Logo

ধর্ম

মুসলিম নারীদের অবদান ও কীর্তি

Icon

যাকিয়্যা তাহসিন ফারিহা

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ০২:৪২

মুসলিম নারীদের অবদান ও কীর্তি

ইসলামের সোনালী যুগে নারী সমাজ কখনো পিছিয়ে ছিলেন না। বরং পুরোপুরি পর্দা-শালীনতা বজায় রেখে তাঁরা জ্ঞানচর্চা, মানবসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য, জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সর্বত্র তাঁরা সম্মানের সহিত অগ্রাধিকার পেয়েছেন।

হাজার বছরের মুসলিম শাসনকালে বহু জ্ঞানী, গুণী ও প্রজ্ঞাবান নারীর আগমন ঘটেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান ও কীর্তির মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের বহু উপকার সাধিত হয়েছে। এ সকল মহিয়সী রমণী ছিলেন মুসলিম জাতির গৌরব ও উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা।

জ্ঞানচর্চা ও মেধা বিকাশে নারীগণ

কেমব্রিজ ইসলামিক কলেজের ডিন ড. মুহাম্মদ আকরাম নদভি শিক্ষা-দীক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিম রমণীদের বিশাল অবদান ও কীর্তি সম্পর্কে বিরাট একটি বিশ্বকোষ রচনা করেছেন। এতে তেঁতাল্লিশটি খণ্ড রয়েছে। সেগুলোতে দশ হাজারের অধিক মহিলা হাদিসবিশারদ ও শিক্ষাবিদদের জীবনেতিহাস, অবদান ও কর্মের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এখানে অল্প কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলোÑ 

উম্মাহাতুল মুমিনিন ও অন্যান্য নারী সাহাবী : আম্মাজান হজরত আয়েশা (রাযি.) ছিলেন জ্ঞানের ভাণ্ডারে ভরপুর একজন রমণী। তাফসির, হাদিস, ফিকহ, চিকিৎসা, কাব্য ও ইতিহাসে তাঁর বিশাল পাণ্ডিত্ব ছিল। অন্যান্য নবীপত্নী যেমন: হজরত উম্মে সালামা, হাফসা, মাইমুনা, উম্মে হাবিবা, সাফিয়্যা (রাযি.) প্রমুখ এবং অন্যান্য মহিলা সাহাবি যেমন: নবীকন্যা হজরত ফাতিমা, আসমা বিনতে আবু বকর, উম্মে আইমান, ফাতিমা বিনতে কায়স, আতিকা বিনতে যায়েদ (রাযি.)-সহ অসংখ্য পূণ্যবতী, তাঁরা সবাই প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ছিলেন এবং সর্বত্র জ্ঞানের আলো ছড়াতেন।

ফতোয়া প্রদানকারী নারী সাহাবীদের মাঝে হজরত উম্মে সালামা, আয়েশা, উম্মে দারদা, লায়লা বিনতে কায়স, যয়নাব বিনতে উম্মে সালামা (রাযি.) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

চার শহীদের জননী হজরত খানসা (রাযি.)-এর মতো একজন প্রতিভাবান মহিলা কবি এখনও দুনিয়ার বুকে বিরল। ‘উসদুল গাবা’ নামক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা লিখেছেন, ‘সকল ইতিহাসবিদ এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেন যে, হজরত খানসা (রাযি.)-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি তাঁর আগে বা পরে আর কেউ ছিল না।’

অন্যান্য মহিলা কবির মধ্যে হজরত আয়েশা, কসবা বিনতে রাফে, হিন্দ বিনতে হারিস, উম্মে আইমান, উমামা, আতিকা বিনতে যায়েদ (রাযি.) প্রমুখের নাম বিশেষভাবে অগ্রাধিকারযোগ্য।

সাহাবিদের পরে যেসব রমণী জ্ঞানের জগতে উজ্জ্বল তারকা হিসেবে প্রখ্যাত ছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেনÑ

আমরা বিনতে আব্দুর রহমান (রহ.) : তিনি ছিলেন বিশিষ্ট তাবেয়ি, যিনি হজরত আয়েশা (রাযি.)-এর তত্ত্বাবধানে লালিত পালিত হন এবং তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। শিক্ষা-দীক্ষার পর তিনি জ্ঞান প্রসারে ব্রতী হন। অনেক বড় বড় মুহাদ্দিস আমরা (রহ.)-এর ছাত্র ছিলেন। ইমাম যাহাবি (রহ.) তাঁর ব্যাপারে লিখেছেন, ‘তিনি আলেমা, ফকিহা, হাদিসের বড়ো ইমাম এবং অগাধ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।’ 

হাফসা বিনতে সিরীন (রহ.) : তিনি তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.)-এর বোন। হাফসা (রহ.) ছিলেন জ্ঞান ও তাকওয়ার প্রদীপ। তিনি এতই পাণ্ডিত্যের অধিকারিণী ছিলেন যে, তাঁর ভাই মুহাম্মদ পবিত্র কোরআনের জটিল কোনো আয়াতের কেরাত কিংবা কোনো অর্থ বুঝতে অসুবিধায় পড়লে বলতেন, ‘যাও, হাফসাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো এটি সে কীভাবে পড়ে।’ (সূত্র: ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ, সিফাতুস সাফওয়াহ, ৪/২৪,দারুল হাদিস, কায়রো, ২০০০)

এছাড়া সাইয়িদা নাফিসা, কারিমা আল-মারওয়াযিয়্যা, উম্মে আবু দারদা, উম্মুল হাসান, শুহাদা, ফাতিমা বিনতে আল-হাসান, আয়েশা বিনতে সালেহ, সাবিনা বিনতে হুসাইন-সহ বহু মহিয়সী নারীগণ জ্ঞান বাগিচার একেকটি ফুল ছিলেন।

মানবসেবায় মহিলা চিকিৎসক

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই চিকিৎসার জগতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। পরম মমতায় তাঁরা আহত ও অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করে আসছেন। শরিয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকে এ কর্ম করার প্রতি ইসলাম তাঁদেরকে উৎসাহিত করেছে। সেই উৎসাহে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা বিখ্যাত চিকিৎসাবিদ হয়ে উঠেছেন। নিম্নে কয়েকজন মহিলা চিকিৎসকের গৌরবময় অবদান উল্লেখ করা হলো-

হজরত রুফাইদা আল-আসলামিয়্যাহ (রাযি.) : রুফাইদা আল-আসলামিয়্যাহ (রাযি.) একজন দক্ষ চিকিৎসক ও নার্স ছিলেন। স্বীয় পিতার নিকট থেকে তিনি চিকিৎসা বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে রুফাইদা আল-আসলামিয়্যাহ (রাযি.) যুদ্ধে আহত সৈনিকদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন। আহতদের সেবার জন্য তিনি অস্থায়ী হাসপাতাল হিসেবে মসজিদে তাঁবু তৈরি করেছিলেন।

আজকের দুনিয়ার ভ্রাম্যমাণ হসপিটাল ও চিকিৎসার ধারণা মানুষ এখান থেকেই নিয়েছে। (সূত্র: এডি জাব্বার, ইউনে হিসতোরিয়ে)

হজরত শিফা বিনতে আবদুল্লাহ (রাযি.) : তিনি ছিলেন নবীযুগের আরেকজন মহিলা চিকিৎসক। তাঁর আসল নাম হলো লায়লা, কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর দক্ষতা ও অবদানের কারণে তিনি ‘শিফা’ বা ‘নিরাময়’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। শিফা (রাযি.) বিভিন্ন চর্মরোগ ও পিঁপড়ার কামড় সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসার জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

হজরত উম্মে আতিয়্যা আল-আনসারিয়্যাহ (রাযি.) : তিনিও একজন চিকিৎসক মহিলা সাহাবি ছিলেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে আমি সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমি তাদের জিনিসপত্র দেখাশোনা করতাম, খাদ্য তৈরি করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের সেবা করতাম। -(সূত্র: সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮১২)

সাহাবিদের পরে মহিলা চিকিৎসক হিসেবে যারা সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন- অস্ত্রোপচার ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ জয়নাব তবিবাতু বনি দাউদ; ধাত্রীবিদ্যা ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ উম্মে আহমদ আল-কাবিলা; কবি ও চিকিৎসক উম্মুল হাসান; উমাইয়া শাসকপত্নীদের চিকিৎসক বিনতু দিহনিল লাউজ; ধাত্রীবিদ্যা ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ উখতুল আবু বকর ইবনে জাহরা ও বিনতু শিহাবুদ্দিন আবিস সায়েগ প্রমুখ।

ব্যবসা-বাণিজ্যে রমণীগণ

সোনালী যুগের সেরা মানবীগণ ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের মাধ্যমে সমাজের অর্থব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। জগতবাসীকে তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহর বিধান পর্দা-শালীনতা সম্পূর্ণ বজায় রেখেও মহিলা সমাজ ব্যবসা-বাণিজ্যে সফলতা লাভ করতে সক্ষম। নিম্নে কয়েকজন ব্যবসায়ী রমণীর কীর্তি তুলে ধরা হলো-

উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রাযি.) : তিনি ছিলেন একজন ধনাঢ্য ও সফল ব্যবসায়ী। স্বীয় ব্যবসা পরিচালনার জন্য তিনি ব্যবস্থাপক নিয়োগ করতেন। ইতিহাসবিদদের মতে, খাদিজা (রাযি.)-এর মূল ব্যবসা ছিল আমদানি-রপ্তানি। তিনি সিরিয়ার দূরবর্তী বাজারে পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করতেন এবং তাঁর ব্যবস্থাপকেরা মক্কার বাজারে বিক্রি করার জন্য দূরবর্তী বাজার ও শহর থেকে পণ্য ক্রয় করে আনতেন। (সূত্র: খাদিজা আল-কুবরা: দ্যা ফাস্ট মুসলিম ওম্যান ওয়াজ অ্যাকচুয়ালি আ বিজনেস ওম্যান, সারাহ পেরেচ, মুসলিম বিজনেস ওম্যান, মিডিয়াম. কম)

হজরত কায়লা (রাযি.) : নারী সাহাবি কায়লা (রাযি.) ব্যবসা করতেন। একদা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় উমরাহ করতে গেলে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাত করেন এবং স্বীয় ব্যবসার পদ্ধতি বর্ণনা করেন। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যবসা করা থেকে বাধা দেননি। বরং তাকে সহিহ পদ্ধতিতে ব্যবসা করার নিয়ম শিখিয়ে দিলেন।

নবীপত্নী হজরত সাওদা (রাযি.) : সাওদা (রাযি.) নিজেই উপার্জন করতেন। তিনি তায়েফ থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া এনে তা দিয়ে গৃহস্থালির বিভিন্ন পণ্য বানিয়ে বিক্রি করতেন। উপার্জিত অধিকাংশ অর্থ গরিব-অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। (সূত্র: প্রিয়তমা, সালাউদ্দীন জাহাঙ্গীর, নব প্রকাশ)

সাহাবিদের পরেও বহু মহিয়সী মুসলিম নারী অর্থনীতিতে অগাধ ভূমিকা রেখেছেন। পুরুষদের পাশাপাশি তাঁরাও শরিয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করে সমাজের অর্থব্যবস্থার উন্নতি করেছেন।   

যুদ্ধক্ষেত্রে বীরঙ্গনা মানবীগণ

সোনালী যুগের নারীরা পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন এবং বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। যেমন: হজরত আয়েশা (রাযি.), উম্মে সুলাইম (রাযি.)-সহ অনেক মহিলা সাহাবি পিপাসার্ত সৈন্যদের পানি পান করাতেন এবং খাদ্য তৈরি করতেন। ডাক্তার মহিলা সাহাবীগণ আহতদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন। অনেক বীরঙ্গনা রমণী আবার সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে নেমে কাফেরদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-

হজরত নুসাইবা বিনতে কাব (রাযি.) : নুসাইবা (রাযি.) ‘উম্মে আম্মারা’ নামে সুপরিচিত ছিলেন। জীবনে তিনি বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সরাসরি তলোয়ার হাতে নিয়ে রণক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাঁর অগাধ সাহসিকতায় সকলে বিস্মিত ছিল। নুসাইবা (রাযি.)-এর বীরত্বের কথা বর্ণনা করে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘ওহুদ যুদ্ধের দিন আমি ডানে-বামে যেদিকেই তাকিয়েছি, দেখেছি আমাকে বাঁচাবার জন্য উম্মে আম্মারা প্রাণপণ লড়াই করছে।’ 

হজরত সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাযি.) : রাসলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ফুফু সাফিয়্যা বিনতে আবদুল মুত্তালিব (রাযি.) খুবই সাহসিনী নারী ছিলেন। খন্দক যুদ্ধের দিন তিনি অগাধ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একাই একজন ইহুদি গুপ্তচরের দেহ থেকে মাথা আলাদা করেছিলেন। ফলে, বাকি ইহুদি সৈন্যদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল।

বিশ শতকের ইসলামি জাগরণে যারা অগাধ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে গৌরবময় একটি নাম হলো যয়নাব আল গাজালি আল জুবাইলি। মুসলিম সংগঠনের নেত্রী যয়নাব ছিলেন এই শতকের বীরঙ্গনা, যিনি শত বাধা পেরিয়ে আজীবন ইসলামি চেতনা ও দৃঢ়তা অটুট রেখেছেন এবং আল্লাহর দুশমনদের মুখে চুনকালি দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গিনী ছিলেন আরেকজন সাহসিনী রমণী হামিদা কুতুব। এভাবে যুগে যুগে মুসলিম নারীরা অগাধ বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে আসছেন।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট হলো যে, ইসলাম নারীজাতির সম্মান সু-উচ্চ করেছে এবং সমাজে তাদের বিশেষ স্থান দিয়েছে। পৃথিবীতে যা চির কল্যাণকর, তার অর্ধেক অবদান নারী সমাজের। শরিয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকে তারা দেশ, জাতি ও পৃথিবীর কল্যাণে অবদান রাখতে পারে। সোনালী যুগের মুসলিম নারীগণ এর জাজ্বল্যমান প্রমাণ।

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন