Logo

ধর্ম

ইন্দ্রীয় থেকে ওহী: মানুষের জ্ঞানের যাত্রার মাধ্যমসমূহ

Icon

মামুনুল হক

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১৬:৪১

ইন্দ্রীয় থেকে ওহী: মানুষের জ্ঞানের যাত্রার মাধ্যমসমূহ

পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি প্রাণীর জন্ম হচ্ছে এক চিরন্তন নিয়তি ও কিছু প্রকৃতিগত সহজাত প্রবৃত্তি ধারণ করে। জন্মের পরেই ক্ষুধার তাড়নায় মায়ের দুধ পান কিংবা অবধারিত শত্রু দেখে আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যাওয়ার যে অদ্ভুত ও নিখুঁত ক্ষমতা তা সৃষ্টিকর্তা তাদের প্রবৃত্তির মাঝে স্থাপন করে দিয়েছেন।

তবে এই প্রাণিকুলের জীবনধারা এক অদ্ভুত স্থবিরতায়সীমাবদ্ধ। জন্মের পর থেকে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তাদের এই সহজাত বৃত্তের বাইরে নতুন কোনো প্রজ্ঞা দর্শন বা সভ্যতার বিকাশ ঘটে না। প্রাচীন একটা হাতি কিংবা মাটির নিচের একটি ক্ষুদ্র পিঁপড়ে আজও ঠিক সেভাবেই জীবনধারণ করে, যেভাবে কোটি বছর আগে তাদের আদি পূর্বসূরিরা করত।

তারা কোনো নতুন তথ্যের অন্বেষণ করে না জন্ম দেয় না কোনো মহৎ দর্শনের। নিজেদের অতীত সংশোধন করে নতুন কোনো উন্নত জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার সামর্থ্যও তাদের নেই। তাদের জ্ঞান ও কর্মের পরিধি সৃষ্টিকর্তার বেঁধে দেওয়া এক অলঙ্ঘনীয় সীমানায় আবদ্ধ। যেখানে পরিবর্তনের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল টিকে থাকার আদিম পুনরাবৃত্তি।

মেধার শূন্যতা থেকে প্রজ্ঞার চূড়ায়

প্রাণীকুলের এই স্থবিরতা ও সীমাবদ্ধতার বিপরীতে মানুষ এক অনন্য বিস্ময়কর সৃষ্টি। জগতের অন্যান্য প্রাণী যেখানে জন্মলগ্নেই একধরণের পূর্ণতা নিয়ে আসে মানুষ সেখানে আসে পরম শূন্যতা নিয়ে। জন্মের প্রথম প্রহরে মানবশিশু একবারে অবুঝ মেধার দিক থেকে সম্পূর্ণ রিক্ত ও পরনির্ভরশীল।

কিন্তু এই শূন্যতাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। সময়ের আবর্তে মানুষ তার চারপাশ থেকে ধীরে ধীরে এমন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বোধের অধিকারী হয় যা তাকে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব বা আশরাফুল মাখলুকাত-এর আসনে সমাসীন করে।

এখানেই আদিম এক প্রশ্ন জাগে যে মানুষ জন্মাল সম্পূর্ণ শূন্য হাত নিয়ে সে কীভাবে ধাপে ধাপে এই পরম সত্য জ্ঞান লাভ করে? তার এই জ্ঞান অন্বেষণের উৎস বা মাধ্যমগুলো আসলে কী কী? গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে মানুষের জ্ঞান অর্জনের প্রধান চারটি মাধ্যম আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়:

সুস্থ পঞ্চেন্দ্রিয় শ্রবণ শক্তি, দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণ শক্তি, স্বাদ গ্রহণ শক্তি, স্পর্শ শক্তি। মানুষ বাহ্যিক জগতের প্রথম জ্ঞান লাভ করে তার পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। এর দ্বারা আমরা রঙ দেখি শব্দ শুনি, স্বাদ নেই, ঘ্রাণ পাই এবং স্পর্শ অনুভব করি। বিজ্ঞান ও দর্শনের ভাষায় একে বলা হয় ‘অভিজ্ঞতাবাদ’। তবে এই ইন্দ্রিয়কেন্দ্রিক জ্ঞান তখনই সঠিক তথ্য দেয় যখন ইন্দ্রিয়গুলো সম্পূর্ণ সুস্থ থাকে।

আকলে সালিম তথা, বিশুদ্ধ আকল: যা কোন কিছু বিশ্লেষণ করে বা আলামত দেখে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কারণ, মানুষ কেবল পশুর মতো দেখেই ক্ষান্ত হয় না বরং সে যা দেখে তা নিয়ে চিন্তা করে। এখানেই মানুষের ‘আকল’ বা বিবেকের কাজ। আমাদের আকল দুইভাবে কাজ করে: স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞান: কিছু বিষয় বুঝতে মানুষের কোনো চিন্তার প্রয়োজন হয় না। যেমন পুরো একটি আপেল তার একটা টুকরোর চেয়ে বড় হবে কিংবা এক সংখ্যাটি দুইয়ের অর্ধেক, এগুলো মানুষ সহজাতভাবেই বোঝে।

গবেষণালব্ধ জ্ঞান: এই মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল আবর্তন গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি দেখে মানুষ যখন চিন্তা করে যে, ‘এই নিখুঁত ব্যবস্থার পেছনে নিশ্চয়ই একজন মহান পরিচালক বা সৃষ্টিকর্তা আছেন, তখন একে বলা হয় গবেষণালব্ধ বা যুক্তিনির্ভর জ্ঞান।’

সত্য সংবাদ: জগতে মানুষের চোখ কান কিংবা নিজের বুদ্ধি দিয়ে সব কিছু জানা সম্ভব নয়। আমরা টেকনাফে বসে তেঁতুলিয়ার খবর পাই কিংবা ঘরে বসেই বিশ্বাস করি সুদূর মক্কা বা বাগদাদ শহরের অস্তিত্ব রয়েছে। এই যে না দেখেও কোনো কিছুকে সত্য বলে নিখাদ বিশ্বাস করা এর পেছনে কাজ করে এক শক্তিশালী মাধ্যম, যার নাম ‘সত্য সংবাদ’।

ওহী: ওহী হলো জ্ঞান অর্জনের এমন এক অনন্য ও সর্বোচ্চ মাধ্যম৷ মানুষের বুদ্ধি ও পঞ্চেন্দ্রিয়ের সীমানা যেখানে শেষ সেখান থেকে পরম সত্যের পথ দেখাতে শুরু করে ওহী। এটি কোনো মানবিক অনুমান বা দর্শন নয়, বরং খোদায়ী ইলমের আলোকবর্তিকা। যা মানুষের সামনে অদৃশ্য জগতের বদ্ধ দুয়ার এবং জীবনের মূল উদ্দেশ্যকে উন্মোচিত করে।

ওহী: আকল যেখানে থমকে দাঁড়ায়

মানুষের চোখ যেমন একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের পর আর দেখতে পায় না মানুষের বুদ্ধিরও ঠিক তেমনি একটা সীমানা আছে। ল্যাবরেটরিতে যতই গবেষণাকরা হোক না কেন, টেলিস্কোপ দিয়ে যতই আকাশ দেখা হোক, মৃত্যুর ওপারে কী আছে? আত্মার আসল রহস্য কী? জীবনের মূল উদ্দেশ্যই বা কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মানুষের বুদ্ধি কখনই বের করতে সক্ষম নয়।

যেখানে গিয়ে মানুষের ল্যাবরেটরি আরগবেষণা থমকে দাঁড়ায়, ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয় ওহীর যাত্রা। ওহী হলো মানুষদের প্রতি আল্লাহ তাআলার পাঠানো সেই দিকনির্দেশিকা যা মানুষকে সিরাতে মুস্তাকিমে চলতে সাহায্য করে। ওহী কোনো অন্ধবিশ্বাসের নাম নয় বরং এটি মানুষের বুদ্ধির পরিপূরক। মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে অলৌকিক নিদর্শন দেখে প্রথমে সত্যকে চেনে এবং নিশ্চিত হয় যে এটি স্রষ্টার পক্ষ থেকেই এসেছে। এরপর সেই ওহীর আলোতে মানুষ তার জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য খুঁজে পায়।

বিজ্ঞানের দম্ভ এবং অন্ধত্বের অবসান

আজকের যুগে এসে অনেকেই দাবি করেন ‘যা চোখে দেখি না আর যা বুদ্ধিতে ধরে না তা বিশ্বাস করি না।’ আবার অনেকে দাবি করেন, ‘জগতে পরম সত্য বলে কিছু নেই মানুষের বুদ্ধিই শেষ কথা। অথচ মানুষের বুদ্ধি প্রতিনিয়ত নিজের পুরোনো ভুল ভেঙে নতুন তত্ত্বে পৌঁছাচ্ছে। বিজ্ঞানের যা আজ পরম সত্য, কাল তা ভুল প্রমাণিত হচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে, জ্ঞান অর্জনের এই মাধ্যমগুলোর ভারসাম্য অত্যন্ত জরুরী। মানুষ তখনই তার সৃষ্টির পূর্ণতা পায়, যখন সে তার সুস্থ ইন্দ্রিয় দিয়ে চারপাশকে দেখে সুস্থ বুদ্ধি দিয়ে তা বিশ্লেষণ করে এবং বুদ্ধির সীমানা যেখানে শেষ সেখানে ওহীর পরম আলোর কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। এইসবগুলোর মেলবন্ধনেই মানুষ পশুর কাতার থেকে আলাদা হয়ে প্রকৃত ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে।

লেখক: শিক্ষার্থী, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন