Logo

ধর্ম

বন্যার ভয়াবহতায় আল্লাহর পরীক্ষা

মানবতার ডাক ও আমাদের করণীয়

Icon

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৩:৫১

মানবতার ডাক ও আমাদের করণীয়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এ দেশের মানুষের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে নদী ও পানির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তবে বর্ষাকালে বন্যা যখন স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে ভয়াবহ রূপ নেয়, তখন তা মানুষের জন্য বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

​২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। ১১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রায় ৪৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ কয়েকটি জেলা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু পরিবার পানিবন্দি হয়েছে, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকা ক্ষতির মুখে পড়েছে।

​এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ যতই প্রযুক্তি ও উন্নতির দাবি করুক, প্রকৃতির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ইসলামের শিক্ষা হলো, পৃথিবীর সব ঘটনা আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন। দুর্যোগ মানুষের জন্য কখনো পরীক্ষা, কখনো সতর্কবার্তা এবং কখনো আত্মশুদ্ধির সুযোগ হয়ে আসে।

বিপদ-মুসিবত আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা

​পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— ​“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৫)

​বন্যা, ঝড়, রোগ-ব্যাধি ও অন্যান্য বিপদ মানুষের জন্য কঠিন পরীক্ষা হতে পারে। এসব সময়ে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা, ধৈর্য ধারণ করা এবং সঠিক পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।

​আল্লাহ তাআলা আরও বলেন— ​“কোনো বিপদ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া আসে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথ দেখান।” (সূরা আত-তাগাবুন: ১১)

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ইসলামের নির্দেশ

​আল্লাহ তাআলা পৃথিবীকে সুন্দর ভারসাম্যের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ যখন সেই ভারসাম্য নষ্ট করে, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব সমাজ ও পরিবেশের ওপর পড়ে।

​পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে— ​“মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে, যাতে আল্লাহ তাদের কিছু কর্মের ফল আস্বাদন করান, যেন তারা ফিরে আসে।” (সূরা আর-রূম: ৪১)

​বর্তমানে পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী-খাল দখল, জলাধার ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ইসলাম মানুষকে পৃথিবীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।

আল্লাহ বলেন— ​“তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না, যখন তা সংশোধিত হয়েছে।” (সূরা আল-আরাফ: ৫৬)

​তাই পরিবেশ রক্ষা করা শুধু আধুনিক বিশ্বের দাবি নয়, এটি ইসলামেরও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ঈমানের দাবি

​দুর্যোগের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে সাধারণ মানুষের ওপর। বন্যায় অনেক মানুষ ঘর হারায়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়ে, অসুস্থ হয়ে যায় এবং জীবিকার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুসলমানের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

​রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ​“যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।” (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)

​আরও এসেছে— ​“যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না।” (সহিহ বুখারি: ৭৩৭৬; সহিহ মুসলিম: ২৩১৯)

​তাই বন্যার্ত মানুষের জন্য খাদ্য, পানি, চিকিৎসা, আশ্রয় ও পুনর্বাসনে সহযোগিতা করা বড় সওয়াবের কাজ।

ধৈর্য, দোয়া ও মানবিকতার শিক্ষা

​বিপদের সময় মানুষের মনে ভয় ও হতাশা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলাম শিক্ষা দেয়—বিপদের মধ্যেও আল্লাহর রহমতের আশা রাখতে হবে।

​আল্লাহ বলেন— ​“নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে।” (সূরা আল-ইনশিরাহ: ৫-৬)

​রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— মুমিনের বিষয়টি আশ্চর্যজনক! তার সব অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর... সে সুখ পেলে শুকরিয়া আদায় করে, আর কষ্ট পেলে ধৈর্য ধারণ করে।” (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)

পরিবেশ রক্ষা ও বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব

​ইসলাম প্রকৃতি ও জীবজগতের প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছে। গাছপালা রক্ষা করা, অপচয় বন্ধ করা এবং পরিবেশের ক্ষতি না করা ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ।

​রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ​“কোনো মুসলিম যদি একটি গাছ রোপণ করে, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি বা কোনো প্রাণী খায়, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়।” (সহিহ বুখারি: ২৩২০; সহিহ মুসলিম: ১৫৫৩) ​এ শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি ধ্বংস নয়, সংরক্ষণ করতে হবে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি

​ইসলাম শুধু দোয়ার শিক্ষা দেয় না; দায়িত্বশীল পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ​“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহিহ বুখারি: ৭১৩৮; সহিহ মুসলিম: ১৮২৯)

​তাই রাষ্ট্র, প্রশাসন, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ—সবার দায়িত্ব হলো দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা। নদী রক্ষা, পাহাড় সংরক্ষণ, নিরাপদ বসতি গড়ে তোলা, আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।

পরিশেষে

​বন্যা আমাদের জন্য শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি আত্মসমালোচনা, দায়িত্ববোধ ও মানবতার পরীক্ষার সময়। আমাদের মনে রাখতে হবে—প্রকৃতির মালিক মানুষ নয়, মানুষ আল্লাহর সৃষ্টিজগতের একজন দায়িত্বশীল প্রতিনিধি। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে আমাদের পরিবেশ রক্ষা করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

​আল্লাহ তাআলা বলেন— ​“আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রাদ: ১১)

​আল্লাহ আমাদের সব ধরনের দুর্যোগ থেকে হেফাজত করুন, বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট দূর করুন এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি। ইমেইল: drmazed96@gmail.com

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন