সমকালীন বিশ্বে ইসলামি চিন্তার আধুনিকায়ন
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর জীবন ও অবদান
লাবীব আব্দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৯:০৬
পারিবারিক পটভূমি
আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী বর্তমান মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য ও বরেণ্য ইসলামি স্কলার, চিন্তানায়ক, বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং আধ্যাত্মিক রাহবার। তিনি তুরস্কের সাথে ঐতিহাসিক শিকড় যুক্ত ওলামা ও পণ্ডিতদের একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৫৫ সালে উত্তর ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের লৌখনোতে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা—হাদীস শাস্ত্রের কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাআরিফুল হাদীস’-এর প্রণেতা আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শীর্ষ মুবাল্লিগ, ধর্মতত্ত্ববিদ, ম্যাগাজিন সম্পাদক ও সমাজকর্মী, যিনি ১৯৩৩ সালে বিখ্যাত উর্দু মাসিক পত্রিকা ‘আল-ফুরকান’ প্রতিষ্ঠা করেন। পারিবারিক এই গভীর ইলমি ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডল আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর চিন্তা ও দর্শন গঠনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করেছে।
শিক্ষাজীবন ও আদর্শিক প্রভাব
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী তাঁর প্রখ্যাত পিতার কাছে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে ভারতের ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা এবং দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রথাগত উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি সৌদি আরবের মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘কুরআন বিজ্ঞান’ (কুরআনিক স্টাডিজ) বিষয়ে ডক্টরেট (পিএইচডি) ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর জীবন, দর্শন ও কর্মপদ্ধতি গঠনে বেশ কয়েকজন যুগান্তকারী মনীষীর গভীর প্রভাব রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন—তাঁর পিতা আল্লামা মনজুর নোমানী (রহ.), প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার ও ইতিহাসবিদ শায়খ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.), আন্তর্জাতিক তাবলীগ জামাতের দ্বিতীয় আমীর হযরতজী হযরত মাওলানা ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.), প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ শায়খুল হাদীস মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) এবং প্রখ্যাত ইসলামি কবি ও দার্শনিক ড. মুহাম্মদ ইকবাল।
হীনমন্যতা দূরীকরণ ও শাহ ওয়ালিউল্লাহর দর্শন
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী হলেন বর্তমান ভারতীয় উপমহাদেশে আল্লামা শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর বৈপ্লবিক চিন্তাধারা ও দর্শনের প্রধানতম জীবন্ত ব্যাখ্যাতা। বর্তমান তরুণ আলেম ও মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ যখন পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের সামনে এক ধরণের হীনমন্যতায় ভুগছেন, তখন আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর চিন্তাদর্শন তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস ও নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে পারে।
আশির দশকে মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দাঈ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)-এর বাংলাদেশ সফর এদেশের ওলামায়ে কেরামের মননশীলতায় যেভাবে বড় ধরনের ইতিবাচক ঝাঁকুনি দিয়েছিল; আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর চিন্তাধারা ও তাঁর সান্নিধ্যও সমকালীন তরুণ সমাজকে আধুনিক যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন পথের দিশা দেখাবে। তিনি প্রজ্ঞা ও হিকমতের নিখুঁত সমন্বয়ে আধুনিক মনস্তত্ত্বকে অ্যাড্রেস করতে সক্ষম।
রচিত ও প্রকাশিত গ্রন্থাবলি
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ইস্যুতে ব্যাপকভাবে লেখালেখি করেছেন। তাঁর রচিত প্রধান গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে।
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী এবং তাঁর তাফসির পদ্ধতি: আরবি ভাষায় রচিত এই গ্রন্থটি শাহ ওয়ালিউল্লাহর তাফসির দর্শনের ওপর একটি অনন্য গবেষণামূলক কাজ।
একটি সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা: এটিও আরবি ভাষায় রচিত, যা দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বিত রূপরেখা প্রদান করে।
মাসিক আল-ফুরকান: পিতার ইন্তেকালের পর থেকে তিনি ২০,০০০-এরও বেশি সার্কুলেশন বিশিষ্ট এই বিখ্যাত উর্দু মাসিক পত্রিকা এবং এর অনলাইন সংস্করণের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর পিতা রচিত কালজয়ী গ্রন্থ ‘মাআরিফুল হাদিস’ গ্রন্থটি আমাদের দেশে ‘মাআরিফুল কোরআন’-এর মতোই ঘরে ঘরে সমাদৃত ও পঠিত হওয়ার দাবি রাখে। বর্তমান তরুণ ওলামা ও শিক্ষিত সমাজের মাঝে এই কিতাব এবং এর পেছনের ভারসাম্যপূর্ণ চিন্তার ব্যাপক পঠন-পাঠন ও চর্চা হওয়া জরুরি।
আন্তর্জাতিক সফর ও বিশ্বনেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী বিশ্বমঞ্চে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা অত্যন্ত প্রজ্ঞার সাথে তুলে ধরেছেন। তাঁর আন্তর্জাতিক সফর ও যোগাযোগের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত।
পাশ্চাত্যের দেশসমূহ: তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক সফর করেছেন। তিনি জাতিসংঘ (যুক্তরাষ্ট্র), লিডস বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাজ্য) এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় (যুক্তরাষ্ট্র)-এর মতো বিশ্বখ্যাত মঞ্চে বক্তব্য প্রদান করেছেন।
আরব ও মুসলিম বিশ্ব: তিনি সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), বাহরাইন, সিরিয়া, মিশর, জর্ডান এবং তুরস্ক সফর করেছেন। বিশেষ করে তুরস্কের আধুনিক রূপান্তর ও বুদ্ধিজীবী মহলের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেন।
বিশ্বনেতাদের সাথে মতবিনিময়: আন্তর্জাতিকভাবে তিনি সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিশ্বনেতাদের সাথে এবং জাতীয় স্তরে ভারতের একাধিক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীদের সাথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময় করেছেন।
শিক্ষা সংস্কার ও প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী ঐতিহ্যগত ধর্মীয় শিক্ষা এবং সমকালীন প্রায়োগিক জ্ঞানের মধ্যকার কৃত্রিম বিভাজন দূর করতে বিশ্বাসী। এই সমন্বিত দর্শনের আলোকে তিনি বেশ কিছু অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করছেন।
দারুল উলুম ইমাম-ই-রব্বানী: ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষার সাথে আধুনিক বৈজ্ঞানিক ও প্রায়োগিক জ্ঞানের সমন্বয় সাধনের জন্য প্রতিষ্ঠিত একটি বিপ্লবী প্রতিষ্ঠান। এর উদ্দেশ্য হলো এমন একদল স্কলার তৈরি করা, যারা বর্তমান বিপর্যস্ত মানবতার সামনে ইসলামকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, টেকসই বিকল্প হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন।
ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক স্টাডিজ: ভারতের নেরালে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি নির্বাচিত তরুণ ওলামাদের জন্য উচ্চতর (পোস্ট-গ্রাজুয়েট) курс পরিচালনা করে, যেন তারা সমকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় দক্ষ ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে গড়ে ওঠেন।
দার-এ-আরকাম ও আইডিয়াল স্কুল: উত্তরপ্রদেশের জাহাঙ্গীরবাদে অবস্থিত দার-এ-আরকাম একটি কুরআন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এছাড়া ‘আইডিয়াল স্কুল’ হলো ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন ভারতের প্রথম আধুনিক বিদ্যালয়গুলোর অন্যতম।
এছাড়াও তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ এবং আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথি শিক্ষক (Visiting Faculty) হিসেবে যুক্ত আছেন।
সেবামূলক কার্যক্রম ও রহমান ফাউন্ডেশন
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর চিন্তাধারা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনার can মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা মানবসেবা ও সামাজিক উন্নয়নের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত:
রহমান ফাউন্ডেশন: ১৯৯৫ সালে প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার ক্বারী সিদ্দিক বান্ধভীর ইচ্ছায় তিনি এই জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। এটি মূলত দরিদ্র, এতিম, বিধবা ও মজলুমদের পুনর্বাসনে কাজ করে।
সামাজিক উন্নয়ন: রহমান ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাপক দারিদ্র্য, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও অপুষ্টি দূর করা।
স্বীকৃতি: এই ফাউন্ডেশনের মানবিক সেবা কার্যক্রম ভারতের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে। পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল ‘ইউনিসেফ’ (UNICEF) কর্তৃক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও লাভ করেছে।
আধ্যাত্মিক জীবন ও তাসাউফ চর্চা
পাণ্ডিত্য ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সমান্তরালে আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী তাসাউফ বা তাযকিয়া ও ইহসানের চিশতিয়া এবং নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া ধারার একজন খেলাফতপ্রাপ্ত উচ্চমাপের আধ্যাত্মিক পীর।
খানকাহ-ই-নোমানিয়া মুজাদ্দেদিয়া: মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রটি তিনি নিজে পরিচালনা করছেন। প্রতি মাসের শেষ রবিবারে তাঁর জ্ঞানগর্ভ আত্মশুদ্ধিমূলক আলোচনা শোনার জন্য এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী আধ্যাত্মিকতার কঠিন মনজিল পাড়ি দিয়ে এই যুগের একজন বিরল ‘কলন্দর’ বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। যারা অন্তরের পরিশুদ্ধি বা প্রকৃত আধ্যাত্মিক চর্চা করতে চান কিংবা একজন খাঁটি রব্বানী ও হক্কানী পীরের সন্ধান করছেন, তাদের জন্য আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর আধ্যাত্মিক ধারা একটি অনন্য ও নির্ভরযোগ্য ঠিকানা।
উপমহাদেশের ওলামাদের চিন্তার ব্যবধান
উপমহাদেশের ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ওলামাদের চিন্তার পরিধিতে কিছুটা তারতম্য বা ঘাটতি লক্ষ করা যায়। একটি প্রচলিত ঐতিহাসিক মূল্যায়ন হলো ভারত যা আজ চিন্তা করে, পাকিস্তান তা ২০ বছর পর এবং বাংলাদেশ আরও ২০ বছর পর তা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ইদানীং পাকিস্তান শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ওলামাদের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক মানের সমসাময়িক চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে যেমন দারুল উলুম করাচি বা জামিয়াতুর রাশীদ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরাম সাধারণত মৌলিক আন্তর্জাতিক মানের চিন্তা উপহার দেওয়ার চেয়ে অন্যের অন্ধ অনুসরণে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আল্লামা সাজ্জাদ নোমানীর আগমন ও তাঁর চিন্তাধারার সাথে পরিচিতি আমাদের নবীন ওলামাদের এই গণ্ডি থেকে বের হয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক সুরক্ষায় একাত্ম হওয়ার প্রেরণা জোগাবে।
আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী একটি বাস্তবসম্মত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজে ধীর অথচ স্থায়ী পরিবর্তনে বিশ্বাসী। তিনি একাধারে যেমন আধুনিক শিক্ষিত সমাজ (মিস্টার) এবং ঐতিহ্যবাহী ধারার আলেম (মোল্লা) উভয় পক্ষকেই সমানভাবে পথনির্দেশনা দেওয়ার ঐশ্বরিক যোগ্যতা রাখেন।
‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ (AIMPLB)-এর মুখপাত্র হিসেবে মুসলমানদের অধিকার রক্ষায় যেমন তিনি সোচ্চার, তেমনি আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মাধ্যমে অমুসলিমের কাছে ইসলামের মূল সৌন্দর্য সফলভাবে পৌঁছে দিচ্ছেন। সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর জীবন ও বহুমুখী অবদান বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক অনন্য ও কালজয়ী দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশ সফরের ঐতিহাসিক প্রত্যাশা ও বৈশ্বিক প্রভাব
আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী দীর্ঘ জীবনের সুবিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও গভীর পাণ্ডিত্যে সমৃদ্ধ এক অনন্য মহীরুহ এবং বর্তমান বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দশজন শ্রেষ্ঠ আলেমের অন্যতম। তাঁর চিন্তার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো—তিনি পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক মনন ও প্রামাণিক দর্শনের কল্যাণকর ও ইতিবাচক অংশগুলোকে সুনিপুণভাবে ইসলামের শাশ্বত কাঠামোর সাথে সমন্বয় করতে পারেন। একই সাথে, ইসলামি জীবনদর্শনকে পশ্চিমা বিশ্বের আধুনিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি বিশ্বময় এক অভূতপূর্ব আলো ছড়াচ্ছেন।
নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের চরম সংকটে নিমজ্জিত বর্তমান মুসলিম বিশ্বের জন্য তিনি এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর এই শুভ বাংলাদেশ সফরকে এ অঞ্চলের ওলামায়ে কেরাম, নবীন গবেষক এবং আধুনিক শিক্ষিত সমাজ পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্বাগত জানাচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক সংকট থেকে মুক্তির জন্য এবং আধুনিক বিশ্বের বিভ্রান্তিকর গোলকধাঁধায় সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর দূরদর্শী নসিহত ও প্রাজ্ঞ দর্শন আমাদের তরুণ ও শিক্ষিত সমাজকে এক আলোকোজ্জ্বল পথ দেখাবে।
আমরা দৃঢ়ভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করি যে, তাঁর এই বাংলাদেশ সফর আমাদের সামগ্রিক জাতীয় চিন্তা, চেতনার সংস্কার এবং প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নে এক যুগান্তকারী ও বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে, নানামুখী নৈতিক ও মানসিক সংকটে জর্জরিত এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে তাঁর সুউচ্চ আধ্যাত্মিক দর্শন ও তাসাউফের শিক্ষা আমাদেরকে এক প্রশান্ত ও সুন্দর জীবনের মহাসড়কে পৌঁছে দেবে।
আল্লামা খলিলুর রহমান সাজ্জাদ নোমানী একটি বাস্তবসম্মত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজে ধীর অথচ স্থায়ী পরিবর্তনে বিশ্বাসী। তিনি একাধারে যেমন আধুনিক শিক্ষিত সমাজ এবং ঐতিহ্যবাহী ধারার আলেম উভয় পক্ষকেই সমানভাবে পথনির্দেশনা দেওয়ার অনন্য যোগ্যতা রাখেন।
বাংলাদেশের ওলামা সমাজ এবং সর্বস্তরের সাধারণ শিক্ষিত মানুষ হৃদয়ের গভীর থেকে এই মহান মনীষীর দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন কামনা করে।
আমরা আশা করি, তিনি বারবার আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমিতে আগমন করবেন এবং তাঁর ইলমি ও রুহানি পরশ দিয়ে আমাদেরকে ক্রমাগত সঠিক পথের আলোকবর্তিকা দেখাবেন। সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সংস্কার এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর জীবন ও বহুমুখী অবদান বিশ্ব মুসলিমের জন্য এক অনন্য ও কালজয়ী নজির।
লেখক: পরিচালক, ইবনে খালদুন ইনস্টিটিউট ময়মনসিংহ

