ইসলাম মানুষের স্বভাবজাত অনুভূতি ও চরিত্রকে অস্বীকার করে না; বরং সেগুলোকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। মানুষের মধ্যে যেমন ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতি রয়েছে, তেমনি রয়েছে আত্মমর্যাদাবোধ, গায়রাত ও সম্মানবোধ। আবার মানুষের মধ্যে অহংকার ও আত্মগর্বের প্রবণতাও দেখা যায়। ইসলাম এসব গুণ ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে কল্যাণের পথে ব্যবহার করতে শিক্ষা দেয়। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) গায়রাত ও অহংকার সম্পর্কে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও গভীর দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন।
হজরত জাবির ইবনে আতীক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'গায়রাতের কিছু অংশ এমন আছে যা আল্লাহ ভালোবাসেন, আর কিছু অংশ এমন আছে যা আল্লাহ অপছন্দ করেন। আল্লাহ যে গায়রাত ভালোবাসেন তা হলো সন্দেহের ক্ষেত্রে গায়রাত করা। আর যে গায়রাত আল্লাহ অপছন্দ করেন তা হলো কোনো সন্দেহ বা কারণ ছাড়াই গায়রাত করা।
আবার অহংকারেরও কিছু অংশ আছে যা আল্লাহ অপছন্দ করেন এবং কিছু অংশ আছে যা আল্লাহ ভালোবাসেন। আল্লাহ যে অহংকার ভালোবাসেন তা হলো যুদ্ধের সময় এবং সদকা করার সময় দৃঢ়তা ও মর্যাদাবোধ প্রকাশ করা। আর যে অহংকার আল্লাহ অপছন্দ করেন তা হলো গর্ব ও আত্মপ্রশংসার অহংকার।' [মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নং : ৩৩১৯]
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. মানুষের দুটি গুরুত্বপূর্ণ আবেগ-গায়রাত ও অহংকার-সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন।
গায়রাত বলতে বোঝায় নিজের সম্মান, পরিবার, দ্বীন ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য অন্তরে জাগ্রত আত্মমর্যাদাবোধ ও সংবেদনশীলতা। একজন মুমিন কখনো নির্লজ্জ হতে পারে না। সে নিজের স্ত্রী, সন্তান, পরিবার এবং সমাজে অশ্লীলতা ও অন্যায়ের বিস্তার দেখে নিশ্চুপ থাকতে পারে না। যখন কেউ তার পরিবার বা দ্বীনের মর্যাদার ওপর আঘাত হানে, তখন তার অন্তরে প্রতিবাদের যে অনুভূতি সৃষ্টি হয়, সেটিই গায়রাত।
ইসলাম এই গায়রাতকে অত্যন্ত মূল্যবান গুণ হিসেবে বিবেচনা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'আল্লাহর চেয়েও অধিক গায়রাতশীল আর কেউ নেই।' অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে দূরে রাখতে চান। তাই একজন মুমিনের মধ্যেও গায়রাত থাকা আবশ্যক।
তবে গায়রাতের নামে অন্ধ সন্দেহ, কুধারণা ও অন্যায় আচরণ ইসলাম সমর্থন করে না। বর্তমান সমাজে অনেক মানুষ সামান্য বিষয়েও স্ত্রী, সন্তান বা আত্মীয়-স্বজনের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে।
প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলে, অপমান করে এবং কখনো কখনো নির্যাতনের পথও বেছে নেয়। হাদিসে এটিকেই আল্লাহর অপছন্দনীয় গায়রাত বলা হয়েছে। কারণ অকারণে সন্দেহ পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে দেয়।
কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, 'হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা ও সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় কিছু ধারণা গুনাহ।' [সুরা হুজুরাত: ১২] তাই প্রকৃত মুমিন কখনো ভিত্তিহীন সন্দেহে আক্রান্ত হয় না; বরং সত্যতা যাচাই করে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
হাদিসের দ্বিতীয় অংশে অহংকার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণভাবে অহংকার একটি নিন্দনীয় গুণ। অহংকারই ছিল শয়তানের পতনের মূল কারণ। সে আদম (আ.)-কে সিজদা করতে অস্বীকার করে বলেছিল, 'আমি তার চেয়ে উত্তম।' এই আত্মগর্ব তাকে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করেছিল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। কারণ অহংকার মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে এবং অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করতে শেখায়। যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ, জ্ঞান, বংশমর্যাদা বা ক্ষমতা নিয়ে গর্ব করে, সে আল্লাহর অপছন্দের কাজে লিপ্ত হয়।
তবে ইসলাম এমন কিছু পরিস্থিতিতে দৃঢ়তা ও মর্যাদাবোধকে প্রশংসা করেছে, যা বাহ্যিকভাবে অহংকারের মতো মনে হতে পারে। যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর সামনে সাহসিকতা ও আত্মবিশ্বাস প্রদর্শন করা। এটি দুর্বলতা নয়; বরং মুসলিম শক্তির প্রকাশ। একইভাবে সদকা বা দান করার সময় দাতার মনে যে আত্মতৃপ্তি ও সম্মানবোধ সৃষ্টি হয়, তা আল্লাহর কাছে প্রিয়। কারণ সে তখন আল্লাহর দেওয়া সম্পদ তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করছে।
এখানে অহংকার বলতে আত্মগর্ব নয়; বরং আত্মবিশ্বাস, দৃঢ়তা ও মর্যাদার প্রকাশ বোঝানো হয়েছে। ইসলাম চায় মুসলমান বিনয়ী হবে, কিন্তু দুর্বলচেতা হবে না; নম্র হবে, কিন্তু আত্মমর্যাদাহীন হবে না; দয়ালু হবে, কিন্তু অন্যায়ের কাছে মাথানত করবে না।
বর্তমান সমাজে এই হাদিসের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একদিকে আমরা দেখি নির্লজ্জতা ও বেহায়াপনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক মানুষ দ্বীন ও নৈতিকতার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে কিছু মানুষ গায়রাতের নামে অকারণ সন্দেহ ও কঠোরতার আশ্রয় নিচ্ছে। আবার কেউ কেউ সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে অহংকারে মত্ত হয়ে পড়ছে।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, প্রকৃত গায়রাত হলো দ্বীন, পরিবার ও নৈতিকতা রক্ষায় সচেতন থাকা; আর প্রকৃত বিনয় হলো অহংকার ত্যাগ করে আল্লাহর সামনে নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করা। একই সঙ্গে প্রয়োজনের সময় দৃঢ়তা, সাহস ও আত্মমর্যাদা প্রদর্শন করাও ঈমানের অংশ।
অতএব, একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো গায়রাতকে ন্যায় ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিচালিত করা এবং অহংকার থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। সে এমন জীবন গঠন করবে যেখানে থাকবে বিনয়, আত্মমর্যাদা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি। তাহলেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবে। এই হাদিস আমাদের সেই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার দিকেই আহ্বান জানায়।
লেখক: মুহাদ্দিস ও শিক্ষাসচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর

