীমারেখা

Icon

মুফতি উবায়দুল হক খান

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৩

খেলাধুলার শরয়ি বিধান ও ইসলামের সীমারেখা

মানুষের জীবন শুধু ইবাদত-বন্দেগি বা কর্মব্যস্ততার নাম নয়; বরং এর সঙ্গে রয়েছে বিনোদন, বিশ্রাম ও শারীরিক সুস্থতার প্রয়োজনীয়তা। ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। তাই ইসলামে খেলাধুলা ও শরীরচর্চাকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং এমন খেলাধুলাকে উৎসাহিত করা হয়েছে, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক এবং শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে পরিচালিত হয়। তবে যে খেলাধুলা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে, নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দেয় কিংবা হারাম কাজে জড়িয়ে ফেলে, ইসলাম তা সমর্থন করে না।

খেলাধুলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। শিশুকাল থেকে মানুষ খেলাধুলার মাধ্যমে শারীরিক দক্ষতা অর্জন করে, মানসিক প্রশান্তি লাভ করে এবং সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করে। ইসলাম এই স্বাভাবিক চাহিদাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মহানবী (সা.) নিজেও বিভিন্ন বৈধ খেলাধুলা ও শরীরচর্চায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরামকে উৎসাহিত করেছেন।

হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রী হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। প্রথমবার আয়েশা (রা.) জয়ী হন, পরে আরেকবার রাসুলুল্লাহ (সা.) জয়ী হয়ে মৃদু হাস্যরসে বলেন, 'এটি ওইবারের বদলা।' এ ঘটনা প্রমাণ করে, শরিয়তের সীমারেখা বজায় রেখে বিনোদন ও খেলাধুলা বৈধ।

ইসলামে কিছু খেলাধুলাকে বিশেষভাবে প্রশংসা করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, 'তোমরা তিরন্দাজি শিক্ষা করো, ঘোড়ায় চড়ো এবং সাঁতার শেখো।' এসব খেলাধুলা শুধু বিনোদন নয়; বরং এগুলো শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং আত্মরক্ষার যোগ্যতা সৃষ্টি করে। তাই ইসলামে এমন খেলাধুলা অধিক প্রশংসনীয়, যা ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণে আসে। তবে খেলাধুলা বৈধ হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। প্রথমত, খেলাধুলা এমন হতে হবে, যাতে ফরজ বা ওয়াজিব ইবাদত নষ্ট না হয়। আজকাল দেখা যায়, কোনো খেলা বা টুর্নামেন্টের কারণে মানুষ নামাজ ছেড়ে দেয় বা সময়মতো আদায় করে না। অনেকেই রাত জেগে খেলা দেখে ফজরের নামাজ পর্যন্ত কাজা করে ফেলে। এটি নিঃসন্দেহে গুনাহের কাজ। যে খেলাধুলা মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তা বৈধ বিনোদনের পর্যায়ে থাকে না।

দ্বিতীয়ত: খেলাধুলায় অশ্লীলতা বা পর্দাহীনতা থাকা যাবে না। বর্তমান যুগের অনেক খেলায় নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, শরীর প্রদর্শন এবং অশালীন পোশাক দেখা যায়। ইসলাম শালীনতা ও লজ্জাশীলতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করেছে। তাই এমন কোনো খেলাধুলা, যেখানে শরিয়তের পর্দাবিধান লঙ্ঘিত হয় কিংবা অশ্লীলতার প্রসার ঘটে, তা জায়েজ নয়।

তৃতীয়ত: খেলাধুলায় জুয়া বা বাজি ধরা সম্পূর্ণ হারাম। বর্তমানে বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরা, অনলাইন বেটিং কিংবা জুয়ার প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অথচ পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা মদ ও জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই যে খেলাধুলা জুয়া বা বাজির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তা কোনোভাবেই বৈধ হতে পারে না।

চতুর্থত: খেলাধুলা এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে মানুষের জানমাল বা স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ইসলাম মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। তাই এমন খেলাধুলা, যেখানে অযৌক্তিকভাবে প্রাণহানির ঝুঁকি বা স্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তা পরিহার করা উচিত।

আধুনিক যুগে খেলাধুলা অনেক সময় বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে অন্ধ ভক্তি ও উন্মাদনার রূপ নিয়েছে। কোনো দল হারলে মারামারি, গালাগালি, ভাঙচুর কিংবা সামাজিক সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। আবার অনেক মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা দেখে সময় নষ্ট করছে, অথচ পরিবার, সমাজ কিংবা দ্বীনের দায়িত্ব পালনে উদাসীন হয়ে পড়ছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অনুচিত। কারণ মুসলমানের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। সে তার সময়কে কল্যাণকর কাজে ব্যয় করবে - এবং প্রয়োজনীয় বিনোদনের মাধ্যমে নিজেকে সতেজ রাখবে।

অনেক আলেম বলেন, খেলাধুলা মূলত মুবাহ বা বৈধ কাজ। তবে এর সঙ্গে যদি নেক উদ্দেশ্য যুক্ত হয়, যেমন শরীর সুস্থ রাখা, আত্মরক্ষার দক্ষতা অর্জন করা কিংবা কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা, - তাহলে তা সওয়াবের কাজেও পরিণত হতে পারে। আবার এর সঙ্গে যদি গুনাহ যুক্ত হয়, তাহলে সেটি হারাম হয়ে যায়। অর্থাৎ খেলাধুলার বিধান একক নয়; বরং এর ধরন, উদ্দেশ্য ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে।

শিশুদের খেলাধুলার ব্যাপারেও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ইতিবাচক। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলা প্রয়োজন। মহানবী (সা.) শিশুদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন এবং তাদের স্বাভাবিক আনন্দ-উচ্ছ্বাসকে বাধাগ্রস্ত করতেন না। তাই শিশুদের এমন খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে, যা তাদের চরিত্র গঠনে সহায়ক এবং নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বর্তমান সময়ে মোবাইল ও ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন গেমের প্রতি তরুণদের আসক্তি উদ্বেগজনক। অনেক গেমে সহিংসতা, অশ্লীলতা, জুয়া কিংবা সময়ের অপচয় জড়িয়ে থাকে। ফলে শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়, ইবাদতে অনীহা সৃষ্টি হয় এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই এসব গেমের ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরি। কোনো গেম যদি হারাম বিষয়বস্তু থেকে মুক্ত থাকে, সময়ের অপচয় না ঘটায় এবং প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি না করে, তাহলে তা সীমিত পরিসরে বৈধ হতে পারে।

ইসলাম খেলাধুলার বিরোধী নয়; বরং সুস্থ, শালীন ও উপকারী খেলাধুলার সমর্থক। যে খেলাধুলা শরীরকে সুস্থ রাখে, মনকে প্রফুল্ল করে এবং সমাজের কল্যাণে আসে, ইসলাম তাকে স্বাগত জানায়। পক্ষান্তরে যে খেলাধুলা মানুষকে ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, অশ্লীলতা ও জুয়ার প্রসার ঘটায় কিংবা সময়ের অপচয় করে, ইসলাম তা নিষিদ্ধ করেছে। তাই একজন মুসলমানের উচিত খেলাধুলার ক্ষেত্রে শরিয়তের নির্দেশনা মেনে চলা এবং এমন বিনোদন বেছে নেওয়া, যা তার দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের কল্যাণকর। জন্য এভাবেই খেলাধুলা শুধু বিনোদনের মাধ্যম না হয়ে ইবাদত ও কল্যাণের উপকরণে পরিণত হতে পারে।

পরিশেষে বলবো, খেলাধুলার নামে কোনো ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদ বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো ইসলাম সমর্থন করে না। অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বা ঘরোয়া টুর্নামেন্টে প্রিয় দলের প্রতি অন্ধ সমর্থনের কারণে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। অন্য দেশ, জাতি বা বর্ণের মানুষকে কটুক্তি, উপহাস ও চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। শরিয়তে এসবের সুযোগ নেই। ইসলামে উপহাস, বর্ণবাদ ও অহংকারকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আরবের ওপর কোনো অনারবের কিংবা অনারবের ওপর কোনো আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তাই খেলার মাঠ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোথাও বিনোদনের ছলে অন্য কোনো মুসলিম ভাই বা কোনো জনগোষ্ঠীকে অপমান করা শরিয়তের পরিপন্থী।

সব ধরনের দাঙা হাঙামা ও শরিয়ত পরিপন্থী সকল প্রকার খেলাধুলা থেকে আল্লাহ পাক আমাদের দূরে থাকার তাওফিক দান করুন।

লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন