খ্যাতিমান আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী এখন বাংলাদেশে
ওয়ালিউল্লাহি চিন্তার পুনরুজ্জীবন ও তরুণ আলেমদের করণীয়
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০০:১৭
এক আলোকোজ্জ্বল বংশের যোগ্য উত্তরসূরী
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী বর্তমান মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য ও বরকতময় ব্যক্তিত্ব। তিনি ‘মাআরিফুল হাদিস’ সহ বহু কালজয়ী গ্রন্থের প্রণেতা এবং মাসিক ‘আল ফুরকান’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.)-এর সুযোগ্য সন্তান। বর্তমান পৃথিবীতে যারা ইসলামী দর্শনের প্রায়োগিক চর্চা করেন, পশ্চিমা আধিপত্যবাদী চিন্তার বিপরীতে স্বতন্ত্র বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান লালন করেন এবং ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি (রহ.)-এর বৈপ্লবিক চিন্তাধারার আধুনিক সমকালীন ব্যাখ্যা প্রদান করেন—তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষ মনীষী হলেন আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী।
পাণ্ডিত্য ও দূরদর্শিতার মেলবন্ধন
তিনি ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামার প্রবীণ শিক্ষক ও মুহাদ্দিস ছিলেন। বর্তমানে বহুমুখী পরিচয়ে ভাস্বর এই চিন্তানায়ক মাসিক ‘আল ফুরকান’ এর যোগ্য সম্পাদনার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সাধনার এক বিরল রত্ন হিসেবে সমাদৃত। ভারতের নানামুখী জাতীয় ও ধর্মীয় সংকটে তিনি সবসময়ই মুসলমানদের অধিকার রক্ষা এবং ইসলামের গৌরবময় অবস্থান ধরে রাখতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ, সাহসী ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করে আসছেন।
অতীতের সোনালী স্মৃতি ও আলী নদভী (রহ.)-এর সফর
বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দাঈ ও ‘মুফাক্কিরে ইসলাম’ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক সফর তৎকালীন বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের চিন্তা, চেতনা ও মনীষা চর্চার জগতে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। আল্লামা নদভী (রহ.)-এর কালজয়ী চিন্তাধারা এবং তার মূল্যবান রচনাবলী ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রকাশনীর মাধ্যমে বাংলায় অনূদিত হয়ে আমাদের দেশের ইসলামী সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে।
আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.)-এর কালজয়ী অবদান
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর পিতা আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.) ছিলেন আল্লামা নদভী (রহ.)-এর অভিন্নহৃদয় বন্ধু। তিনি দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের অন্যতম প্রধান সংস্কারক (মুজাদ্দিদ) এবং এই মোবারক কাজের বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রসারে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছিলেন। কর্মজীবনের একপর্যায়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাকালীন শীর্ষ সদস্যও ছিলেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে বের হয়ে আসার পর নিজের গভীর অভিজ্ঞতা ও তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে অত্যন্ত মূল্যবান বই লিখেছেন। তিনি একাধারে যেমন সুক্ষ্ম চিন্তক ছিলেন, তেমনি ইসলামের পক্ষে একজন অকাট্য তার্কিক ও বিদগ্ধ মুনাজিরও ছিলেন।
হীনমন্যতা দূরীকরণে এই সফরের গুরুত্ব
তারই সুযোগ্য সন্তান আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর চলমান বাংলাদেশ সফর আমাদের জাতীয় চিন্তার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। বিশেষ করে আমাদের তরুণ সমাজের যারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে হীনমন্যতায় ভোগেন, তারা এই মহীরুহের সান্নিধ্য ও আলোচনা থেকে নতুনভাবে অনুপ্রাণিত, উজ্জীবিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবেন।
কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করা মুসলিম বিশ্বের প্রখ্যাত চিন্তক ও দারুল উলুম নদওয়ার মুহাদ্দিস, সীরাত গবেষক, সুবক্তা সাইয়েদ সালমান হুসাইনি নদভী (রহ.) ছিলেন আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর একান্ত সুহৃদ। কিছু তাত্ত্বিক বিষয়ে এই দুই বন্ধুর মধ্যে মতভিন্নতা বা স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও, ইসলামী সাহিত্য, হাদিস এবং সমকালীন চিন্তার আধুনিকায়ন ও নবায়নের ক্ষেত্রে উভয় ব্যক্তিত্বই শতাব্দীর সেরা অবদান রেখে গেছেন।
‘মাআরিফুল হাদিস’ চর্চার আবশ্যকতা
আমাদের তরুণ সমাজে আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.)-এর চিন্তার চর্চা ও পঠন-পাঠন যতটা থাকা দরকার ছিল, দুর্ভাগ্যবশত ততটা চোখে পড়ে না। বিশেষ করে তার রচিত ‘মাআরিফুল হাদিস’ গ্রন্থটি ‘মাআরিফুল কোরআন’ এর মতোই ঘরে ঘরে পঠিত ও পরিচিত হওয়ার দাবি রাখে। আলহামদুলিল্লাহ, কিতাবটি বাংলায় অনূদিত হয়েছে এবং অনেক জ্ঞানপিপাসুর পড়ার টেবিলে এটি শোভা পায়।
আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ ও শাহ ওয়ালিউল্লাহর দর্শন
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী ভারতীয় উপমহাদেশে শাহ ওয়ালিউল্লাহর চিন্তাধারার প্রধানতম জীবন্ত ব্যাখ্যাতা। বাংলাদেশ সফরকালে তিনি বিভিন্ন সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখবেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় মাদরাসা, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এশিয়াটিক সোসাইটিসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোগ্রামে তার অংশগ্রহণের কথা রয়েছে। আমি দেশের তরুণ এবং চিন্তাশীল আলেমদের প্রতি বিনীত অনুরোধ করব, এই মহান মনীষীর সান্নিধ্য পাওয়ার এই বিরল সুযোগটি কোনোভাবেই হাতছাড়া করবেন না। আধুনিক যুগের নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জ এবং পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন মোকাবেলায় ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহর কালজয়ী দর্শন কীভাবে নতুন পথ দেখাতে পারে, তা আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রবীণ ও নবীন সবার সামনে তুলে ধরতে সক্ষম।
নবীন আলেমদের জন্য পথনির্দেশনা
তিনি প্রজ্ঞা ও হিকমতের অনন্য সমন্বয়ে আধুনিক পৃথিবীকে অ্যাড্রেস করেন। বাংলাদেশের জন্য তার এই সফর এক মহাসৌভাগ্য ও ঐশ্বরিক নিয়ামত। বিশেষ করে তরুণ ওলামায়ে কেরাম, যারা আগামী দিনে দ্বীনি চিন্তার সংস্কার করতে চান এবং আধুনিক শিক্ষিত সমাজ, বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকদের মাঝে বুদ্ধিবৃত্তিক দাওয়াতের কাজ করতে চান, তাদের জন্য তিনি এক আলোকবর্তিকা ও সঠিক রাহবার।
আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মহাসমুদ্র
পাণ্ডিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তার সমান্তরালে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী আধ্যাত্মিক ধারারও একজন মহান সাধক। আমার জানামতে, তিনি নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া তরিকার একজন উচ্চমাপের পীর। যারা অন্তরের পরিশুদ্ধি বা প্রকৃত আধ্যাত্মিক চর্চা করতে চান কিংবা একজন খাঁটি রব্বানী ও হক্কানী পীরের সন্ধান করছেন, তাদের জন্য আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী হতে পারেন এক পরম নির্ভরতার ঠিকানা। আধ্যাত্মিকতার কঠিন মনজিল পাড়ি দিয়ে তিনি এই যুগের একজন অনন্য ‘কলন্দর’ বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
ব্যক্তিগত অনুভূতি
ইউটিউবে আমি তার বহু জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শুনেছি এবং দূর থেকেই তাকে হৃদয়ের গভীর থেকে ভালোবাসি। তার প্রোগ্রামগুলোতে সশরীরে উপস্থিত থাকার তীব্র ব্যাকুলতা আমার রয়েছে; তবে নিজস্ব ব্যস্ততা ও পূর্বনির্ধারিত রুটিনের কারণে হয়তো পুরো সময় থাকা সম্ভব হবে না। তবে ঢাকায় যেখানে যেখানে প্রোগ্রাম হবে, সুযোগ থাকা প্রত্যেকেরই সেখানে সশরীরে অংশগ্রহণ করা উচিত। যে সমস্ত দ্বীনি প্রতিষ্ঠান আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর এই সফরের ও বক্তব্য উপস্থাপনের আয়োজন করেছেন, তাদেরকে আমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিক মোবারকবাদ ও অভিনন্দন।
বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান ও সাক্ষাৎকারের দাবি
প্রাতিষ্ঠানিক বড় সেমিনারের পাশাপাশি যদি ছোট পরিসরে দেশের শীর্ষ আলেম, লেখক ও চিন্তকদের সাথে তার বিশেষ মতবিনিময় ও জ্ঞানগর্ভ সাক্ষাৎকারের আয়োজন করা যায়, তবে বাংলাদেশের আলেম সমাজ দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হতে পারবে। অতীতে যখন আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন আমাদের অগ্রজ ও বরেণ্য লেখক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ এর নেওয়া আল্লামা রাবে হাসানী নদভী (রহ.)-এর একটি ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকার সম্ভবত ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, অগ্রপথিক বা কোনো জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছিল, যা আমি গভীর আগ্রহে পড়েছিলাম।
আমি আশা করি, মুহতারাম মাওলানা শরীফ মুহাম্মদ বা তার সমসাময়িক দায়িত্বশীল সাংবাদিক-লেখকরা এবারও এই মহান ব্যক্তিত্বের একটি দীর্ঘ ও গভীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ ও প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন।
বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচারের তাগিদ
একই সাথে আয়োজকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, অনুষ্ঠানগুলো মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরাসরি উচ্চমানের সম্প্রচারের (Live) ব্যবস্থা রাখবেন , যেন দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ দূর থেকেও এই ইলমি ও রুহানি মজলিশ থেকে উপকৃত হতে পারেন। দল-মত নির্বিশেষে এই অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ আলেমের সান্নিধ্য সবার জন্যই এক বিরাট বৈশ্বিক প্রাপ্তি।
উপমহাদেশীয় আলেমদের চিন্তার ব্যবধান
উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আলেমদের চিন্তার পরিধিতে কিছুটা তারতম্য বা ঘাটতি রয়েছে। একটি প্রচলিত কথা আছে—ভারত যা আজ চিন্তা করে, পাকিস্তান তা ২০ বছর পর এবং বাংলাদেশ আরও ২০ বছর পর তা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। তবে ইদানীং পাকিস্তান শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ওলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মূল ভারত থেকেও। যদিও দাওয়াত, তাসাউফ ও শিক্ষার মৌলিক ক্ষেত্রে ভারতের উত্তর প্রদেশ (ইউপি) এবং আজমগড়ের ওলামায়ে কেরাম ঐতিহ্যগতভাবেই অনেক অগ্রসর।
অন্যদিকে পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচি বা জামিয়াতুর রশীদের ওলামায়ে কেরাম যেভাবে সমসাময়িক আধুনিক রাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক মানের চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছেন, বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম সেই তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে আছেন এবং অনেকেই নিজস্ব মৌলিক চিন্তার চেয়ে অন্যের অন্ধ অনুসরণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবুও আমরা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এবং ইসলামের পক্ষের এই চিন্তানায়কদের মন থেকে স্বাগত জানাই। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সংকীর্ণ ঘরানার চোখে না দেখে, বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের বৃহত্তর স্বার্থে তরুণ সমাজকে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর চিন্তার সাথে একাত্ম হতে হবে।
সফরের নথিপত্র ও বক্তৃতা সংকলনের প্রস্তাব
যারা এই সফরে হযরতের সার্বক্ষণিক সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে—আপনারা এই সফরের প্রতিটি মুহূর্তের অভিজ্ঞতা, তার অমূল্য নসিহত, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও রসবোধগুলো নোট করে রাখুন এবং পরবর্তীতে তা লিপিদ্বদ্ধ করবেন। এক সপ্তাহের এই সফরের বক্তৃতাগুলো যদি একটি গ্রন্থ আকারে সংকলন করা যায়, তবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে। আমাদের দেশে সাধারণত বড় কোনো বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব এলে তাদের বিদায়ের পর সেসব অমূল্য আলোচনা আর সংরক্ষিত থাকে না। তাই আমি জোরালো প্রস্তাব রাখছি, হযরতের পুরো সফরের অডিও, ভিডিও এবং লিখিত রূপ নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের জন্য একটি দক্ষ মিডিয়া ও আইটি টিম নিয়োজিত করা হোক।
মূলধারার মিডিয়ার প্রতি আহ্বান ও ক্ষোভ
তিনি ভারতের বিভিন্ন জাতীয় টেলিভিশন ও মূলধারার গণমাধ্যমেও নিয়মিত খোলামেলা কথা বলেন। আমাদের বাংলাদেশের মূলধারার মিডিয়াতেও যদি তার এই আগমন ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আগে থেকে জোরালো লেখালেখি করা হতো, তবে তারাও এটিকে বড় কভারেজ দিত এবং তার সাক্ষাৎকার নিত। তিনি এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব যিনি আধুনিক শিক্ষিত সমাজ (মিস্টার) এবং ঐতিহ্যবাহী ধারার আলেম (মোল্লা)—উভয় পক্ষকেই সমানভাবে পথনির্দেশনা দেওয়ার ঐশ্বরিক যোগ্যতা রাখেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, আমাদের দেশের মূলধারার মিডিয়াগুলো সিনেমা বা বিনোদন জগতের কেউ কিংবা কোনো খেলোয়াড় এলে যতটা সস্তা ও অতি-গুরুত্ব দেয়, মুসলিম বিশ্বের একজন শীর্ষ চিন্তাবিদের এমন ঐতিহাসিক সফরকে ততটা মূল্যায়ন করে না। আমরা আশা করি, আয়োজক পক্ষ মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের যথাযথ আমন্ত্রণ ও প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে এই সফরের তাৎপর্যপূর্ণ খবরগুলো মূলধারার গণমাধ্যমে জোরালোভাবে তুলে ধরার ব্যবস্থা করবেন।
একটি নতুন ভোরের প্রত্যাশা
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর এই বৈপ্লবিক সফর আমাদের চিন্তার বন্ধাত্ব দূর করে এক নতুন পরিবর্তন আনবে এবং তরুণ সমাজকে এক নতুন ভোরের পথ দেখাবে—এই প্রত্যাশা করি। মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা, তিনি যেন আমাকে এই মহিমান্বিত মনীষীর মজলিশে উপস্থিত থাকার, তাকে কাছ থেকে দেখার এবং তার জীবনঘনিষ্ঠ আলোচনা থেকে পূর্ণ উপকৃত হওয়ার তৌফিক দান করেন।
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
১. জন্ম ও বংশপরিচয়: আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট ভারতের উত্তর প্রদেশের লখনৌতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.) ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের কৃতি ছাত্র এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিস।
২. শিক্ষাজীবন: তিনি নিজ পরিবার এবং স্থানীয় মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর দারুল উলুম দেওবন্দ এবং দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাদিস শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।
৩. সাংগঠনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব: তিনি ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ (AIMPLB)-এর একজন অন্যতম শীর্ষ সক্রিয় সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র। ভারতে মুসলমানদের অধিকার রক্ষা ও শরীয়াহ আইনের সুরক্ষায় তিনি প্রথম সারির নেতা।
৪. মাসিক আল-ফুরকান: পিতার ইন্তেকালের পর থেকে তিনি বিখ্যাত গবেষণা পত্রিকা মাসিক ‘আল-ফুরকান’ এর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন, যা বিশ্বজুড়ে ওলামাদের মাঝে অত্যন্ত সমাদৃত।
৫. বড়বাম্বি মডেল ও শিক্ষা সংস্কার: তিনি ভারতের লক্ষ্ণৌয়ের কাছে ‘রিয়াদুল জান্নাহ’ এবং ‘বড়বাম্বি’ প্রজেক্টের মাধ্যমে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার মডেল তৈরি করেছেন, যেখানে মাদরাসার ছাত্রদের আধুনিক বিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমসাময়িক বিষয়ে দক্ষ করা হয় এবং আধুনিক শিক্ষিতদের খাঁটি ইসলাম শেখানো হয়।
৬. আন্তঃধর্মীয় সংলাপ: ভারতে দলিত, আদিবাসী এবং অমুসলিমদের সাথে মুসলমানদের সম্প্রীতি রক্ষা এবং ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে তিনি দীর্ঘ দিন ধরে ‘কোরআন সবার জন্য’ (Quran for All) এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

